হ্যাঁ। হ্যারি মাথা কাত করল।
গুহার মধ্যেই কোনার দিকে একটা পাথরের চৌবাচ্চা মত। তাতে জল রাখা। সবাই হাত মুখ ধুল।
কিছু পরে প্রহরীরা সকালের খাবার দিয়ে গেল। সেই দফায় দফায় পাথরের থালায়। পোড়া রুটি আর সবজির ঝোল। সবজির ঝোলের স্বাদটা ভালই। সবাই পেটপুরেই খেল।
ফ্রান্সিস প্রহরীটিকে বলল–তোমাদের দলনেতা কোথায়? প্রহরীটি কিছুই বুঝল না। এবার হ্যারি আকার ইঙ্গিতে দলনেতার কথা বোঝাল। এবার প্রহরীটি বুঝল। মৃদুস্বরে কী বলল। তারপর মাথা ওঠানামা করল। বোঝা গেল দলপতি আসবে।
এখানে তো অন্ধকারের রাজত্ব। রোদ নেই যে ফ্রান্সিসরা কত বেলা হল বুঝবে। তবে বেশ কিছুক্ষণ পরে দলপতি এল। ফ্রান্সিস গরাদের কাছে এগিয়ে গেল। গরাদে গাল চেপে বলল-রাজামশাই সভায় এসেছেন?
-না–পরে। দলপতি বলল।
এলে আমাকে বলবেন–রাজার সঙ্গে একটু কথা আছে। ফ্রান্সিস বলল। দলপতি মাথা ওঠা নামা করল। তারপর বলল–সকালে–খাবার-।
– হ্যাঁ খেয়েছি। অনেক ধন্যবাদ। দলপতি মৃদু হাসল।
দলপতি প্রহরীদের কী বলল। তারপর চলে গেল। ফ্রান্সিস ওর ফিরে আসার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরে দলপতি ফিরে এল। একজন প্রহরীকে কী বলল। প্রহরী সেই গুহার ঘরের দরজা খুলে দিল। হামাগুড়ি দিয়ে ফ্রান্সিস মারিয়াকে নিয়ে বেরিয়ে এল। দলপতির পেছনে পেছনে চলল। গুহাপথে কালো মানুষদের পাতা সংসার। সে সবের পাশ দিয়ে চলল তিনজনে।
সেই বেদীমত উঁচু জায়গায় পৌঁছাল দুজনে। ফ্রান্সিস দেখল রাজা নিকুম্বা পাথরের আসনে বসে আছে। বোধহয় বিচার চলছে। পাথরের ছোট আসনে রানি বসে আছে। গলায় মারিয়ার গলার হার। রানি আপন মনে হাসছে। হারটায় হাত বুলোচ্ছে। বোঝা গেল হার পেয়ে রানি খুব খুশি হয়েছে।
কয়েকজন কালো মানুষ রাজার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের মধ্যে একজন একনাগাড়ে কী বলে যাচ্ছে। রাজা শুনছে। মাঝে মাঝে ভুরু কোঁচকাচ্ছে। লোকটির বলা শেষ হল। রাজা চিৎকার করে কী বলে উঠল। দুজন যোদ্ধা বশা হাতে ছুটে এসে দু’জন কালো মানুষকে ধরল। টেনে নিয়ে চলল ফ্রান্সিসরা যে কয়েদঘরে আছে সেইদিকে। রানিও হাসতে হাসতে ওদের পেছনে পেছনে চলল। ফ্রান্সিস বুঝল–ওদের মৃত্যুদন্ড হয়েছে। নিশ্চয়ই ঐ উষ্ণকুন্ডে এদের ছুঁড়ে ফেলা হবে। সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখতেই বোধহয় রানিও যাচ্ছে। ওদের মৃত্যু যন্ত্রণা রানি তাকিয়ে তাকিয়ে উপভোগ করবে। ফ্রান্সিস দু’চোখ বুজে একবার ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিল। অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে ওরা বেঁচে গেছে।
এবার এক বৃদ্ধকে ধরে একজন যোদ্ধা রাজার সামনে নিয়ে এল। বৃদ্ধটি মাথা নিচু করে একনাগাড়ে কী বলে গেল। রাজা ডান হাত তুলে ইঙ্গিত করল। একজন যোদ্ধা। এগিয়ে এসে বৃদ্ধকে সরিয়ে নিয়ে এল। বৃদ্ধটি হাসতে হাসতে বার বার মাথা নিচু করে চলে এল।
