কালো যুবকরা উঠেযাবার জন্যে দড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল।
ফ্রান্সিস তখন একটা পাথরের ওপর বসেছিল।
কিছু পরে উঠে দাঁড়াল। বলল শাঙ্কো উঠে দেখতো ওরা চলে গেল কিনা। শাঙ্কো দড়ি বেয়ে উঠে এল। ওপরে তাকিয়ে দেখল চার যুবকই উঠে গেছে।
শাঙ্কো নেমে এল। বলল–ওরা চলে গেছে। ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠল। চাপাগলায় সজোরে বলে উঠল
–শাঙ্কো–আমি সফল।
–সেকি? শাঙ্কো অবাক।
এসো! দেখাচ্ছি। ফ্রান্সিস হাসতে হাসতে বলল।
দুজনে সেই ত্রিকোণ ফুল তোলা পাথরের পাটার কাছে এল। ফ্রান্সিস পাটাটা তুলে দেখিয়ে বলল–শাঙ্কো–এর নীচেই আছে স্বর্ণখনি।
–নিশ্চিন্ত? শাঙ্কোর বিস্ময়তার তখনও কাটেনি।
–এখন নিশ্চিত। চলোপাটাটা তুলি। এবার দুজনকেইতুলতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
দুজনে মিলে পাটাটা টানতে গেল। আশ্চর্য। আস্তে পাটাটা উঠেএল। ভেতরটা অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–দুটো মশাল নিয়ে এসো। শাঙ্কো দুটো মশাল পাথরের খাঁজ থেকে তুলে নিয়ে এল।
গর্তটার দুপাশে দুজনে মশাল দুটো ধরল। ফ্রান্সিস একটা মশাল গর্তের মধ্যে ফেলে দিল। এবার প্রায় স্পষ্ট দেখা গেল কয়েকটা গোল তালা। মশালের আলোয় একটু ঝিকিয়ে উঠল। ফ্রান্সিস অভিজ্ঞ চোখে বুঝল–
–সোনা। ও প্রায় চিৎকার করে উঠল শাঙ্কো–সোনা। শাঙ্কোও আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
ফ্রান্সিস দুহাতে ভর রেখে আস্তে আস্তে গর্তটায় নেমে গেল। একটা সোনার তাল নিয়ে ওপরে উঠে এল।
এবার মশালের আলোয় সোনার তালের এবড়োখেবড়ো গা বেশ ঝিকিয়ে উঠল।
চলো। মুখটা বন্ধ করি। ফ্রান্সিস বলল। পাটা দিয়ে গর্তটার মুখ বন্ধ করে দুজনে ওপরে উঠে এল। হ্যারি ফ্রান্সিসের হাতে সোনার তাল দেখে ছুটে এল। হেসে বলল– সাবাস ফ্রান্সিস। তিনজনেই হেসে উঠল। তারপর মৃদুস্বর ধ্বনি তুলল—হো—হো–হো।
ফ্রান্সিস হেসে গলা নামিয়ে বলল–এখন কোন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করো না। দেখবে সামুছাও এই কথা বলবে।
ওরা সামুছার বসার ঘরে এল। বসল।
ফ্রান্সিস সোনার তালটা লুকিয়ে রাখল।
একটু পরে সামুছা এলেন। চেয়ারে বসলেন।
সামুছা মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করলেন–হদিশ পেলে?
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস মাথা কাত করে হেসে বলল।
তখনই পাংলু বিকেলের খাবার নিয়ে ঢুকল। সবাইকে দিল। ক্ষুধার্ত ফ্রান্সিসরা প্রায় গোগ্রাসে খাবার গিলতে লাগল। সামুছা মৃদু হেসে বললেন–ওদের আরো খেতে দাও। আবার খাবার। এবার ফ্রান্সিসরা আস্তে আস্তে খেল। পাংলু তখন ঘরে নেই।
সামুছা আবার মৃদুস্বরে বললেন– প্রমাণ? ফ্রান্সিস লুকিয়ে রাখা সোনার তালটা সামুছার হাতে দিল। সামুছার দুচোখ যেন জ্বলে উঠল। সোনার তালটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলেন। তারপর উঠে আলমারিতে ঢুকিয়ে রাখলেন। এসে চেয়ারে বসলেন। মৃদুস্বরে বললেন–আরো সোনার তাল আছে?
