রাজা নিকুম্বা দাড়ি গোঁফের ফাঁকে একটু হেসে ভাঙা ভাঙা পোর্তুগীজ ভাষায় বলল-কে-তোমরা?
–আমরা ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল।
–কেন–এখানে? রাজা জানতে চাইল।
আমরা দেশে দেশে দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে বেড়াই। গোপন ধন ভান্ডার উদ্ধার করি। ফ্রান্সিস বলল।
নিয়ে পালাও। রাজা নিকুম্বা বলল।
না। সেই গুপ্ত ভান্ডারে যার অধিকার তাকে দিয়েদি। ফ্রান্সিস বলল
বদলে—নাও–না। রাজা নিকুম্বা বলল।
–না। একটা তামার মুদ্রাও নিই না। ফ্রান্সিস বলল।
রাজার সঙ্গে ফ্রান্সিসের কথা হচ্ছে তখনই রানি এল। পরনে রাজার মতই ঢোলা হাতা হলুদ রঙের ময়লা পোশাক। যেমন কালো তেমনি মোটা। মাথায় কঁকড়া লম্বা চুল। রাজার পাথরের আসনের পাশেই একটা ছোট পাথরের আসনে বসল। এসে অব্দি রানী হেসেই চলেছে। কালো মুখে সাদা দাঁতের হাসি। মারিয়াকে দেখে রানির হাসি বেড়ে গেল। রাজাকে ফিফিস্ করে কী বলল। রাজা মারিয়াকে দেখিয়ে ফ্রান্সিসকে বলল
কে?
–আমাদের দেশের রাজকুমারী মারিয়া। ফ্রান্সিস বলল। রাজা রানীকে কী বলল। রানীর হাসি বেড়ে গেল। অবাক চোখে মারিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল। মারিয়ার গা জ্বলে গেল। কিন্তু কিছুই বলার নেই। এখন রাজা রানির দয়ার ওপর ওদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
এবার রাজা একই গম্ভীরস্বরে বলল-জলদস্যু–তোমরা। ফ্রান্সিস একটু চমকাল। পরক্ষণেই বলে উঠল–এই অপবাদ আমাদের অনেকেই দিয়েছে। কিন্তু আমরা জলদস্য নই। আমরা কখনও কারো কাছ থেকে একটা স্বর্নমুদ্রাও জোর করে নিই নি। যে যেমন দিয়েছে নিয়েছি আমাদের খাদ্য পোশাকের জন্য।
উঁহু। জাহাজ দেখা হবে–খুঁজে। দামি কিছু। রাজা বলল। হ্যারি নিম্নস্বরে বলল–দামি কিচ্ছু নেই। ফ্রান্সিস কথাটা শুনল। বলে উঠল–জাহাজ তল্লাশী করতে পারেন। দামী কিছুই পাবেন না।
–দেখি। রাজা নিকুম্বা বলল। তারপর দলনেতার দিকে তাকিয়ে কী বলল। দলপতি কয়েকজন যোদ্ধাকে কী বলল। জনা ছয় সাতেক যোদ্ধা পাতা পাটাতনের দিকে গেল। পাটাতন দিয়ে হেঁটে জাহাজে উঠল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে কেবিনঘরগুলোর তল্লাশী চালাতে লাগল। মারিয়া নিশ্চিন্ত ছিল সোনার চাকতিগুলো ওরা খুঁজে পাবে না। তবে ওর নিজের পোশাক ভাইকিংবন্ধুদের পোশাক ওরা চুরি করতে পারে। এর আগেও এরকম হয়েছে। ও ওদের জাহাজের দিকে তাকিয়ে রইল কখন ঐ যোদ্ধারা ফিরে আসে।
