ফ্রেদারিকো থেমে থুঃ থুঃ করে চিবানো তামাকপাতা ফেললো। আবার কোমরে গোঁজা তামাকপাতা নিয়ে মুখে ফেলে চিবুতে লাগল।
–আচ্ছা জলের টানটা কি নীচু থেকে এসেছিল? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–হ্যাঁ।
–তুমি কি তলিয়ে গিয়েছিলে?
–হ্যাঁ। সে কি টান!
–হুঁ। তারপর? ফ্রান্সিস বলল।
-–তারপর সাঁতরেই সোফালা বন্দর চলে এলাম। নিজের জাহাজে উঠলাম। মুক্তোটা বেশ কিছুদিন সকলের চোখের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলাম না। জাহাজের সবাই মুক্তোটার কথা জেনে গেল। বাধ্য হয়ে সবাইকে মুক্তোটা দেখালাম। সকলেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। এতবড় মুক্তো? মানুষের কল্পনার বাইরে। জাহাজী বন্ধুদের কাছে আমার কদর বেড়ে গেল। ক্যাপ্টেনও আমাকে সমীহ করতো?
–তারপর?
–ওটাই আমার বিপদের কারণ হলো। লা ব্রুশ আমাদের জাহাজ অধিকার করলো। সবাইকে এই কয়েদঘরে বন্দী করে। জাহাজ লুঠ করলো। তখনই নিজে বাঁচবার জন্যে, আমাদের ক্যাপ্টেন এক চাল চাললো। ক্যাপ্টেন বলল–যদি আমাদের সবাইকে ছেড়ে দাও, তাহলে তোমাকে হাঁসের ডিমের মত একটা মুক্তো দিতে পারি! লা ব্রুশের চোখ লোভে চক্-চক্-রে উঠল। ও রাজী হলো। আমার কাছ থেকেও মুক্তোটা ছিনিয়ে নিলো! আর সব বন্ধুরা মুক্তি পেলো। জাহাজে করে চলে গেলো। আমি কিন্তু মুক্তি পেলাম না। সেই থেকে এই কয়েদঘরে আছি। কতদিন, কতবছর জানি না। লা ব্রুশ এখানে এসে কখনো ধমকায়, চাবুক মারে। কখনো ওর ঘরে নিয়ে আমার কাছ থেকে জানতে চায় মুক্তোর সমুদ্র থেকেকি করেমুক্তো নিয়ে অক্ষত দেহেফিরে আসা যায়। মারের মুখেআমি সবই বলেছি। কিন্তু বলি নি এই আয়নার কথা, চাঁদের দ্বীপের নক্সার কথা। কঁচ পাহাড়কিক’রে পেরোলাম, সেই রহস্য তো আমি নিজেও আজ পর্যন্ত ভেদ করতে পারি নি।
ফ্রেদারিকো থামলো। তারপর আস্তে-আস্তে বললো–ফ্রান্সিস তোমাকে সবটাই বললাম। কিন্তু তুমি না গেলেই ভালো। ভাজিম্বাদের একটা প্রবাদই আছে–যদি চিরদিনের জন্যে কোথাও যেতে চাও, তাহলে মুক্তোর সমুদ্রে যাও।
ফ্রান্সিস কোন কথা বললো না। পেছনের কাঠে ঠেসান দিয়ে চুপ করে চোখ বন্ধ করে বসে রইল। গম্ভীর ভাবে ভাবতে লাগল ফ্রেদারিকোর বলা সমস্ত ঘটনাগুলো। মুক্তোর সমুদ্রে পৌঁছানোর সমস্যার সমাধান সহজ না হলেও খুব কঠিন নয়। অরণ্য অঞ্চলে ভাজিম্বাদের পাতা ফাঁদগুলো সম্পর্কে সাবধান হলেই নিরাপদে মুক্তোর সমুদ্রে পৌঁছোনো যাবে। কিন্তু তারপর? লাফ মাছের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচানো গেলেও মুক্তোর সমুদ্র থেকে বেরিয়ে আসবে কি করে? ফ্রেদারিকো যখন অক্ষত দেহে বেরিয়ে আসতে পেরেছে, তখন সুড়ঙ্গ বা গভীর খাদ একটা কিছু আছে। কিন্তু সেটা কোথায় আছে? ফ্রেদারিকোর কথা থেকে সঠিক কোন উপায় বের করা যাচ্ছে না। তবে কি আয়নাটার মধ্যেই কোন রহস্য আছে? আয়নাটা ভালভাবে পরীক্ষা করলেই হয়তো সমাধানেই ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। ফ্রান্সিস গভীরভাবে এই সমস্যার নানা সমাধানের কথা ভাবতে লাগল। কিন্তু ভেবে-ভেবে কোন কুল-কিনারা পেল না। ফ্রেদারিকো জলের টানে বেরিয়ে এসেছিল। এটা কোন গর্ত বা সুড়ঙ্গ বা খাদের অস্তিত্বের কথা বোঝাচ্ছে। কিন্তু সেটা সঠিক কোথায়, ফ্রেদারিকো তাও বলতে পারছে না। সমুদ্রের-জোয়ার ভাটার সঙ্গে এর কোন সম্বন্ধ আছে কিনা কে জানে। ফ্রান্সিস এবার চোখ খুলল। বললো–ফ্রেদারিকো তোমার আয়নাটা একবার দাও তো।
–কেন?
