–কতকটা তাই। ডাঙা না পেলে এভাবেই জাহাজ চালাতে হবে।
–উত্তরদিকটা ঠিক রেখে চালাও। ডাঙা পেতেই হবে। ঘাবড়ে যেও না। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। ফ্লেজার মাথা কাত করল। জাহাজ চলল।
সেদিন বিকেলে মাস্তুলের ওপর থেকে পেড্রে চিৎকার করে বললডাঙা দেখা যাচ্ছে ডাঙা। ভাইকিংরা ভিড় করে এসে রেলিং ধরে দাঁড়াল। সিনাত্রা চেঁচিয়ে বলল–কোন দিকে?
–ডান দিকে। পেড্রো চেঁচিয়ে বলল।
একটু পরেই ডানদিকে একটা সবুজ পাহাড় দেখা গেল। তারপর গাছগাছালি। ফ্লেজার ডাঙার দিকে জাহাজ ঘোরাল!
সমুদ্রের তীরভূমি দেখা গেল। মানুষজন দেখা গেল না। হ্যারি ছুটে ফ্রান্সিসের কেবিনঘরের দরজায় এসে টোকা দিল।
এসো। ফ্রান্সিস বলল।
দরজা খুলে গেল। মারিয়া দাঁড়িয়ে।
–আমি সূর্যাস্ত দেখতে যাচ্ছি। মারিয়া চলে গেল।
–ফ্রান্সিস ডানদিকে ডাঙা দেখা গেছে। সমুদ্রতীর নির্জন। একটা ঘাসে ঢাকা সবুজ পাহাড় দেখা গেছে। হ্যারি বলল।
–চলো–ডেকএ যাই। ফ্রান্সিস বলল।
দুজনে ডেক উঠে এল। সূর্য ডোবার আগে সমুদ্রতীর মোটামুটি দেখা গেল। টানা বালিয়াড়ি চলে গেছে বেশ কিছুদূর পর্যন্ত। গাছগাছালি নেই তারপর একটানা চলে গেছে শুকনো গাছের সারি। দূর থেকে বোঝা গেল না কী গাছ ওগুলো।
সূর্য অস্ত গেল।
অন্ধকার নামল
কী করবে? হ্যারি বলল।
–এই রাতে নামা চলবে না। বিদেশ বিভুঁই। বিপদে পড়বো। ফ্রান্সিস বলল। তারপর ফ্লেজারকে গিয়ে বলল–জাহাজটা কাছাকাছি নিয়ে চলো।
তীরে জাহাজ ভেড়ানো যাবে না। জল অগভীর। ফ্লেজার বলল। তারপর জাহাজ থামাল। শাঙ্কোরা জাহাজের পালগুলো গুটিয়ে ফেলল। জাহাজ অনড় দাঁড়িয়ে রইল।
–কাল সকালে খাবার খেয়ে নামব। আজকে জাহাজ এখানেই থাকুক। ফ্রান্সিস বলল।
-বেশ। হ্যারি বলল।
রাতের খাবার খেয়ে ফ্রান্সিস আর মারিয়া নিজেদের কেবিনঘরে এল।
কী করবে ঠিক করলে? মারিয়া জানতে চাইল।
বেশ কিছুদিন পর ডাঙার দেখা পেলাম। কাল সকালে নামব। খোঁজখবর করব। ফ্রান্সিস বলল।
–অচেনা জায়গা! যদি বিপদ হয়? মারিয়া বলল।
উপায় নেই। সেই ঝুঁকিটা নিতেই হবে। নাহলে কোথায় এলাম জানব কী করে? ফ্রান্সিস বলল।
সকালে খাবার খেয়ে ফ্রান্সিস সমুদ্রতীরে নামবার জন্যে তৈরী হল। সঙ্গে শাঙ্কো আর সিনাত্রাকে নিল। হ্যারি যেতে চাইল। কিন্তু ফ্রান্সিস রাজি হল না। বলল তুমি এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ নও। কী রকম অবস্থায় গিয়ে পড়ব কে জানে। তারপর বলল– রাজা নিকুম্বার দুই প্রহরী রয়েছে জাহাজে। ওদের আসতে বললো। এখানেই ওদের নামিয়ে দেব।
হ্যারি গিয়ে প্রহরী দু’জনকে ডেকে আনল। ওরা পাহাড় জঙ্গল দেখে নামতে সাহস পেল না। একজন বলল–এখানে নামব না। কোন বড় বন্দরে আমাদের নামিয়ে দিও। এখানে কোন বাড়ি ঘরদোর আছে কিনা কে জানে। শেষে কোন বিপদে না পড়ি। এই প্রহরীটি মোটামুটি পোর্তুগীজ ভাষা বলতে পারে।
