প্রায় এক মাস কাটল। হ্যারি আর দুই বন্ধু এখন অনেক সুস্থ। কয়েদঘরে পাহারাদারদের সংখ্যা দুজন কমানো হয়েছে। পাহারার কড়াকড়িটা কমেছে। ফ্রান্সিস পালাবার ছক ভাবছে গভীরভাবে। হ্যারি শাঙ্কোর সঙ্গে কথাও বলছে। কিন্তু বিনা বাধায় পালানো সম্ভব মনে হচ্ছে না।
এবার ফ্রান্সিস ভাবল ওদের মুক্তির ব্যাপারে রাজার সঙ্গে কথা বলবে। সকালের খাবার খাওয়া হলে ফ্রান্সিস দরজার কাছে গেল। একজন প্রহরীকে ইশারায় ডাকল। ইঙ্গিতে দলনেতাকে ডেকে দিতে বলল। প্রহরীটি চলে গেল।
কিছু পরে দলপতি এল। বলল–কেন?
–রাজা নিকুম্বার সঙ্গে কথা বলবো। তুমি ব্যবস্থা করে দাও।
–রাজসভায় চল। দলপতি মাথা নেড়ে বলল। কয়েদঘরের দরজা খোলা হল। ফ্রান্সিস হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল। দলপতির পিছনে পিছনে চলল রাজসভার দিকে। কালো মানুষদের ঘর সংসারের পাশ দিয়ে হেঁটে রাজসভায় এল দুজনে।
তখন রাজসভায় একটা বিচার চলছিল। বিচার শেষ হলে দলপতি রাজার সামনে এ গেল। মাথা একটু নুইয়ে বোধহয় ফ্রান্সিসের কথা বলল। আজকে পাশের আসনে রানি নেই। ফ্রান্সিস একটু হতাশই হল। রানির জন্যই ওরা বেঁচে গিয়েছিল। রানি থাকলে হয়তো ওদের স্বপক্ষে কিছু বলতো। এখন তো রাজা নিকুম্বা একা। রাজাকে বোঝানো মুশকিল হবে। তবু চেষ্টা করে দেখা যাক মুক্তি মেলে কিনা।
রাজা ততক্ষণে ফ্রান্সিসকে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করেছে। ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল।
-বল। রাজা বলল।
আমরা তো কোনভাবেই আপনাদের বা আপনার এই রাজত্বের কোন ক্ষতি করিনি। তবে আমাদের বন্দী করে রেখেছেন কেন? ফ্রান্সিস বলল-জলদস্যু আসবে–বিক্রি। রাজা দাড়ি গোঁফের ফাঁকে হেসে হাতের আঙ্গুল গোল করে ঘুরিয়ে বলল–সোনা। ফ্রান্সিস বুঝল–ওদের জলদস্যুদের কাছে বিক্রি করা হবে। বদলে রাজা সোনার চাকতি পাবে। ফ্রান্সিসের মন দমে গেল। তবু হাল ছাড়ল না। বলল–আমরা নিরীহ। আপনাদের কোন অপকার করি নি। তবে আমাদের ক্রীতদাসের হাটে বিক্রির জন্যে জলদস্যুদের হাতে তুলে দেবেন কেন? –সোনা চাই। রাজা এবার একটু জোরেই হেসে উঠল। ফ্রান্সিসের মন নিরাশায় ভরে উঠল। বুঝল–কোন যুক্তিতর্কে লাভ হবে না। রাজা তার সিদ্ধান্তে অটল। ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না।
রাজা পাথরের সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বিচারসভা শেষ। এবার ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল রাজার কোমরে একটা চামড়ার কোমর বন্ধনী। তাতে গোল গোল সোনা বসানো। তাহলে একটা গুহার রাজা হলেও রাজা সোনার মূল্য বোঝে। রাজা গুহার সামনের দিকে চলে গেল।
ফ্রান্সিস কয়েদঘরে ফিরে এল। হ্যারি এগিয়ে এল। বলল–কথা হল?
-হ্যাঁ। আমাদের মুক্তি নেই। রাজা জলদস্যুদের কাছে আমাদের বিক্রি করবে বলে বন্দী করে রেখেছে। ফ্রান্সিস বলল।
বলো কি? হ্যারি বেশ আশ্চর্য হল। বলল–রানী কিছু বলল?
