হঠাৎ ফ্রান্সিস দেখল–কিছুদূর কয়েকটা মশাল জ্বলে উঠল। বেশ চমকে উঠল ফ্রান্সিস। তার মানে এখানে মানুষের বসতি আছে। ততক্ষণ আরো কয়েকটা মশাল জ্বলে উঠল। ফ্লেজার বিস্ময়ের সঙ্গে বলল–ফ্রান্সিস অবাক কান্ড।
–হ্যাঁ! এখানে মানুষ থাকে। জানি না তারা কেমন মানুষ। ফ্রান্সিস বলল। ওদিকে ভাইকিংদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ওরাও মশালের আলো দেখেছে।
এবার মশালের আলোয় সবাই দেখতে পেল কিছুদূরে একটা এবুড়ো খেবৃড়ো পাথরের বেদী মত। তার ওপর একটা পাথরের আসনমত। তাতে কে একজন বসে আছে। বেদীটার চারপাশে মশাল জ্বলছে। প্রায় পনেরো কুড়িজন কালো মানুষ বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
ফ্লেজার মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস–এরা কারা?
কালো মানুষ। পাথরের আসনে যে বসে আছে সে নিশ্চয়ই এদের রাজা। ফ্রান্সিস আস্তে বলল।
–এখানে কী করবে? ফ্লেজার জানতে চাইল।
–দেখি–এদের মতলব কী? ফ্রান্সিস বলল।
হঠাৎ মশালের অস্পষ্ট আলোয় দেখা গেল একদল কালো মানুষ বর্শা দাঁতে কামড়ে ধরে সাঁতরে ফ্রান্সিসদের জাহাজের দিকে আসছে। সবাই দেখল সেটা। শাঙ্কো ছুটে ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–ফ্রান্সিস কী করবে? আরো কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু ছুটে এল। বলল–ফ্রান্সিস-লড়াই। ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে অনেকক্ষণ ভাবল। তারপর মাথা তুলে বলল–না। আত্মসমর্পণ। বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। ফ্রান্সিস। গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসবঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে আমরা অত্যন্ত ক্লান্ত। শরীরের এই অবস্থায় লড়াই করতে গেলে আমরা হেরে যাব। বেশ কিছু বন্ধু মারাও যাবে। তার চেয়ে দেখা যাক ওরা আমাদের নিয়ে কী করে। লড়াই না করলে ওরা নিশ্চয়ই আমাদের কোন ক্ষতি করবে না। শুধু বন্দীই করবে। দেখা যাক আমাদের কোথায় কীভাবে বন্দী করে। তারপর সময় সুযোগ বুঝে পালাবো। এখন লড়াই নয়।
ওদিকে হালের দড়ি বেয়ে কালো মানুষেরা ডেকএ উঠে আসতে লাগল। ওদের জলে-ভেজা কালো কালো শরীরে মশালের আলো পড়ে চক্ করছে। এতক্ষণ বর্শা দাঁতে চেপে ধরে ওরা সাঁতরে এসেছে। এখন হাতে বর্শা উঠিয়ে ওরা দ্রুত ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। একজন বেঁটেমত যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের দিকে এগিয়ে এল। বোঝা গেল সেই দলনেতা। গলা উঁচু করে ভাঙা ভাঙা পর্তুগীজ ভাষায় বলল নেতা কে? ফ্রান্সিস এগিয়ে এল।
বলল–আমি।
–বন্দী–তোমরা। দলপতি বলল।
–কেন? আমরা তো কোন অপরাধ করিনি। ফ্রান্সিস পোর্তুগীজ ভাষায় বলল।
লড়াই চাও? দলনেতা বলল।
না। সুবিচার চাই। ফ্রান্সিস বলল।
–রাজা নিকুম্বা-চল। দলনেতা বলল।
–রাজা নিকুম্বা কোথায়? ফ্রান্সিস জানাতে চাইল।