বোধহয় বিচার পর্ব শেষ হল। দলপতি রাজাকে কাছে গিয়ে কিছু বলল। রাজা ফ্রান্সিস আর মারিয়াকে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করল।
ফ্রান্সিস আর মারিয়া এগিয়ে গেল। একটু মাথা নিচু করে ফ্রান্সিস মারিয়াকে দেখিয়ে বলল–ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী। কয়েদঘরের কষ্টকর জীবন ইনি সহ্য করতে পারবেন না।
–বন্দী–থাকতে হবে। রাজা বলল।
–যদি রাজকুমারীকে আমাদের জাহাজে বন্দী করে রাখেন তাহলে আমরা বাধিত হব। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা? রাজা নিকুম্বা বলল।
–আমরা কয়েদঘরেই থাকবো। রাজকুমারীকে বন্দী রেখে আমরা পালাতে পারব না।
এই সময় রানি ফিরে এল। আগের মতই হাসতে হাসতে। এসে রাজার পাশে ছোট পাথরের আসনে বসল। রাজা রানিকে কিছু বলল। বোধহয় ফ্রান্সিসের আবেদনের কথাই বলল। রানি খিলখিল্ করে হেসে উঠল। তারপর মারিয়ার দিকে তাকিয়ে কী বলে উঠল। ফ্রান্সিস মারিয়া কিছুই বুঝল না। এবার রাজা বলল, বেশ–পাহারা থাকবে। ফ্রান্সিস হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বলল–অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
— তোমরা এত কষ্টের মধ্যে থাকবে আর আমি–মারিয়া বলল।
–ওসব ভাবনা ছাড়ো। এছাড়া কোন উপায় নেই। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল।
রাজা কী বলে উঠল। দু’জন যোদ্ধা বর্শা হাতে এগিয়ে এল। দলপতি মারিয়াকে বলল–জাহাজ–হ্যাঁও।
দুজন যোদ্ধার পেছনে পেছনে মারিয়া পাটাতনের উপর দিয়ে হেঁটে নিজেদের জাহাজের ডেক এ নামল। তারপর সিঁড়ি দিয়ে কেবিনঘরে নেমে এল।
এবার ফ্রান্সিস রাজার দিকে তাকাল। বলল–আমাদের বন্দী রেখে আপনার কী লাভ। আমাদের জাহাজ তল্লাশী করেও মূল্যবান কিছু পাননি। এবার আমাদের মুক্তি দিন। রাজা ঝাঁকড়া-চুলো মাথা নেড়ে বলল না। দলপতিকে বলল- কয়েদঘর। দলপতি ফ্রান্সিসের দিকে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। উপায় নেই। বন্দীদশাই মেনে নিতে হবে।
দলপতির সঙ্গে ফ্রান্সিস কয়েদঘরে ফিরে এল। হ্যারি জিজ্ঞেস করল–রাজা রাজি হল?
–হ্যাঁ। মারিয়া জাহাজেই থাকবে। কিন্তু আমাদের মুক্তি দেবে না। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি কিছু বলল না। উপায় নেই। বন্দীদশা মেনে নিতেই হবে।
গুহাঘরে দুঃসহ অবস্থার মধ্যে ফ্রান্সিসদের দিনরাত কাটতে লাগল। প্রায় অখাদ্য খাবার পানীয় জলের টানাটানি অসহ্য গরম–এসবের মধ্যে দিয়েই ফ্রান্সিসদের বন্দীজীবন কাটতে লাগল।
দু’জন বন্ধু বিশেষ করে শরীরের দিক থেকে দূর্বল হ্যারি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ল। হ্যারির চিকিৎসার প্রয়োজন। প্রচন্ড জ্বরে হ্যারি প্রায় অজ্ঞানের মতো হয়ে গেল। ওদের এক বন্দি পোশাকের প্রান্ত ছিঁড়ে জলে ভিজিয়ে হ্যারির কপালে চেপে চেপে দিতে লাগল। অন্য দুই বন্ধু চুপ করে শরীরের অসুস্থতা সহ্য করতে লাগল।
