দুজনে পাথরের পাটা সরাতে লাগল। ভাঙা হলেও কোন কোন পাটা বেশ ভারি। ওরা পাথরের পাটা সরাচ্ছে। ভাঙা দূর্গে শব্দ উঠছে–দুমদুম্।
অল্পক্ষণের মধ্যেই ওরা হাঁপিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ ভাঙা পাটায় বসে বিশ্রাম নিল। আবার সরাতে লাগল। বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে পাটা সরানোর কাজ চলল। স্তূপীকৃত পাটার উচ্চতা কিছু কমল। কিন্তু রইল অনেক।
শাঙ্কো হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–এসব সরানো দুজনের কর্ম নয়। আরো লোকলাগবে।
–হুঁ। দেখি সামুছাকে বলে–লোক পাই কিনা। তবে সোনার খনি আবিষ্কার করতে যাচ্ছি। সমস্যা আছে। যদি সত্যিই সোনার খনি পাই তখন যারা সাহায্য করতে আসবে তারা রূদ্রমূর্তি ধরতে পারে। তখন আমাদের জীবন বিপন্ন হবে। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো মাথা নেড়ে বলল– এটা হতে পারে।
হতে পারে না-হবেই। সোনার লোভেই সামুছা এখানে বছরের পর বছর একা পড়ে আছে। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে কী করবে? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–লোক আনবো। কিন্তু আগে থেকেই সাবধান থাকতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–এখন কী করবে? শাঙ্কো বলল।
–চলো উঠে পড়ি। লোক জোগাড় করে কালকে আসবো। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস ফেরার পথে হ্যারিকে সব বলল। সামুছা বাইরের ঘরেই বসেছিলেন। ফ্রান্সিসরা ঘরে ঢুকতেই বললেন–কোন খোঁজ পেলে?
–এখনও নিশ্চিত নই। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
-এত বছর ধরে চেষ্টা করে আমি পারলাম না। তোমরা পারবে? সামুছা সংশয় প্রকাশ করলেন।
–দেখি। একটা কথা। ফ্রান্সিস বলল।
–বলো। সামুছা বললেন।
প্রায় স্তূপাকার পাথর একটা ঘরে। সেসব সরিয়ে ভাঙা মেঝেটা বের করতে হবে। কিন্তু আমাদের তিনজনের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। ফ্রান্সিস বলল।
সময় নাও। তোমরাই সরাও। সামুছা বললেন।
–না। আমাদের তাড়াতাড়ি জাহাজে ফিরতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–আমরা পারবো না। ভীষণ খাটুনি। শাঙ্কো বলল।
–পিংলা বলছিল তোমরা ক্রীতদাস ছিলে। অনেকদিন। শুকনো ক্ষেতে জল ছিটোনোর কাজ করেছে। সামুছা বললেন।
–হ্যাঁ। তবে মুক্ত অবস্থায় পারবো না। শাঙ্কো বলল।
–তাই বলছি তিনচারজন লোক যদি দিতে পারেন তাহলে দ্রুত কাজ সারতে পারি। ফ্রান্সিস বলল।
–তা দেয়া যাবে। পাংলুকে খবর দিতে পাঠাচ্ছি। সামুছা বললেন।
–ঠিক আছে। আমরা কাল সকালে আসবো। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। সামুছা বললেন।
ফেরার পথে শাঙ্কো বলল–ত্রিকোণ ঘর ফুলের ছবি এসব নিয়ে তো সামুছাকে কিছু বললে না।