দলপতি আঙ্গুল তুলে পাথরের বড় বেদীমত জায়গাটা দেখাল। বলল–সিংহাসন। তাহলে পাথরের সিংহাসনে যে বড় বড় গোঁফ দাড়িওয়ালা লোকটি বসে আছে সেই রাজা নিকুম্বা।
এখান থেকে সাঁতরে আমরা যাব না। জাহাজ ওখানে নিয়ে যাব। তারপর কাঠের পাটাতন পেতে ঐ বেদীতে উঠবো। ফ্রান্সিস বলল।
–আচ্ছা বেশ–চল। দলপতি বলল।
–জাহাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দাঁড় বাইতে হবে। ফ্লেজার বলল।
–না–তোমরা–আমরা। দল নেতা কয়েজনকে কী বলল। কয়েকজন দাঁড় ধরে নেমে গেল। তখনও কয়েকজন ভাইকিং ক্লান্তিতে ভেজা ডেকে-এর ওপরই শুয়ে বসে ছিল।
একটু পরেই জাহাজ আস্তে আস্তে চলল। সেই এবড়ো খেবড়ো পাথরের বড় বেদীমত জায়গাটায় জাহাজ এসে লাগল। দলনেতা ভাইকিংদের উঠে যেতে ইঙ্গিত করল। ওদিকে কিছু কালো যোদ্ধা সিঁড়ি বেয়ে নেমে কেবিনঘর খাবার ঘরে নেমে গিয়েছিল। ওরা মারিয়াসহ রাঁধুনিদেরও ধরে নিয়ে এল।
মারিয়া ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল কী করবো?
–আমাদের আর কিছুই করার নেই। এদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামবো না। ফ্রান্সিস বলল।
–বন্দীত্ব মেনে নেবে? মারিয়া বলল?
–উপায় নেই। এখন লড়াইয়ে নামালে আমরা কেউ বাঁচবো না।
নির্ঘাৎ মৃত্যু। এখন এদের কথা মতই চলতে হবে। বাধা দিয়ে লাভ নেই। ফ্রান্সিস না বলল।
–কিন্তু এরা তো যে কোন সময় আমাদের মেরে ফেলতে পারে। মারিয়া বলল।
–সেই ঝুঁকি নিতেই হবে। আগে এদের রাজার সঙ্গে কথা বলি। তখনই বুঝতে পারবো এরা আমাদের নিয়ে কী করতে চায়। ফ্রান্সিস বলল।
–আমি এদের বিশ্বাস করি না। মারিয়া বেশ জোর দিয়ে বলল।
–এখন আর বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্ন তুলে লাভ নেই। এখন আমরা বন্দী। ভবিতব্য মেনে নিতেই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
ওদিকে দলপতির নির্দেশে ভাইকিংরা সার বেঁধে পাটাতন দিয়ে পাথরের বেদীমতন জায়গাটায় উঠতে লাগল। ফ্রান্সিস মারিয়াকে নিয়ে সেই সারিতে দাঁড়াল।
কালো যোদ্ধাদের পাহারায় সবাই সেই বেদীমত জায়গাটায় উঠে এল। ক্লান্ত ভাইকিংরা কেউ কেউ বসে পড়ল।
এবার মশালের আলোয় রাজা নিকুম্বাকে অনেক স্পষ্ট দেখা গেল। রাজা নিকুম্বা পাথরের আসনে বসে আছে। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে আছে। মাথা ভর্তি কাঁচাপাকা বড় বড় চুল। কাঁচাপাকা দাড়িগোঁফ। দাড়ি বুক পর্যন্ত নেমে এসেছে। কুঁৎকুতে চোখের দৃষ্টি কুটিল।
দলপতি রাজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একটু মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে এক নাগাড়ে কী বলে গেল।
রাজা দু-একবার মাথা ওঠা-নামা করে কী বলল। দলপতি ফ্রান্সিসের কাছে এল। রাজার দিকে এগিয়ে যাবার ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিস বুঝল রাজাকে সম্মান না জানালে বিপদ হতে পারে। ও রাজার সামনে এসে মাথা একটু নুইয়ে সম্মান জানাল।