–বেশ। ফ্রান্সিস বলল–কোন বন্দরেই তোমাদের নামিয়ে দেব।
একটা নৌকা জলে নামানো হল। ফ্রান্সিসরা জাহাজ থেকে দড়ির মধ্যে পা রেখে নৌকায় নেমে এল। ফ্রান্সিস নৌকোয় রাখা বৈঠা তুলে নিল। নৌকো ছেড়ে দিল। ফ্রান্সিস নৌকো বাইতে লাগল। আস্তে আস্তে নৌকো গিয়ে তীরভূমিতে লাগল।
ফ্রান্সিসরা একে একে নেমে এল। নৌকোটা মাটিতে কিছুদূর টেনে এনে রাখল যাতে জোয়ার এলে নৌকোটা ভেসে না যায়।
বালিয়াড়ি ভেঙে চলল সবাই। কিছুদূর গিয়ে দেখল কাছেই কিছু পাথরের ঘর বাড়ি। ডানদিকে বুনো গমের ক্ষেত প্রায় সবুজ পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত। পাশে তামাক পাতার ক্ষেত।
বাড়িগুলোর দিকে যেতে যেতে দেখল বাড়িগুলো ঘিরে কালো কালো লম্বা লম্বা নিষ্পত্র কাঁটাগাছের সারি। জাহাজ থেকে ফ্রান্সিস এই গাছগুলো দেখেছিল। ফ্রান্সিস ভেবে পেল না কী করে এই কাঁটা গাছের বেড়ার মধ্যে দিয়ে ঢুকবে।
বেড়াটার পাশে পাশে ওরা চলল। এক জায়গায় এসে দেখল প্রবেশদ্বার মত। ঐ কাটাগাছের কাটা ছেটে ফেলে লাঠির মত ব্যবহার করা হয়েছে।
ফ্রান্সিস ঘরগুলোর দিকে তাকাল। কিন্তু জনপ্রাণী দেখল না। ও একটু অবাকই হল। এমন সময় একটা ঘরের সামনে বারান্দা মত জায়গায় একজন বৃদ্ধ এসে বসল। হাতে একটা মাটির হাঁড়ি। হাঁড়িটা রেখে তার ভেতর একটা নল মত ঢোকাল। তামাক টানতে লাগল। হাঁ করে ধোঁয়া ওড়াতে লাগল।
-চলো। ঐ লোকটার কাছেই খোঁজ নেওয়া যাক। প্রবেশদ্বারের কাছের ডালগুলো সরিয়ে ওরা ভেতরে ঢুকল। বারান্দায় সেই বৃদ্ধের কাছাকাছি এসেছে হঠাৎ একদল লোক সেই ঘরটা থেকে বেরিয়ে এল। গায়ের রং হলদেটে। বেঁটে। মাথার চুল চুড়ো করে বাঁধা। হাতে ছুঁচোলোমুখ বর্শা। মুখে শব্দ করছে–বুবুবুম্।
ফ্রান্সিস হকচকিয়ে গেল। ফ্রান্সিস পিছন ফিরে বলল– দরজার দিকে পালাও। তখনই কয়েকটা বর্শা ওদের দিকে উড়ে এল। ফ্রান্সিস কোনমতে পাশ কাটাল। কোন বর্শাই ওদের গায়ে লাগল না। শাঙ্কো বলে উঠল–পালাতে গেলে মরব। ফ্রান্সিসও বলল–চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো।
যোদ্ধারা দ্রুত ওদের ঘিরে ফেলল। বর্শাগুলো মাটি থেকে কুড়িয়ে নিল। লোকগুলোর পরনে শুকনো লম্বা ঘাসের ঘাঘরা মত। ওরা ফ্রান্সিসের গায়ে বর্শার খোঁচা দিতে দিতে ঘরটার দিকে যেতে ইঙ্গিত করল।
ফ্রান্সিসরা আস্তে আস্তে পাথরের বারান্দামত জায়গাটায় উঠে এল। যোদ্ধাদের মধ্যে একজন এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধকে কিছু বলল। বৃদ্ধ একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে চিৎকার দিন করে কী বলে উঠল। তারপর ফ্রান্সিসদের আঙুল দেখিয়ে বলে উঠল–পিতালি।