প্রায় আধঘন্টা পরে জাহাজে তল্লাশী সেরে যোদ্ধারাদলপতির সঙ্গে ফিরে এল। মারিয়ার একটা নতুন পোশাক ভাইকিংদের কিছু নতুন পোশাক কয়েকটা তরোয়াল এসব নিয়ে যোদ্ধারা ফিরে এল। দলপতি রাজার কাছে গিয়ে কোমরের ফোট্টিতে গুঁজে রাখা মারিয়ার গলার সোনার নেকলেসটা রাজাকে দিল। রাজা দাড়ি গোঁফের ফাঁকে হেসে হারটা নিল। রানি হাসতে হাসতে রাজার হাত থেকে হারটা প্রায় কেড়ে নিয়ে হাতে জড়াল। রানি জানে না যে হারটা গলায় পরতে হয়। ফ্রান্সিস বুঝল এখন রাজারানির মন রেখে চলতে হবে। তাই মৃদুস্বরে বলল-মারিয়া-হারটা রানির গলায় পরিয়ে দিয়ে এসো। মারিয়া শুনল কথাটা মৃদুস্বরে বলল হতচ্ছাড়ি রানি।
–যাও। ফ্রান্সিস গলায় জোর দিয়ে বলল। মারিয়া আর আপত্তি করল না। আস্তে আস্তে রানির কাছে গেল। রানির হাত থেকে হারটা খুলে নিল। রানির ঝাকড়া চুল সরিয়ে গলায় পরিয়ে দিল। এবার রানি খুব খুশি। খিলখিল্ করে হেসে উঠল। এবার রাজা নিকুম্বা দলপতিকে কী বলল। রানি দু’হাত তুলে চিৎকার করে কী বলে উঠল। রাজা একটু চুপ করে থেকে দলপতিকে কী একটা আদেশ করল। দলপতি একবার মাথা ঝুঁকিয়ে নিয়ে ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাল। ওর পেছনে পেছনে আসতে ইঙ্গিত করে ডানদিকের গুহামুখ দিয়ে ভেতরে চলল। ফ্রান্সিসরাও দলপতির পেছনে পেছনে চলল। এই গুহায় রাজার প্রজাদের ঘরসংসার। সব নারীপুরুষ শিশুর দল। এখানেই রান্না খাওয়া দাওয়া শোয়া। সে সব সংসারের পাশ দিয়ে ফ্রান্সিসরা চলল। গুহার শেষে এলো ওরা। সারা গুহাটাতেই এখানে ওখানে মশাল জ্বলছে। তারই আলোয় ফ্রান্সিস দেখল একেবারে গুহার শেষে ডানদিকে একটা বিরাট গর্তমত। উত্তপ্ত বাষ্প বেরুচ্ছে গর্তটা থেকে। ফ্রান্সিস মুখ নিচু করে দেখল–গর্তের নিচে জল ফুটছে। বোঝাই যাচ্ছে কী প্রচন্ড উত্তপ্ত সেই জল। দলপতি ফ্রান্সিসের কাছে এল। মৃদুস্বরে বলল–রাজা–এই কুণ্ডে–তোমাদের শাস্তি-রানি বাঁচাল। ফ্রান্সিস বুঝল রাজা ওদের এই উষ্ণকুন্ডে ছুঁড়ে ফেলতে আদেশ দিয়েছিল। রানি আপত্তি করেছিল। তাই ওরা বেঁচে গেল। ফন্সিস মৃদুস্বরে হ্যারিকে বলল সেই কথা। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল অবধারিত প্রচন্ড যন্ত্রনাদায়ক মৃত্যু থেকে বেঁচে গেলাম। রাজকুমারীর হার পেয়ে রানি খুশি হয়েছিল।
দলপতি বাঁদিকে ঘুরল। কিছু দূর থেকেই দেখা গেল লোহার গরাদ। হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকা যায় এরকম একটা দরজা। দরজার মাথায় মশাল জ্বলছে। দরজায় একটা বড় তালা ঝুলছে। দু’জন বর্শাধারী যোদ্ধা দরজায় পাহারা দিচ্ছে।
দলপতি সবাইকে ঘরে ঢুকতে ইঙ্গিত করল। এবার ফ্রান্সিস দলপতির সামনে গেল। মারিয়াকে দেখিয়ে বলল–ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী। এই কয়েদ ঘরে থাকতে পারবেন না।
নিরুপায়–রাজা নিকুম্বার হুকুম। দলপতি বলল।
–তাহলে রাজার কাছে নিয়ে চলো। ফ্রান্সিস বলল।
