–পিতালিদের নিয়ে কী করবে?
–শাস্তি–হত্যা। সর্দার বলল।
–পিতলিরা আপনাদের শত্রু ঠিকই। তবে বন্দীদের হত্যা করা উচিত নয়। এরা তো অসহায়। ফ্রান্সিস বলল।
সর্দার মাথা নেড়ে বলল-না-হত্যা।
–আমাদের বন্দী করে রেখেছেন কেন? আমাদের মুক্তি দিন। ফ্রান্সিস বলল।
–পিতলির বন্ধু–তোমরা–পরে-হত্যা। সর্দার বলল।
–আমরা বিদেশী। জাহাজ চড়ে এসেছি। পিতলিদের নামও শুনেনি কখনো। বন্ধুত্ব তো দূরের কথা। হ্যারি বলল।
–আদেশ–হত্যা। সর্দার একই ভঙ্গীতে বলল। ফ্রান্সিস বুঝল এই সর্দার কোন অনুরোধই শুনবে না। একরোখা মানুষ। যে কোন সময় ওদের মেরে ফেলতে পারে। তবুও ফ্রান্সিস বোঝাবার চেষ্টা করল। বলল–আমরা বিদেশী। আমাদের হত্যা করে আপনার কী লাভ?
–সিদ্ধান্ত হত্যা। কথাটা বলে সর্দার আর দাঁড়াল না। চলে গেল।
–ফ্রান্সিস–অবস্থা যা বুঝছি এই সর্দার একগুঁযে। আমাদের কোনো কথাই শুনবে না। হয়তো পিতলিদের সঙ্গে আমাদেরও হত্যা করবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে পালানো যায় তার উপায় ভাবো। হ্যারি বলল।
–দেখি। তবে একটু সুলক্ষণ আছে। প্রহরী মাত্র একজন। পালাতে হলে একেবারের চেষ্টাতেই পালাতে হবে। না পারলে বিপদের আশঙ্কা বাড়বে। ফ্রান্সিস বলল।
–সেই চেষ্টাই দেখ।
সেদিন রাতের খাওয়া সেরে ফ্রান্সিস জেগে বসে আছে। নানা চিন্তা মাথায়। ফিরতে দেরি হচ্ছে। মারিয়া বন্ধুরা জাহাজে নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তায় পড়েছে। এদিকে পালাবার উপায়ও ভেবে পাচ্ছে না।
কয়েদঘরের কাঠের গরাদের বাইরে তাকাল। ফুটফুটে জ্যোৎস্না পড়েছে গম ক্ষেতে। প্রহরীকে দেখল। একটা বর্শায় ভর দিয়ে সে একটা পাথরের ওপর বসে আছে।
এই সময় শাঙ্কো আস্তে আস্তে ওর কাছে এল। ফিফিস্ করে ডাকল–ফ্রান্সিস? ফ্রান্সিস চোখ বুজে শুয়ে ছিল। চোখ মেলে তাকাল। শাঙ্কো ফিস্ ফিস্ করে বলল। কাঠের গরাদ দেখলাম লোহার মত শক্ত। ওটা কাটতে সময় লাগবে। কিন্তু গরাদে বাঁধা বুনো লতাগাছ কাটা যাবে। ফ্রান্সিস আস্তে উঠে বসল। ফিসফিস করে বলল– পরীক্ষা করে দেখেছো?
