–রাজা নিকুম্বা– বিশ্রাম।
ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকাল। বলল–রাজার সঙ্গে তো এখন কথা হবে না। আজকের রাতটা কষ্ট করে থাকো।
–তোমরা কষ্ট করে থাকলে আমিও থাকবো। মারিয়া বলল।
–না না। কাল রাজার সঙ্গে কথা বলবো। ফ্রান্সিস বলল।
এবার ফ্রান্সিস আর মারিয়া হামাগুড়ি দিয়ে কয়েদ ঘরে ঢুকল। মশালের আলোয় দেখল বন্ধুরা বেশ চাপাচাপি করে বসেছে। বাসযোগ্য ঘর তো নয়। গুহারই একটা অংশ। ওরই মধ্যে ফ্রান্সিস হ্যারিকে নিয়ে গুহার এবড়ো খেবড়ো পাথুরে দেয়ালে গা ঠেকিয়ে বসল। হ্যারি এগিয়ে এল। বলল–ফ্রান্সিস–এতো অন্ধকূপ। রাজকুমারী এখানে থাকতে পারবেন?
–রাজা নিকুম্বা এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন। কালকে সকালে রাজার সঙ্গে কথা বলবো। যে করে তোক মারিয়াকে আমাদের জাহাজে রাখতে হবে। খাবার টাবারও ওরাই দিয়ে আসবে। আজ রাতে আর কিছুই ব্যবস্থা করা যাবে না। বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। এই বন্দী দশা কিছু বন্ধু মেনে নিতে পারছিল না। সিনাত্রা ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–লড়াই করে জাহাজ নিয়ে পালালে হত। ঐ গাদাগাদির মধ্যে বেশ কয়েকজন বন্ধু কোনরকমে আধশোয়া হয়ে পড়ে ছিল। ফ্রান্সিস ওদের দেখিয়ে বলল–ঐ দেখ কী পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে ওরা। উঠে বসে থাকার সাধ্যটুকুও নেই। শরীরের এই অবস্থা নিয়ে লড়তে গেলে অনেক বন্ধুর মৃত্যু হত। আমি সেটা চাইনি।
–কিন্তু এখানে এভাবে বন্দী জীবন কাটাতে গিয়েও তো অনেকে মারা যেতে পারে। সিনাত্রা বলল।
তার আগেই পালাতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–পারবে? সিনাত্রা বলল।
–পারতেই হবে। তখন সুস্থ সবল শরীর নিয়ে লড়াই করতে হবে। এখন সময় ও সুযোগের প্রতীক্ষা। বন্ধুদের বোঝাও সেটা। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখি…বোঝাতে পারি কিনা। সিনাত্রা উঠে বন্ধুদের কাছে চলে গেল।
রাত বাড়ল। ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন থেমে গেছে। ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে লড়াই করা সত্যিই সম্ভব ছিল না। এখন ভরসা ফ্রান্সিস। যদি পালানোর উপায় ভেবে দেখতে হয় সে ক্ষেত্রে ফ্রান্সিসই একমাত্র পারবে।
একসময় লোহার গরাদে শব্দ তুলে দরজা খুলে গেল। প্রহরী দু’জন খাবার নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকল। পাথর কুঁদে থালা মত তৈরি করা হয়েছে। পাঁচটা করে রুটি ঐ থালায় খেতে দেওয়া হল। মাছের টুকরো বোধহয় ভাজাই হয় নি। আঁশটে গন্ধ। প্রায় কেউই কোনরকমে খেল। ফ্রান্সিস তখনও খায়নি। ও রান্নার অবস্থা বুঝতে পারল। গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–খেতে ভালো না লাগলে নাক টিপে খাও। পেটপুরে খাও। শরীরটা তেজি রাখো। কম খেয়ে শরীর দূর্বল হলে পালাবার শক্তি থাকবে না। বন্ধুরা ফ্রান্সিসের কথা শুনল। কেউ আঁশটে গন্ধ সত্ত্বেও খাবার ফেলল না। পেট পুরেই খেলো সবাই। থালা কম। কাজেই দফায় দফায় খেতে হল।
সবার খাওয়া হলে প্রহরীরা এঁটো থালা নিয়ে বেরিয়ে গেল। দরজায় তালা লাগিয়ে বর্শা হাতে পাহারা দিতে লাগল।
শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল কী করবে ফ্রান্সিস?
–সব দেখিটেখি। উপায় একটা হবেই। ফ্রান্সিস বলল।
–পাহারাদার তো মোটে দু’জন। খাবার দিতে তো ঐ দু’জনই আসে। ঐ দুটোকে কবজা করে পালানো যায় না? শাঙ্কো বলল।
এখন নয়। এখন শুধু বিশ্রাম। দিন কয়েক চুপচাপ থাকো। পাহারাদাররা পাহারায় একটু ঢিলে দিক। ফ্রান্সিস বলল। ভেবে দেখো তাহলে। এই কথা বলে শাঙ্কো নিজের জায়গায় চলে গেল।
একে শরীরের ক্লান্তি। তারপর এইভাবে গাদাগাদি করে থাকা, গুহায় অসহ্য গরম। প্রায় সবাই ভালো করে ঘুমতে পারল না। হ্যারির কষ্ট হল সবচেয়ে বেশি। একে ও শরীরের দিক থেকে বরাবরই দুর্বল। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–হ্যারি খুব কষ্ট হচ্ছে? হ্যারি ম্লান হাসল। বলল–তা একটু হচ্ছে।
–উপায় নেই। সহ্য কর। ফ্রান্সিস বলল।
–আমার ভয় কি জানো? হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া–এই রোগ তো আমার আছে। হ্যারি আস্তে আস্তে বলল। ফ্রান্সিস বেশ চমকাল। হ্যারির কাঁধে হাত রেখে বলল–আমার উরুর উপর মাথা রাখো।
-না-না। হ্যারি মাথা নাড়ল। ফ্রান্সিস শুনল না। হ্যারির মাথাটা ধরে নিজের উরুর ওপর শুইয়ে দিল। মারিয়া দেখল সেটা। একটু এগিয়ে হ্যারির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। একটু পরেই হ্যারি ঘুমিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল মারিয়া তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও। হ্যারিকে আমি দেখছি। মারিয়া আপত্তি করল না। সরে এসে গুহার এবড়ে খেবড়ো পাথরের মেঝেয় মাথা রেখে আধশোয়া হল। ফ্রান্সিস বসে থেকেই ঘুমিয়ে পড়ল। ওর এভাবে ঘুমোবার অভ্যেস আছে।
ভোর হল। ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। একজন দু’জন করে বন্ধুরা ঘুম থেকে। উঠতে লাগল। ওদের অস্বস্তি দেখেই ফ্রান্সিস বুঝতে পারল অনেকেরই ভালো ঘুম। হয়নি। ততক্ষণে মারিয়ারও ঘুম ভেঙে গেছে। ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকাল। বলল–ঘুম হয়েছে?
–ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়েছি। মারিয়া বলল।
–সে কি! সারারাত ঘুম হয়নি? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–ঐ সব মিলিয়ে ঘন্টা দুয়েক। মারিয়া বলল।
ফ্রান্সিস আর কিছুই বলল। হ্যারিরও তখনই ঘুম ভাঙল। তাড়াতাড়ি ফ্রান্সিসের উরু থেকে মাথা তুলে হেসে বলল–আমার জন্যে তোমার বোধহয় ঘুম হয় নি।
–আমি গাছের গুঁড়ির মতো ঘুমিয়েছি। তোমার ঘুম হয়েছে তো? ফ্রান্সিস বলল।