-মাথা খারাপ। এসব বললে সামুছা আমাদের হটিয়ে নিজেই কাজে নেমে পড়বে। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু তুমি তো ওকেই সব দেবে। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। তা দেব। কিন্তু একটা ব্যাপার আছে। মারিয়াকে দেখতে বলবো কত সোনার চাকতি আছে। যদি দেখি অনেক কম তাহলে স্বর্ণখনি আবিষ্কার করতে পারলে সামুছার কাছ থেকে কিছু সোনা নেব। ফ্রান্সিস বলল।
–সোনা থাকলে কেমনভাবে আছে? চাকতির মত? শাঙ্কো জানতে চাইল।
সঠিক কী করে বলি। তবে পুরোনো আমলে খনির সোনা গোল তাল করে রাখা এ হত। হয়তো সেভাবেই রাখা আছে।
জাহাজে এসে ফ্রান্সিস মারিয়াকে জিজ্ঞেস করল–সোনার চাকতি কেমন আছে? মারিয়া দেয়ালের কাঠ সরিয়ে দেখল। বলল–কমে গেছে। কিছু আছে শাঙ্কোর কাছে।
-তাহলে সোনা চাই। ফ্রান্সিস বলল।
পরের দিন সকালে ফ্রান্সিরা এল।
দেখল বসার ঘরের বারান্দায় চারজন কালো যুবক বসে আছে। সামুছা বেরিয়ে এলেন। বললেন–এই যে তোমাদের লোক। ফ্রান্সিস বুঝল তরতাজা বলিষ্ঠ যুবক ওরা। ওদের দিয়ে দ্রুতই কাজ হবে।
ফ্রান্সিস পাংলুর কাছে দড়িটা রেখে গিয়েছিল। পাংলু সেটা নিয়ে এল।
সকলে চলল ভাঙা দুর্গের দিকে। হ্যারি নীচে রইল।
গতকালের মত দড়ি বেঁধে প্রথমে ফ্রান্সিস নেমে গেল। শাঙ্কোও নামল। দুজনের হাতেই জ্বলন্ত মশাল। সঙ্গীদের একজনও একটা জ্বলন্ত মশাল নিল।
সবাই প্রথম ভাঙা ঘরটার ভাঙা দরজার সামনে এল। ভাঙা মেঝের ওপর দিয়ে ছোট ঘরটার দরজার কাছে এল।
পরদিন সকালে ফ্রান্সিস এল। দেখল চারজন কালো যুবক বারান্দায় বসে আছে। তাদের নিয়ে ফ্রান্সিস চলল।
তিনটে মশাল নিয়ে সবাই ছোট ঘরে নামল। এখন চারদিক অনেকস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
এবার ফ্রান্সিস কালো যুবকদের বলল–ঐ উত্তরকোনায় একটা তামার খনি আছে। তামা এমন কিছু দামি নয়। আমরা সেই খনিটা খুঁজে বের করবো। সেটা করতে গেলে ঐ স্তূপাকার পাথর সরাতে হবে। বুঝেছো? ওরা ঘাড় নাড়ল।
তাহলে কাজে লাগা যাক। ফ্রান্সিস বলল। মশালগুলো পাথরের খাঁজে রাখা হল। মশালের আলোয় সবাই মিলে পাথরের ভাঙা পাটা সরাতে লাগল। বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে পাথর সরানো দুপুরের পরেই শেষ হয়ে এল। সবাই কাজ থামাল। সবাই কমবেশি হাঁপাতে লাগল।
ফ্রান্সিস উত্তর কোনায় ভাঙা মেঝের কাছে এল। ভাঙা পাথর সরাতে লাগল। ভাঙা পাথর ফেলে দিতেই দেখল–একটা তিনকোণা পাথরের পাটা। তারওপর উত্তর কোনায় চন্দ্রমুখী ফুল কুঁদে তোলা।
ফ্রান্সিস চোখ বুজে নিজের উচ্ছ্বাস গোপন করল। ফিরে তাকিয়ে বলল–বৃথা চেষ্টা। এখানে তামার খনিটনি নেই। সবটাই ভাঙা পাথরে ভর্তি।
শাঙ্কো হতাশ গলায় বলল–তাহলে সব চেষ্টাই মাটি।
–হ্যাঁ। একটু বিশ্রাম নিয়ে ওপরে উঠে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
কালো যুবকরা বসেছিল। একজন উঠেদাঁড়িয়ে বলল–তাহলে আমরা চললাম।
–হ্যাঁ তাই। আমরাও একটু পরে চলে যাবো। ফ্রান্সিস দুহাত ছড়িয়ে বলল।