–রানি ছিল না। আমি বোঝবার চেষ্টা করলাম। লাভ হল না। রাজা স্থির প্রতিজ্ঞ। আমাদের ক্রীতদাসের জীবন মেনে নিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
বন্ধুরা সব কথা শুনল। শাঙ্কো এগিয়ে এল, বলল–ফ্রান্সিস–এখন আমরা আর ক্লান্ত নই। আমরা লড়াই করে পালাতে পারবো।
না। সেই অসম লড়াইয়ে অনেকের প্রাণ যাবে। এটা আমি মেনে নেব না। ক্রীতদাসের জীবন মেনে নিলে তবু তো আমরা বেঁচে থাকবো। একবার তো ক্রীতদাসের জীবন থেকে পালিয়েছি। সময় সুযোগ বুঝে আবার পালাবো। কিন্তু অসম লড়াইয়ে নামলে অনেকেই মারা যাবো। অপেক্ষা কর। দেখা যাক ঘটনা কোনদিকে গড়ায়? ফ্রান্সিস বলল।
সেদিন দুপুরে। সবার খাওয়া হয়ে গেছে। প্রায় অখাদ্য খাবার। তবু ভাইকিংরা পেট পুরে খায়। ফ্রান্সিস বলে–শরীর ঠিক রাখো। পেটপুরে খাও।
ভাইকিংরা কেউ কেউ আধশোয়া হয়ে আছে। বেশিরভাগ বসে আছে। এইটুকু গুহাঘর। শোওয়া প্রায় অসম্ভব। হঠাৎ প্রচন্ড দুলুনি। সেইসঙ্গে গুগুর শব্দ।
দুচারজন ভাইকিং উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। পারল না। দুলুনিতে ছিটকে পড়ল। সমস্ত পাহাড়াটাই দুলে উঠল। কয়েদঘরের বাঁ পাশের পাথুরে দেয়াল হুড়মুড় করে। ভেঙে পড়ল। নিচেই সমুদ্রের জল। ঢেউয়ের মাথায় রোদ ঝাচ্ছে। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–ভাইসব ভূমিকম্প। সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ো। ওদিকে গুহাঘরের ভিতর থেকে স্ত্রী পুরুষ শিশুর আর্ত চিৎকার কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। মশাল নিভে গেছে।
ফ্রান্সিসের নির্দেশে বন্ধুরা সবাই বাইরের সমুদ্রের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বাইরে দুপুরের রোদ। সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস জল থেকে মুখ তুলে চেঁচিয়ে বলল–গুহা মুখের দিকে সাঁতরে চলো। আমাদের জাহাজ উদ্ধার করতে হবে।
সবাই গুহা মুখের দিকে সাঁতারে চলল। তখনই দেখা গেল ডানদিকে পাহাড়ের একটা অংশ ভেঙে পড়ল। গুর গুর শব্দ কমল। সমুদ্রের জলে ঢেউয়ের মাতামাতি। তার মধ্যে দিয়েই ফ্রান্সিসরা সাঁতরে চলল।
গুহামুখের কাছে এল সবাই। একে একে গুহার মধ্যে ঢুকল। নিচ্ছিদ্র অন্ধকার চারদিক। সব মশাল নিভে গেছে। ততক্ষণে গুন্ গুন্ শব্দ থেমে গেছে।
শাঙ্কোই সবার আগে সাঁতরে যাচ্ছিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই অন্ধকারটা ওর চোখে সয়ে গেল। অস্পষ্ট দেখল রাজার সিংহাসন বসানো পাথরের বেদীটা ভেঙে দুভাগ হয়ে গেছে। কালো মানুষদের চিৎকার আর্তস্ব তখনো শোনা যাচ্ছে।
শাঙ্কো এবার স্পষ্ট দেখল ওদের জাহাজের গা। ও সাঁতারে গিয়ে জাহাজের ঝোলানো দড়ি ধরে হাঁপাতে লাগল। ততক্ষণে ফ্রান্সিসরাও এসে গেছে। আবছা অন্ধকারে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে ফ্রান্সিস দড়ি ধরে হাঁপাতে লাগল। ও খুঁজছিল হ্যারিকে। একটু গলা চড়িয়ে ডাকল–হ্যারি? একটু দূর থেকে হ্যারি বলল–যাচ্ছি। একটু পরেই হ্যারি এসে দড়ি ধরল। মুখ হাঁ করে হাঁপাতে লাগল।
