ফ্রান্সিস বলে উঠল–পূর্বদিকে ছোটো। কিছুটা ছুটে গিয়ে বনভূমিতে ঢুকল। যাহোক গাছের আড়াল পেল। দূরে সর্দারের এলাকা থেকে খুব অস্পষ্ট হৈহল্লার শব্দ ভেসে এল। ফ্রান্সিসরা এখন নিরাপদ।
ঘন বনভূমি। গায়ে গায়ে গাছগাছালির জটলা। সেই গাছ গাছালির মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সিসরা ছুটল। ঠিক ছুটতে পারছিল না। পায়ের নিচে মাটি জলে ভেজা। পেছল। সাবধানে গাছের গুঁড়িতে পা রেখে রেখে ছুটতে হচ্ছিল। যে কোনসময় পিছলে পড়ে যাওয়ার সমস্যা। কাজেই ফ্রান্সিসদের ছোটার বেগ কমে আসছিল।
একসময় বনভূমি শেষ। সামনেই সমুদ্র। তখন সূর্য উঠছে। পূব আকাশে কমলা রঙের জোয়ার। সূর্য উঠল। সকালের নরম আলোর মধ্যে দিয়ে সমুদ্রের ধার ঘেঁষে ওরা ছুটল।
মুখ হাঁ করে হাঁপাচ্ছে ওরা। কিছুদূর যেতেই দেখল তীরভূমির কাছে ওদের জাহাজ নোনাঙর করা আছে। তিনজনেই আনন্দে ধ্বনি তুলল–ও–হো–হো। জাহাজ থেকেও ধ্বনি উঠল ও–হো–হো।
নৌকা তীরের বালিয়াড়িতে তোলা। ফ্রান্সিসরা দ্রুতহাতে নৌকা টেনে নিয়ে জলে ভাসাল। ফ্রান্সিস বৈঠা তুলে নিল। নৌকা জাহাজের দিকে চলল। নৌকা জাহাজের গায়ে লাগল। দড়ির মই খোলা হল। ফ্রান্সিসরা একে একে জাহাজে উঠে এল।
তখনই দেখা গেল সেই সর্দারের যোদ্ধারা বর্শা উঁচিয়ে তীরভূমির বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজের দিকে ছুটে আসছে।
ওরা সংখ্যায় তিরিশ চল্লিশজন। তীরে জলের কাছে এসে ওরা দাঁড়াল। জাহাজ বেশ কিছুটা দূরে। ওখান থেকেই কয়েকজন বর্শা ছুড়ল। কিন্তু বর্শা গুলো জলে পড়ল। ওরা হতাশ চোখে ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে রইল। শাঙ্কো চেঁচিয়ে বলল– ফ্রান্সিস-লড়াই।
–না। আমরা চলে যাব। তারপর ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–নোঙর তোল। জাহাজ মাঝ সমুদ্রে চালাও। ঘর ঘর শব্দে নোঙর তোলা হল। একবার ঝাঁকুনি খেয়ে জাহাজ চলল মাঝ সমুদ্রের দিকে। হ্যারি বেরিয়ে এল। বলল- এবার কী করবে?
