ফ্রান্সিস গরাদের দিকে ছুটে গেল। হাতছানি দিয়ে প্রহরীকে ডাকল। প্রহরী কাছে এল আকার ইঙ্গিতে দলপতিকে ডাকতে বলল। প্রহরীটি বুঝল সেটা। ও চলে গেল। ফ্রান্সিস গরাদের কাছে অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছু পরে দলপতি এল। ফ্রান্সিস গরাদে মুখ চেপে বলল–আমাদের তিন বন্ধু। খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। একজন বৈদ্য ডেকে দাও।
খুব অসুখ? দলপতি বলল।
–হ্যাঁ। তাড়াতাড়ি চিকিৎসা দরকার। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখি। দলপতি বলল। তারপর চলে গেল।
ফ্রান্সিস হ্যারির পাশে এসে বসল। অপেক্ষা করতে লাগল যদি কোন বৈদিটৈদ্যি আসে।
রাত হল। খাওয়ার সময় হল তখনও বৈদি এল না। প্রহরীরা দফায় দফায় ওদের খাবার দিয়ে গেল। ফ্রান্সিস মনের এই উদ্বেগ নিয়েও পেট পুরে খেল। শরীর ঠিক রাখতে হবে।
একটু রাতে দলপতি এল। তার পেছনে একজন রোগা লিকলিকে কালো মানুষ। কোঁকড়ানো মাথার চুল দাড়ি গোঁফ। কাঁধে একটা মোটা কাপড়ের ঝোলা ঝোলানো। বোধহয় কাপড়টা জাহাজের পাল থেকে কাটা।
বৈদ্যি হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকল। পাথুরে মেঝেয় ঝোলাটা রাখাল। ফ্রান্সিস ইঙ্গিতে হ্যারিকে দেখাল। বৈদ্যি হ্যারির কপালে হাত দিয়ে দেখল। হ্যারির গলায় হাত দিয়ে দেখল। দুচোখের পাতা টেনে দেখল। ফ্রান্সিস দুই অসুস্থ বন্ধুকেও দেখাল। বৈদ্যি তাদেরও দেখল। এবার ঝোলা থেকে দুটো চিনে মাটির বোয়াম বার করল। দুটো বোয়াম থেকে কাদার মত কালো দুটো জিনিস বাঁ হাতের তালুতে ঢালল তারপর দুটো হাতের তালু ঘষতে লাগল। কিছু পরে দেখা গেল কাদার মত জিনিসগুলো শক্ত হয়ে গেছে। বৈদ্যি তাই থেকে বেশ কয়েকটা বড়ি বানাল। বড়িগুলো তিন ভাগ করল। ছটা করে ভাগ ফ্রান্সিসের দিকে এগিয়ে দিল। প্রথমে একটা আঙ্গুল দেখাল। তার মানে একবার। তারপর তিনটে আঙ্গুল দেখাল। তার মানে তিনবার করে। এবার একটু হেসে হাতের তালু দেখাল। বোধহয় অভয় দিল। তারপর বোয়াম ঝোলায় পুরে চলে গেল হামাগুড়ি দিয়ে। ফ্রান্সিস একটু আশ্বস্ত হল। হয় তো এই ওষুধেই কাজ হবে।
দিন দুয়েকের মধ্যে অসুস্থ দুই বন্ধুর সুস্থ হল। হ্যারিও অনেকটা সুস্থ হল। বৈদ্যি অবশ্য দুদিন ধরেই ওষুধ দিয়ে গেছে। কিন্তু হ্যারিকে নিয়ে ফ্রান্সিসের দুশ্চিন্তা গেল না। হ্যারি যদি আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে? গভীরভাবে ফ্রান্সিস ভাবতে লাগল কী করে এই কয়েদঘর থেকে পালানো যায়। এখানে দিনের পর দিন থাকলে কারো বাঁচার আশা নেই। এর মধ্যে ঘটল এক কান্ড। সেই রাতে দু’জন প্রহরী খাবার দিতে এসেছিল। সবারই খাওয়া হয়ে গেছে তখন। হঠাৎ সিনাত্রা পাগলের মতো এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে এক প্রহরীর চিবুকে প্রচন্ড জোরে ঘুষি মারল। প্রহরীটি ছিটকে দরজার উপরে পড়ল। সিনাত্রা দরজার দিকে দ্রুত গেল। কিন্তু পায়ের কাছে পড়ে থাকা প্রহরীটিকে ডিঙ্গোতে পারল না। অন্য প্রহরীটি ততক্ষণ দরজার কাছে এসে গিয়েছে। সে পাথরের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা বর্শাটা তুলে নিল। বর্শার মুখ তাক করে ধরল সিনাত্রার দিকে। সিনাত্রা আর দরজা দিয়ে বেরোতে পারল না।