–হ্যাঁ, আছে। ফ্রান্সিস বলল।
সামুছা বললেন–তোমাদের বুদ্ধি চিন্তার প্রশংসা না করে পারছি না। কিন্তু একটা কথা। সোনার খনির কথাটা যেন জানাজানি হয়। শুধু আমরা চারজন। এমন কি পাংলুকেও বলা হবে না। আমি পরে সোনার খনির ব্যবস্থা করছি।
এবার আমার একটা অনুরোধ। ফ্রান্সিস বলল।
–আমরা ধনী নই। তবে হতে পারতাম। সে থাক–আমরা দেশে দেশে ঘুরে বেড়াই। সব দেশের মুদ্রা তো আমাদের কাছে থাকে না। তাই সোনাই আমাদের একমাত্র দাম দেবার মাধ্যম। আপনি যদি আমাকে কিছু সোনার চাকতি এই মণ্ড থেকে দেন তাহলে খুবই উপকার হত।
নিশ্চয়ই দেব। তোমরাই তো কষ্ট করে উদ্ধার করলে। তবে এই সোনা থেকে নয়। আমার কাছে একথলি খাঁটি স্পেনীয় স্বর্ণমুদ্রা আছে। সেটাই দিচ্ছি।
সামুছা উঠে বাড়ির ভেতরে গেলেন। একটু পরেই ফিরে এলেন। একটা নীল সাটিন কাপড়ের থলি টেবিলে রেখে বললেন–এই তোমাদের পারিশ্রমিক। থলিটা তুলে নিয়ে ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে দিল। শাঙ্কো সেটা কোমরের ফেট্টিতে ঝুলিয়ে রাখল।
ফ্রান্সিস বলল–তাহলে আমরা চলি।
–বেশ। তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ রইলাম। সামুছা মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন।
ফ্রান্সিসরা জাহাজঘাটের দিকে চলল।
শাঙ্কো বলল–পাংলুকে দুটো মুদ্রা দিয়ে আসবো।
না। সামুছা জানতে পারলে মনঃক্ষুণ্ণ হবেন।
ফ্রান্সিসরা পাটা পাটাতন দিয়ে জাহাজে উঠে এল। বন্ধুরা ছুটে এল। জানতে চাইল ফ্রান্সিসরা স্বর্ণখনি খুঁজে বের করতে পেরেছে কিনা।
–হ্যাঁ। আমরা সফল। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
বন্ধুরা ধ্বনি তুলল—হো-হো-হো। আশেপাশের জাহাজ থেকে লোকেরাও দেখল। বুঝল না এত উল্লাসের কারণ কী?
মারিয়া হাসিমুখে এগিয়ে এল। শাঙ্কো মারিয়াকে স্যামুদ্রা ভরা থলিটা দিল। ফ্রান্সিস শুধু বলললুকিয়ে রেখো। মারিয়া মাথা কাত করল।
শাঙ্কো তখন হাত পা নেড়ে বন্ধুদের স্ফাখনি আবিষ্কারের ঘটনা বলছে।
তখনও সূর্য অস্ত যায় নি। মারিয়া সূর্যাস্ত দেখার জন্যে রেলিঙ ধরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসও এসে পাশে দাঁড়াল।
সূর্য পশ্চিম আকাশে গভীর কমলা ছড়িয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের মধ্যে ডুবে গেল।
সোনার সিংহাসন
সন্ধ্যে থেকেই বাতাস পড়ে গেছে। আকাশে গভীর কালো মেঘ জমছে অনেকক্ষণ থেকেই। ফ্রান্সিসরা ঝড়ের পূর্বাভাস ভালোই বোঝে। সন্দেহ নেই ঝড় বৃষ্টি হবে। ওরা সাবধান হল। জাহাজের পালে হাওয়া নেই। পালগুলো নেতিয়ে পড়েছে।
হ্যারি ফ্রান্সিসের কেবিনঘরের কাছে এল। সঙ্গে সিনাত্রা। ফ্রান্সিসের কেবিনঘরের দরজায় টোকা দিল। মারিয়া দরজা খুলে দিল। ঘরে ঢুকে হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস আকাশের অবস্থা ভালো নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড ঝড় আসছে। কী করব? ফ্রান্সিস একটু ভাবল। বলল–একেবারেই সময় নষ্ট করা চলবে না। সবাইকে রাতের খাবার খেয়ে নিতে বলল। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ফান্সিস বলল–চলো। ডেক এ যাবো।
