–তাহলে ঝড় বৃষ্টি হবে? মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড়ের সঙ্গে লড়াইয়ে নামতে হবে। সিনাত্রা বলল।
মারিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ফান্সিসরা সিঁড়িঘরের দিকে চলল। ডেকএ উঠল। বন্ধুরা ভিড় করে এল। ফ্রান্সিস চারিদিক ভাল করে তাকিয়ে দেখল। ঝড়ের পূর্বাবস্থা। দক্ষিণ দিগন্তে বিদ্যুৎ চমকানো শুরু হয়েছে। ভেজা হাওয়া ছুটে আসছে। ফ্রান্সিস’বলল। দূরে নিশ্চয়ই কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। বেশি দেরি করা চলবে না।
তখনই মাস্তুলের ওপর থেকে নজরদার পেড্রোর চড়াগলা শোনা গেল ভাইসব-সাবধানঝড় আসছে। ফ্রান্সিস ডেক থেকে গলা চড়িয়ে বলল–দড়িদড়া ধরে ধরে পেড্রো নেমে এসো। একটু পরেই মাস্তুলের দড়িদড়া ধরে ধরে পেড্রো নেমে এল। পেড্রো পশ্চিমদিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল–ঐদিকে ডাঙ্গা দেখেছি! তবে মাটি জঙ্গল আর পাহাড়ের মত কিছু।
–ফ্রান্সিস এখন কী করবে? হ্যারি জানতে চাইল। চারদিকে জড়ো হওয়া বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–আমরা পাহাড়ের দিকেই জাহাজ চালাবো।
–কিন্তু পাহাড়ের ধাক্কা লেগে–হ্যারি আর কথাটা শেষ করল না।
উপায় নেই। ঝড়ের প্রচন্ড ঝাঁপটা থেকে বাঁচতে ঐ পাহাড়ের আড়ালে যেতে হবে। ফ্রান্সিস বলল। তাহলে ফ্লেজারকে বলো। হ্যারি বলল। তারপর বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–ভাইসব সবাই রাতের খাবার খেয়ে নাও-যত তাড়াতাড়ি পারো। এবার ফ্রান্সিস জাহাজচালক ফ্লেজারের কাছে গেল। ফ্লেজার এদিক ওদিক হুইল ঘোরাচ্ছিল। ফ্রান্সিসকে দেখে বললঝড় আসছে। কী করবো বুঝে উঠতে পারছি না। ফ্রান্সিস পশ্চিমদিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল–ঐদিকে আবছা একটা পাহাড়ি এলাকা দেখা যাচ্ছে। ঐদিকেই জাহাজ চলাও। কাছাকাছি গিয়ে দেখা যাক ওটার আড়ালে জাহাজ ভেড়ানো যায় কিনা। এছাড়া ঝড় এড়ানোর অন্য কোন উপায় নেই।
ফ্লেজার জাহাজের মুখ ঘোরাল। জাহাজ চলল আবছা-দেখা পাহাড়ী এলাকার দিকে। ফ্রান্সিস ভুরু কুঁচকে দেখল-পাহাড়গুলোর মধ্যে মাঝেরটা বেশ উঁচু। অন্যগুলো ততটা উঁচু নয়। ওখানে কাছাকাছি গিয়ে বোঝা যাবে কোথাও আড়াল পাওয়া যায় কিনা।
ওদিকে বন্ধুরা সব তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেতে শুরু করল। ফ্রান্সিসও মারিয়া আর হ্যারিকে নিয়ে খাবার ঘরে চলল। শাঙ্কো ততক্ষণে খেয়ে নিয়েছে। ও এসে হুইল ধরল। ফ্লেজার খেতে গেল। জাহাজ দুলতে দুলতে চলল পাহাড়ী এলাকার দিকে।
ততক্ষণে মাথার ওপর আকাশে বিদ্যুৎ চমকানো শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে ঘন ঘন বাজ পড়ার গুরুগম্ভীর শব্দ।
