একটু বিশ্রাম নিয়েই শাঙ্কো দড়ি বেয়ে জাহাজের অন্ধকার ডেক উঠে এল। অস্পষ্ট দেখল–দু’জন প্রহরী মাস্তুল আঁকড়ে ধরে আছে। হাতে বর্শা নেই। শাঙ্কো এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। দেখল একপাশে দুটো বর্শা পড়ে আছে। আসলে জাহাজের দুলনির জন্যে প্রহরী দু’জন টাল সামলাতে মাস্তুল জড়িয়ে ধরে আছে। এরকম দুলনি শাঙ্কোদের কাছে সমস্যাই নয়। ও দুলুনির মধ্যে ছুটে গিয়ে বর্শা দুটো তুলে নিল। প্রহরী দুজন এবার নিজেদের নিরস্ত্র অবস্থাটা বুঝল। কোন কথা বলল না।
শাঙ্কো সিঁড়িঘরে এল। সিঁড়ি বেয়ে নিচে ফ্রান্সিস মারিয়ার কেবিন ঘরে এল। দরজা বন্ধ। শাঙ্কো দরজায় টোকা দিয়ে ডাকল–রাজকুমারী-রাজকুমারী। সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল। ঘরে একটা মোমবাতি জ্বলছিল। সেই আলোয় শাঙ্কো দেখল মারিয়ার মাথার চুল উস্কোখুস্কো। ভয়াত মুখ। রাজকুমারী শুধু বলল–ফ্রান্সিস?
কিছু ভাববেন না। আমরা সবাই মুক্ত আর সুস্থ।
ভুমিকম্প। ভয়াতস্বরে মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ। এখন থেমে গেছে। শাঙ্কো বলল।
এরমধ্যে ফ্রান্সিসরা জাহাজে উঠে পড়েছে। ফ্রান্সিস ডেকএ দাঁড়িয়ে বলল একদল দাঁড় ঘরে চলে যাও। জাহাজ উল্টো দিকে গুহার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। একদল ভাইকিং চলে গেল দাঁড় বাইতে।
জাহাজ চালক ফ্লেজার ছুটে এল ফ্রান্সিসের কাছে। বলল–
–ফ্রান্সিস সর্বনাশ হয়েছে।
কী হয়েছে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–হালের ওপর পাথরের চাই ভেঙে পড়েছে। হাল ভেঙে গেছে।
–ঠিক আছে। তুমি যেভাবে পারো গুহা থেকে জাহাজটা বের কর। ফ্রান্সিস দ্রুত বলল।
–দেখি। ফ্লেজার চলে গেল।
ওদিকে দাঁড় বাইতে থাকায় জাহাজটা একটু নড়ল। তারপর গুহার মুখের দিকে চলল। শাঙ্কো মারিয়াকে নিয়ে ডেকও উঠল। মারিয়ার মুখ দেখেই ফ্রান্সিস বুঝল মারিয়া ভীষন ভীত হয়ে পড়েছে। মারিয়ার ডান হাতটা ধীরে ধীরে ফ্রান্সিস একটু চাপ দিল। মারিয়ার ভয় ভাঙাবার চেষ্টা করল। বলল–কোন ভয় নেই। আমরা সবাই নিরাপদ। এক্ষুনি জাহাজ বাইরের সমুদ্রে বেরিয়ে আসবে। তুমি বরং কেবিনঘরে যাও। বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নাও।
–না। আমি তোমাদের সঙ্গেই থাকব। মারিয়া বলল।
বেশ। ভূমিকম্প আমাদের উপকারই করেছে। কয়েদঘর ভেঙে পড়েছে। তাই আমরা নিরাপদে পালাতে পেরেছি। ফ্রান্সিস বলল।
জাহাজের ওপর পাথর ভেঙে পড়েছে।
-হা হাল ভেঙে গেছে। ওটা আমরা সরিয়ে নেব। জাহাজের আর কোন ক্ষতি হয়নি। ফ্রান্সিস বলল।
জাহাজটা আস্তে আস্তে গুহা মুখ থেকে বেরিয়ে এসে উন্মুক্ত সমুদ্রে পড়ল।
তখন বিকেল হয়ে এসেছে। ফ্রান্সিস ফ্লেজারকে সঙ্গে নিয়ে হালের কাছে এল। সত্যিই হাল প্রায় ভেঙে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে পাথরের চাইটা বেশ বড়ই ছিল। হাল ভেঙে চাইটা গুহার জলে পড়ে গেছে।
–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাল মেরামত করতে হবে। নইলে হাওয়ার ধাক্কায় জাহাজ যেদিকে খুশি যাবে। হুইলই ঘোরানো যাবে না। ফ্লেজার বলল।
–হ্যাঁ–দেখছি। ফ্রান্সিস মাথা ওঠানামা করল।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো এগিয়ে এল। বলল–কী বলছো?