–ডাঙা খুঁজবো। দেখি–কবে ডাঙার দেখা মেলে। তারপর বলল-নজরদার পেড্রোকে ডেকে নিয়ে এসো। পেড্রোকে আনা হল। ফ্রান্সিস বলল-পেড্রো– ভালোভাবে নজর রাখো। ডাঙার দেখা পাও কিনা।
জাহাজ চলল। পেড্রোও মাস্তুলের ওপর থেকে নজর রাখল কোনদিকে ডাঙার দেখা পায় কিনা।
জাহাজ চলেছে। দিন যায় রাত যায়। ডাঙার দেখা নেই। পেড্রো তীক্ষ্ম নজর রেখে চলেছে।
সেদিন গভীর রাত। আমাবস্যার রাত। চারিদিক ঘন অন্ধকার। আকাশে উজ্জ্বল তারার ভিড়। চাঁদও নেই। ক্ষীণ আলোয় যাহোক চারিদিক খুব অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
কেবিনঘরে ডেকএর ওপরেও কয়েকজন ভাইকিং ঘুমিয়ে আছে। সমুদ্রের ফুর ফুরে হাওয়ায় তাদের ঘুম বেশ গভীর। রাতে খাওয়ার পর একটু তন্দ্রা মত এসছিল। সেটা কাটিয়ে উঠলেও রাত একটু বাড়তে পেড্রো নিজের আসনে একেবারে ঘুমিয়ে পড়ল। কিছুতেই জেগে থাকতে পারল না। ফ্রান্সিস ওকে বার বার সাবধান করে দিয়েছে। বিশেষ করে রাতে এবং অন্ধকার রাতে ও যেন বেশি সজাগ থাকে। অন্য কোন জাহাজ বিশেষ করে জলদস্যুদের জাহাজ যেন ওদের জাহাজ দখল করতে না পারে। পেড্রো সেইসব ভুলে গেল সেই রাতেই। কাজেই লক্ষ্য করল না একটা জাহাজ ওদের জাহাজের দিকে দ্রুত আসছে। জাহাজটাও বড় নয়। কাছে আসতেই জাহাজের মাস্তুলের উড়তে থাকা সাদা পতাকা নামিয়ে ফেলা হল। উড়ল কালো পতকা। মাঝখানে মড়ার মাথা আর হাড়ের ঢ্যাঁড়া আঁকা। বোঝাই গেল জলদস্যুদের জাহাজ।
পেড্রো তখন গভীর ঘুমে। ও আর বন্ধুদের সজাগ করতে পারল না। জাহাজটা ফ্রান্সিসদের জাহাজের গায়ে এসে লাগল। ফ্রান্সিসদের জাহাজটা একটু ঝাঁকুনি খেল। কেবিনঘরে কয়েকজনের ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে পড়ে জাহাজের গায়ে। তখন একটু ঝাঁকুনি লাগেই। ওরা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল।
একদল জলদস্যু খোলা তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিসদের জাহাজের ডেকএ উঠে এল। যারা ডেকএ ঘুমিয়ে ছিল তাদের গায়ে তরোয়ালের খোঁচা দিয়ে ঘুম ভাঙাল। ঘুম ভেঙে ওরা উঠে দেখল খোলা তরোয়াল হাতে জলদস্যুদের দল দাঁড়িয়ে। ওরা ভীত হল। আবার জলদস্যুদের পাল্লায় পড়লাম। আবার জাহাজের কয়েদঘরে বন্দীর জীবন। একজন বলশালী জলদস্যু এগিয়ে এল। স্পেনীয় ভাষায় চাপাগলায় বলল–হুঁ শব্দটি করবে না। এখানেই বসে থাকো।
এবার কিছু জলদস্যু এখানে পাহারায় রইল। বাকিরা সিঁড়ি দিয়ে নিচের কেবিনঘরের দিকে। দু’জন অস্ত্রঘরের সামনে খোলা তরোয়াল হাতে পাহারা দিতে লাগল। বাকিরা কেবিনঘরে ঢুকে ঢুকে তরোয়ালের খোঁচা দিয়ে ভাইকিংদের ঘুম ভাঙাতে লাগল সিনাত্রার একটু আগেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। দরজা দিয়ে জলদস্যুদের ঢুকতে দেখেই ও বিপদ আঁচ করল। ও বিছানা থেকে গড়িয়ে এক কোনায় পড়ল। জলদস্যুরা বন্ধুদের ঘুম ভাঙিয়ে বন্দী করে নিয়ে চলে যেতে সিনাত্রা একটুক্ষণ অপেক্ষা করল। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ কানে আসছে। জলদস্যুদের নজর এড়ানো গেছে।
ও কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে ছুটল অস্ত্রঘরের দিকে। অস্ত্রঘরের সামনেই দেখল দু’জন জলদস্যু খোলা তরোয়াল হাতে পাহারাত। এরা জলদস্যু হলেও লড়াইয়ের কায়দা কানুন ভালোই জানে।
সিনাত্রা ফিরে এল। সিঁড়ি দিয়ে ডেকএ উঠে এল। দেখল বন্ধুদের সব ডেকএ বসিয়ে রেখেছে। একজন জলদস্যু ওকে তরোবারি দেখিয়ে বসতে ইঙ্গিত করল। সিনাত্রা কোন আপত্তি না করে বন্ধুদের সঙ্গে বসে পড়ল।