–হ্যাঁ। তখন প্রহরীটি খেতে গিয়েছিল। শাঙ্কো বলল।
–কিন্তু একরাতের মধ্যেই কাটতে হবে। পারবে? ফ্রান্সিস বলল।
–পারবো। আমি দুটো লতার বাঁধন কেটেছি। বেশি কাটিনি। খাবার দিতে এসে প্রহরীদের সন্দেহ হতে পারে। শাঙ্কো বলল।
তাহলে কাল রাতে প্রহরীরা খাবার দেওয়ার পর কাজে লেগো। ভোর হওয়ার আগেই পালাতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
পরের দিন। বেশ রাত তখন। ফ্রান্সিস ফিসফিস করে বলল–সজাগ থেকো। ঘুমিয়ে পড়ো না। কিন্তু ঘুমের ভান করে থেকো। পিতালি বন্দীরা ফ্রান্সিসের নির্দেশ বুঝল না। ওরা ঘুমিয়ে পড়ল।
একসময় ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে কাঠের গরাদের কাছে গেল। চাঁদের আলোয় দেখল–প্রহরী একটা পাথরে বসে আছে। হাতের বর্শাটায় ভর রেখে। বোঝাই যাচ্ছে তন্দ্রাচ্ছন্ন। ফ্রান্সিস ফিফিস করে ডাকল–শাঙ্কো।
শাঙ্কো তৈরীই ছিল। ও সঙ্গে সঙ্গে হামাগুড়ি দিয়ে দরজার কাছে গেল। বুকের পোশাকের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ছোরাটা বার করল। তারপর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বুনো লতার বাঁধন কাটাতে লাগল। একটু শব্দ হতে লাগল। কিন্তু তাতে প্রহরীর তন্দ্রাভাব কাটল না। একইভাবে ঝিমুতে লাগল। একটার পর একটা লতার বাঁধন কাটতে লাগল শাঙ্কো। ফ্রান্সিস একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রহরীটির দিকে। প্রহরীটির কোন নড়াচড়া নেই। গমের ক্ষেতের ওপর দিয়ে মুক্ত হাওয়া জোরে বইছে। আরামে প্রহরীটি বেশ তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।
কাঠের ধাঁচায় বাঁধা চার পাঁচটা কাঠের গরাদ শাঙ্কো খুলে ফেলল। তারপর দ্রুত বেরিয়ে এসে প্রহরীটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দু’জনেই মাটির ওপর পড়ে গেল। প্রহরীটি কোন শব্দ করার আগে বুনো লতার ফাঁস প্রহরীটির মুখ চেপে বেঁধে দিল। প্রহরীটির মুখ দিয়ে কোঁ কোঁ শব্দ বেরিয়ে আসছিল। শাঙ্কো ওর গালে বিরাশি সিক্কা ওজনের এক চড় কষালো। শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। শাঙ্কো দ্রুত হাত দুটো লতা দিয়ে বেঁধে দিল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বলে উঠল–পালাও। জেগেই ছিল। শাঙ্কোর কথা কানে যেতেই হ্যারি দ্রুত কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিস চাপা গলায় বলল–গম ক্ষেত পার হয়ে পাহাড়ের দিকে। ফ্রান্সিসের এই দিক নির্দেশের কারণ ছিল। কারণ সামনের দিকে কাটাগাছের বেড়া। দরজাও ছোট।
সবাই গমক্ষেতের দিকে ছুটল। ওদিকে পিতালির কয়েকজন দেখল কয়েদ ঘরের দরজা খোলা। ফান্সিসরা গমক্ষেত দিয়ে পাথড়ের দিকে ছুটেছে। ওরা অন্য বন্ধুদের ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দিল। তারপর সবাই ফ্রান্সিসদের পিছু পিছু ছুটল।
গমের গাছে ফ্রান্সিসদের বুক পর্যন্ত ঢাকা পড়ে গেছে। ওরা প্রানপণে ছুটছে। পাহাড়টার দিকে। চাঁদের আলোয় চারদিক বেশ ভালোই দেখা যাচ্ছে।
গমের ক্ষেত শেষ। শুরু হল পাথর ছড়ানো মাটি।
সবাই যখন পাহাড়টার নিচে পৌঁছাল তখন ওরা ভীষণ হাঁপাচ্ছে। পিতলিরাও পৌঁছল তখন। ফ্রান্সিস বলল–দাঁড়াও। সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস একজন পিতালিকে জিঞ্জেস করল–সমুদ্র কোন দিকে? সেও হাঁপাচ্ছে তখন। সে মাথা নাড়ল। ফ্রান্সিসের কথাটা বুঝল না। ফ্রান্সিস এবার হাত দিয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের ইঙ্গি ত করল। এবার লোকটা বুঝল। হাত তুলে পূর্বদিক দেখাল। একটা বনভূমির ওপারটা দেখাল।