সবারই রাতের খাবার খাওয়া হয়ে গেল। সবাই ছুটোছুটি করে দ্রুত সব পাল নামিয়ে ফেলল। মাস্তুলের পালের কাঠামোর হালের দড়িদড়া টেনে ধরতে ধরতেই প্রচন্ড ঝড় জাহাজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। জাহাজটা থর থর করে কেঁপে উঠল। বেশ কয়েকজন ভাইকিং ছিটকে ডেকএর উপর পড়ে গেলো। অবশ্য পরেক্ষণেই উঠে দাঁড়িয়ে জাহাজের দড়িদড়া টেনে ধরল। তখনই শুরু হল বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। তারপরই মুষুলধারে বৃষ্টি শুরু হল। চারদিক যেন একটা সাদাটে আস্তরণে ঢাকা পড়ে গেল। ঝড়বিক্ষুদ্ধ সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ জাহাজের গায়ে আছড়ে পড়তে লাগল। জাহাজ একবার ঢেউয়ের মাথায় ওঠে পরক্ষণেই ঢেউয়ের ফাটলে আছড়ে পড়ে।
জাহাজের এই দুলুনির মধ্যে মাস্তুলের দড়িদড়া ধরে ফ্রান্সিস ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে দুহাত দড়িদড়া থেকে ছিটকে সরে যাচ্ছে। বেশ কষ্টে ফ্রান্সিস সেই ধাক্কা সামলাচ্ছে আর তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে উঁচু পাহাড়টার দিকে।
কিছু পরে বৃষ্টির ঝাপ্টা কমল। তখনই ফ্রান্সিস আবছা অন্ধকারের মধ্যে দেখল পাহাড়টায় একটা বড় বেশ উঁচু গুহামত। ফ্রান্সিস আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠল–ওহহ হো। ঝড়ের শব্দের মধ্যেও সেই ধ্বনি কয়েকজন ভাইকিংএর কানে গেল। ওরাও চিৎকার করে ধ্বনি তুলল–ওহো হো। এবার সবাই সেই ধ্বনি শুনল। সবাই মিলে ধ্বনি তুলল–ও হো হো।
ফ্রান্সিস জাহাজের মধ্যে টলতে টলতে ফ্লেজারের কাছে এল। চিৎকার করে বলল–ফ্লেজার–ঐদিকে দেখ। একটা বড় গুহা। দেখ ভালো করে। ফ্লেজারও তীক্ষ্মদৃষ্টিতে তাকাল। গুহাটা আবছা দেখতে পেল। তখন বৃষ্টি আরো কমেছে।
এবার গুহাটা অনেক পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–দেখেছো?
–হ্যাঁ। দেখছি। ফ্লেজারও চিৎকার করে বলল।
-ঐ গুহার মধ্যে জাহাজটা ঢুকিয়ে দাও। সাবধান গুহার মুখে যেন ধাক্কা না লাগে। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল। এবার ফ্লেজার দুলতে থাকা জাহাজটা চালিয়ে গুহার মুখের কাছে নিয়ে এল। দৃঢ়হাতে হুইলটা ঘোরাতে লাগল। দোল খেতে খেতে জাহাজটা গুহার মুখের কাছে এল। তারপর সাবধানে অন্ধকার গুহাটায় জাহাজ ঢুকিয়ে দিল। বোঝা গেল পাহাড়টা বেশ বড়। কিছুটা এগোতেই আর ঝড়ের ঝাঁপটা নেই। বৃষ্টি নেই। ভাইকিংরা ধ্বনি তুলল ও–হো–হো।
এখন জাহাজটা নিরাপদ। জলের ওপর গুহার এবড়ো খেবড়ো গা। জাহাজটা অনেকটা ভেতরে ঢুকে গেল। শান্ত পরিবেশে ঝড়ের অস্পষ্ট শব্দ শোনা যেতে লাগল। ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে ক্লান্ত সিক্ত ভাইকিংরা জাহাজের ডেক-এ এখানে ওখানে শুয়ে পড়ল। বসে পড়ল। সবাই মুখ হাঁ করে হাঁপাচ্ছে।
জাহাজটা আরো ভেতরে ঢুকল। অন্ধকার গাঢ় হল। ফ্রান্সিস ফ্লেজারের কাছে দাঁড়িয়েছিল। এবার বলল–ফ্রেজার-জাহাজ থামাও। ঝড়বৃষ্টি থামলে জাহাজ গুহা থেকে বের করবে। ফ্লেজার জাহাজ থামাল।