কয়েকজনকে নিয়ে কাঠযন্ত্রপাতি বের কর। নইলে হাওয়ার ধাক্কায় কোন দিক ঠিক রাখতে পারবে না। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। শাঙ্কো বলল। তারপর ছুটল বন্ধুদের জোগাড় করতে।
ওদিকে নজরদার পেড্রে কয়েকজনকে নিয়ে পাল টাঙাবার জন্যে পালবাঁধার কাঠামোয় উঠতে লাগল। ফ্লেজার ছুটে গিয়ে বলল-পেড্রো–এখন পাল টাঙিওনা। তাহলে জাহাজ এদিক ওদিক ছুটবে। সব দিকটিক গুলিয়ে যাবে। আগে হাল ঠিক। হোক। তারপর পাল টাঙাবে। পাল ছাড়াও জাহাজ এদিক ওদিক ছুটল। ফ্লেজার অসহায় চোখে তাকিয়ে দেখল। হাল মেরামত না হলে কিছুই করার নেই।
তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। মারিয়া এসময় প্রতিদিন সূর্যাস্ত দেখে। আজও তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। কিন্তু মনে দুশ্চিন্তা। বেহাল জাহাজ কোনদিকে চলছে যা মেরিই জানে। সূর্য অস্ত গেল। সন্ধে নামল। আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে গেল চারদিক।
ওদিকে সিনাত্রা রাজা নিকুম্বার দুই প্রহরীকে ওদের কেবিন ঘরে বন্দী করে রেখে ছিল। দু’জনেরই হাত বাঁধা। এবার সিনাত্রা ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল-রাজা নিকুম্বার দুই প্রহরীকে বন্দী করে রেখেছি। কী করবে ওদের নিয়ে?
এখন তো আমরা কোথায় এসেছি কিছুই বুঝতে পারছি না। কোন বন্দর টন্দর পাই। সেখানে ওদের দুজনকে নামিয়ে দেব। ওদের বন্দী করে রেখে কী লাভ। ফ্রান্সিস বলল।
রাতে শাঙ্কো কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে হাল মেরামতির কাজ করতে লাগল। মশালের আলোয় কাজ চলল। বড় বড় কাঠের তক্তা এনে কেটে ঘষে হাল সারাই হয়। কাজ চলল সারারাত। ফ্রান্সিসের নির্দেশ- যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাল সারাই। করতে হবে।
ভোর হল। তখনও শাঙ্কোরা কাজ করে চলেছে। সমুদ্রের উত্তাল হাওয়ায় জাহাজ এদিক ওদিক ছুটছে।
শাঙ্কোরা প্রায় দিন সাতেক রাতদিন খেটে জাহাজের হালটা মেরামত করল। ফ্লেজার হুইল চেপে ধরল। ফ্রান্সিস কাছেই ছিল। বলল–মোটামুটি উত্তরদিকটা ঠিক রেখে জাহাজ চালাও। ফ্লেজার সেভাবেই জাহাজ চালাতে লাগল।
জাহাজ চলল। দিন যায় রাত যায় ডাঙার দেখা নেই।
ফ্রান্সিস চিন্তায় পড়ল। তবে কি দি হারালাম। ও ফ্লেজারের কাছে যায়। জিজ্ঞেস করে–ফ্লেজার আমরা কি দিক হারলাম?
