ফ্রান্সিসরা কথাটার কোন অর্থই বুঝতে পারল না। তবে এটুকু বুঝল বৃদ্ধ ওদের সর্দার। সে তাদের অভিযুক্ত করেছে। ফ্রান্সিস পৌতুগীজ ভাষায় বলল–আমরা বিদেশি ভাইকিং। এখানে খোঁজখবর নিতে এসেছি যে আমরা আমাদের দেশ থেকে কতদূরে আছি। বৃদ্ধ এবার ভাঙা ভাঙা পোতুগীজ ভাষায় বলল–না–বন্দী।
–কী করবে? শাঙ্কো মৃদুস্বরে বলল।
–আবার বন্দী দশা মেনে নিতে হবে। ফ্রান্সিসও মৃদুস্বরে বলল। ওদের ঘিরেছিল যারা এবার বর্শা দিয়ে তারা খোঁচা দিয়ে দিয়ে হাঁটতে ইঙ্গিত করল। কয়েকজন যোদ্ধা ওদের বাড়িটার পেছনদিকে নিয়ে চলল। পেছনে আসতে দেখা গেল একটা ঘরের দরজা। সেই শুকনো গাছের। দরজা বুনো শুকনো লতাগাছে বাঁধা। একজন যোদ্ধা গিয়ে লতা খুলল। বর্শার খোঁচা দিয়ে দিয়ে ফ্রান্সিসদের ঢুকিয়ে দেওয়া হল। বাইরের আলো থেকে অন্ধকারঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস স্পষ্ট কিছু দেখতে পারছিল না। অন্ধকার একটু সয়ে আসতে দেখল ঘরটা বেশ বড়। ছাদ লম্বা লম্বা শুকানো ঘাসের। তার ওপর পাথর চাপানো। একপাশে একটা মাটির জালায় জল রাখা। ঘরটা বড় দেখেই বুঝল অনেক বন্দী রাখার ব্যবস্থা। এখানে কত জন আর বন্দী হয়।
পাথরের মেঝেয় লম্বা লম্বা শুকনো ঘাস পাতা। ফ্রান্সিস একটুক্ষণ বসে থেকে শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো সিনাত্রা বসে পড়ল।
–আবার বন্দী হলাম। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। এবার পালানোর কথাটা ভাবতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–পারবে পালাতে? সিনাত্রা বলল।
–অবশ্য পারব। তবে উপায়টা ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে। সর্দারের হাবভাব যা বুঝলাম এমনিতে আমাদের মুক্তি দেবে না। ফ্রান্সিস বলল। শাঙ্কো বলল–সর্দার আমাদের দেখিয়ে বলল–পিতালি। কথাটার অর্থ কি?
–শত্রু। ফ্রান্সিস বলল।
–আমরা শত্রু হলাম কী করে। শাঙ্কো বলল।
তার মানে এদের শত্রু আছে। বোধহয় আমাদের সেই শত্রুই ভেবেছে। ফ্রান্সিস বলল।
–কিছুই বুঝতে পারছি না। সিনাত্রা বলল।
মনে হয় এরা শত্রুর আক্রমনের আশঙ্কা করছে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসের কথা শেষ হতে না হতে দূরের পাহাড়টার দিক থেকে অনেক মানুষের চিৎকার শব্দ ভেসে এল। ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে বুনো গমের ক্ষেত দেখা যাচ্ছিল।
একটু পরেই দেখা গেল সেই গম ক্ষেত মাড়িয়ে বর্শাহাতে একদল যোদ্ধা ছুটে আসছে। এখানকার যোদ্ধারাও ততক্ষণ ধ্বনি তুলেছে–বু-উ-উ-উ-ম্। তারাও বর্শাহাতে লড়াই করার জন্যে তৈরী হল।