ঘুষিতে আহত প্রহরীটিকে নিয়ে দরজায় তালা লাগিয়ে প্রহরীটি চলে গেল।
কিছু পরে তিন-চার জন যোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে দলনেতা ফিরে এল। ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–তোমাদের একজন্ম আমাদের এক প্রহরীকে আহত করেছে। ফ্রান্সিস কোন কথা বলল না। বলবার কিছু নেই। সিনাত্রা পাগলের মত যা কান্ড করলে এতে যে ওদের বিপদ বাড়ল সেটা বুঝল ও। ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে ফ্রান্সিস এবার বলল-যা হবার হয়েছে। প্রহরীকে মারা উচিত হয়নি। অনুরোধ রাজা নিকুম্বাকে কিছু বলল না।
রাজা জানলে–উষ্ণকুন্ডে–মরণ। দলনেতা বলল।
–সেটা জানি বলেই বলছি রাজা যেন কিছু না জানে। ফ্রান্সিস বলল।
-বেশ–এবারের মতো–দলপতি বলল। চারজন যোদ্ধাকে পাহারায় রেখে দলপতি চলে গেল।
ফ্রান্সিস সিনাত্রাকে কাছে ডাকল। সিনাত্রা কাছে এল। ফ্রান্সিস বলল–অত্যন্ত অন্যায় কাজ করেছে। বোকার মত। এখনও হ্যারি বন্ধুরাও সম্পূর্ণ সুস্থ হয় নি। এর মধ্যে এই কান্ড করে পাহারাদারদের সংখ্যা বাড়িয়ে দিলে। দু’জন প্রহরী থাকলে তবু পালানো সম্ভব ছিল। এখন সেটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। তোমার জন্যে। সিনাত্ৰা ঘাড় গোঁজ করে বসে ছিল। বলল–এখানে থাকলে এমনিতেই মরবো।
–না। তার আগেই পালাবো। তখন তোমার সাহস আক্রমনের ক্ষমতা এসব দেখিও। পরিকল্পনা করে কাজ করতে হয়। ভুলে যেও না রাজকুমারী জাহাজে বন্দী হয়ে আছে। তাকে নিয়ে পালাতে হবে। কাজটা সহজসাধ্য নয়। সব পরিকল্পনা বানচাল করে দিলে। তোমার জন্য বিপদ বাড়ল। রাজা যদি এই ব্যাপারটা জানতে পারে আমাদের পালাবার সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে। উকুন্ডে ছুঁড়ে ফেলবে আমাদের। তুমি একা পালাতে গিয়ে সবাইকে ভীষণ বিপদে ফেললে। এখন আমাদের জীবন সংশয়। বেঁচে থাকব কিনা জানি না। তবে তোমাকে বলি এরকম অবিবেচকের মত কাজ করে না। যাও নিজের জায়গায় যাও। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসদের ভাগ্য ভাল দলপতি রাজা নিকুম্বাকে কিছু বলল না। অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেল ফ্রান্সিসরা। এবার এই অন্ধকূপ থেকে পালাবার উপায় ভাবতে হবে। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু ফ্রান্সিসের চোখে ঘুম নেই। একটাই চিন্তা কী করে বন্ধুদের নিয়ে মারিয়াকে নিয়ে পালানো যায়। তবে লড়াই করে নয়। বুদ্ধি করে সবাইকে নিরাপদে নিয়ে কী করে এই দুঃসহ জীবন থেকে বাঁচা যায়।