–দেখি, ওটা থেকে এর রহস্য ভেদ করা যায় কিনা।
ফ্রেদারিকো গলা থেকে দড়িতে বাঁধা আয়নাটা ওকে দিল। ফ্রান্সিস খুব মনোযোগ দিয়ে ভাঙা আয়নাটা দেখতে লাগল। আয়নাটা দেখতে এই রকম–
ফ্রান্সিস আয়নাটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে লাগল। ও একটা জিনিস বুঝল, যে আয়নাটা ওভাবে ভাঙেনি। ঐ রকম আঁকাবাঁকা ছুঁচালো মুখ করে ওটা কাটা হয়েছে। আয়নাটার পেছনে পারার পলেস্তারা বেশ মোটা। তাই আলো প্রতিফলনের ক্ষমতা এই আয়নাটার অনেক বেশি। আয়নাটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নানাভাবে দেখেও ফ্রান্সিস কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। আর পাঁচটা সাধারণ আয়না থেকে এর কাঁচটা মোটা। এইটুকুই বুঝল শুধু। আয়নাটা বিশেষ যত্নে তৈরী, এটা বুঝতে অসুবিধা হল না। আয়নাটার নীচের দিকে একটা ফুটো। ঐ ফুটোর মধ্যে দিয়ে দড়ি গলিয়ে লকেটের মত গলায় ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থা। এই জন্যে কি ফুটোটা করা হয়েছে, না ফুটোটার অন্য কোন তাৎপর্য আছে। গলায় ঝুলিয়ে রাখার সুবিধের জন্যেই ফুটোটা করা হয়েছে। এ ছাড়া আর কি কারণ থাকতে পারে? ও আয়নাটা ফ্রেদারিকোকে দিল।
দিন যায়, রাত যায়। ক্যরাভেল চলেছে। হঠাৎ একদিন রাত্রে ফ্রেদারিকো ভীসণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। ওর ভীষণ জ্বর এলো। প্রায় অজ্ঞানের মত অসাড় পড়ে রইলো? বেঞ্জামিন লুকিয়ে ওষুধ এনে দিলো। ফ্রান্সিস ওষুধ খাওয়ালো। দু’তিনবারে ওষুধ পড়তে একটু সাড় এলো শরীরে। ওরা মনে করলো বিপদ কাটলো। ফ্রেদারিকো অসুস্থ হয়ে পড়েছে শুনে লা ব্রুশ কাঠের পা নিয়ে ঠক্ ঠক্ করতে করতে এল। ফ্রেদারিকোর সামনে দাঁড়িয়ে ডাকল–এই ফ্রেদারিকো–আর ঢঙ দেখিও না।
-–ও সত্যিই অসুস্থ–ফ্রান্সিস বলল–ওর হাত খুলে দিতে বলুন।
লা ব্রুশ খুক খুক করে হেসে উঠল—কিসসু হয়নি–দু’ঘা চাবুক পড়লেই উঠে দাঁড়াবে।