গমক্ষেত পার হয়ে ঐযোদ্ধার দল আসতেই এখানকার যোদ্ধার দল ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। গম ক্ষেত তছনছ করে শুরু হল দু’দলের লড়াই। দু’দলই বর্শা দিয়ে লড়াই করছে। তুমুল লড়াই চলল। গমক্ষেত ভরে উঠল আর্তচিৎকার আর গোঙানিতে। পাহাড়ের দিক থেকে আগত যোদ্ধাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা গেল। কাঠের গরাদের ফাঁক দিয়ে লড়াই দেখতে দেখতে ফ্রান্সিস মন্তব্য করল–পাহাড়ের দিক থেকে যারা এসেছে ওরা হেরে যাবে। ওরা সংখ্যায় কম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। এদিকের যোদ্ধাদের হাঁটে হয় আহত হতে লাগল নয় তো মরতে লাগল। ওরা পিছু হটতে লাগল। কিন্তু যারা বেঁচে রইল গমক্ষেতের দিক দিয়ে পাহাড়ের দিকে পালাতে লাগল। এরা পিছু ধাওয়া করল। আরোও মরল। জীবিতরা কোনরকমে পালাল।
বিজয়ী এরা বর্শা উঁচুতে তুলে ধ্বনি তুলল–বু-উ-উ-উ-ম্। ফ্রান্সিস বলল–থাক –নতুন কারো কাছে আর বন্দী হয়ে থাকতে হবে না। এরা আমাদের নিয়ে কী করে দেখা যাক।
যযাদ্ধারা ফিরে এল। যুদ্ধজয়ের আনন্দে উল্লাস চলল। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল–এরা তো জিতল। কিন্তু আমরা যেই তিমিরে সেই তিমিরে। আমাদের কপালে মুক্তি নেই।
–একেবারে হতাশ হয়ো না। একটা না একটা উপায় হবেই। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
রাতে প্রহরীরা ফ্রান্সিসদের খেতে দিল। গোল রুটি আর সামুদ্রিক মাছের ঝোলমত। মাছও ভাজা নয় আগুনে পোড়ানো। ফ্রান্সিসরা ক্ষুধার্ত ছিল। পোড়া মাছ রুটি পেট পুরেই খেল।
এদিকে বন্দী শত্রুদের জনা দশেককে নিয়ে আসা হল। সর্দারের হুকুমে তাদের ফ্রান্সিসদের কয়েদ ঘরেই ঢুকিয়ে দেওয়া হল। ওদের খেতেও দেওয়া হল। ঘরটা বড় বলেই ফ্রান্সিসদের খুব একটা অসুবিধা হল না। সবাই কোনরকমে শুতে পারল।
রাত বাড়ল। ফ্রান্সিস তখনও ঘুমোয় নি। পালানোর উপায় ভাবছে। শত্রুদের কয়েকজনকে ফ্রান্সিস কাছে ডাকল। লোকটি এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস দেখল লোকটির মাথার চুল চুড়ো করে বাঁধা নয়। ছড়ানো কাঁধ পর্যন্ত। গালে হলুদ সাদা উল্কি আঁকা। ফ্রান্সিস বলল–তোমরা পিতলি? লোকটি মাথা ওঠানামা করল। ফ্রান্সিস বলল ভাই-সর্দার আমাদের সন্দেহ করেছে তোমাদের সঙ্গে যোগ আছে। অথচ আমরা বিদেশী ভাইকিং। এখানকার কিছুই চিনি না আমরা। লোকটা বোধহয় আন্দাজে কিছু বুঝল। কিছু বললও। ফ্রান্সিস সে কথার কিছুই বুঝল না। তবে এটা বুঝল যে এরা অত্যন্ত ভয়ে কাতর হয়ে পড়েছে। বুঝল না সর্দার এদের নিয়ে কী করবে?
পরদিন ফ্রান্সিস সবে সকালের খাবার খেয়েছে। সর্দার এল। এখন আর সর্দার তামাক টানছে না। কয়েদঘরের দরজার কাছে এসে সর্দার দাঁড়াল। তারপর পিতলিদের দিকে তাকিয়ে বলল–পিতলি। তারপর একনাগাড়ে কিছু বলল। ফ্রান্সিস লক্ষ করল পিতলিদের মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে। ও বুঝল পিতলিদের কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। হয়তো মেরেই ফেলা হবে। তাই কাঠের গরাদের কাছে মুখ নিয়ে বলল
