হ্যারি বইটা ফ্রান্সিসের দিকে এগিয়ে দিল। ফ্রান্সিস মলাট উল্টেত্রিকোণ ছবিটা দেখল। ত্রিকোণটি সারা পাতা জুড়ে আঁকা। উত্তর কোণে একটা সূর্যমুখী ফুলআঁকা।
সামুছা ঘরে ঢুকে বসলেন।
ফ্রান্সিস বইটা এগিয়ে দিয়ে বলল–আচ্ছা–এই ত্রিভুজ-ফুলের ব্যাপারটা কী বলুন তো?
–এ তো একটা ছবি। রাজা আলফ্রেড ফুল ভালোবাসতেন। এন্তার এঁকে গেছেন। সামুছা বললেন।
–কিন্তু বইটাতে কোথাও তো কোনো ছবির মধ্যে ফুল আঁকা নেই। তাহলে এই ত্রিভুজের মধ্যে কেন আঁকলেন? ফ্রান্সিস বলল।
রাজরাজরাদের খেয়াল। বিচিত্র ধরনেরই হয়। সামুছা বললেন।
–আচ্ছা–আপনি আমাদের পূর্বদিকে যেতে মানা করেছিলেন। পূবদিকে কি ঘরটর আছে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
থাকতে পারে। আমি যখন থেকে দেখছিতখন থেকেইপূর্বদিকভাঙা। সামুছা বললেন।
–আমার মনে হয় ওদিকে ঘর আছে। ফ্রান্সিস বলল।
–তা থাকতে পারে। কিন্তু সেই ঘর দেখবে কী করে? সামুছা বললেন।
–দড়ি বেয়ে নেমে দেখতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
-পারবেন? সামুছা বললেন।
–পারবো।
–আজকে বিকেল হয়ে এল। মশালের আলোয় ভালো দেখা যাবে না। কাল সকালে আসছি। পূবদিকে নামবো। দড়ি আমরাই আনবো।
পরদিন ফ্রান্সিসরা একটু সকাল সকালই এল। জাহাজ থেকে দেখেশুনে বেশ লম্ফ দড়ি নিয়ে এল।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো পাথরে পা রেখে ভারসাম্য বজায় রেখে ভাঙা দূর্গের মাথায় উঠল। হ্যারি নীচে রইল। দুর্গের মাথাটাও ভাঙা। সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে।
পূবদিকে গেল দু’জনে। সত্যিই এদিকটা ভেঙে পড়েছে। ফ্রান্সিস পাকানো দড়ি কাঁধে নিয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল। দড়ি বাঁধার জায়গা খুঁজতে লাগল। তখনই শাঙ্কো একটা ছোট নিরেট পাথুরে দেওয়াল দেখাল। ফ্রান্সিস কঁধ থেকে দড়ি নামাল। আস্তে আস্তে দড়ির একটা মুখ নামাতে লাগল। প্রায় সবটা দড়ি ছেড়ে দেখল বেশ নীচে নেমেছে।
এবার ফ্রান্সিস দড়ির মাথাটা দেয়ালে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধল। টেনে দেখল বেশ শক্তভাবেই বাঁধা হয়েছে। ওরা দড়ি বাঁধায় ওস্তাদ। কারণ জাহাজে দড়ির কাজ অনেক। নানারকম গিট বাঁধায় ওরা অভ্যস্ত। ওরা মশাল এনেছিল। কিন্তু তখনও জ্বালে নি।
ফ্রান্সিস দড়ি ধরে ধরে ভাঙা পাথরে পা রেখে রেখে নীচে নেমে আসতে লাগল। তখনও ভাবছে নীচে বোধহয় কোন অটুট ঘর পাবে না।
বেশ কিছুটা নেমে আসতে ভাঙা পাথরের মধ্যে একটা ভাঙা দরজামতো পেল। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল ভেতরটা বেশ অন্ধকার। রোদ অল্পই ঢুকছে।
ফ্রান্সিস ভাঙা দরজায় পা রাখল। তারপর দড়ি ধরে ধরে ভেতরে ঢুকল। অন্ধকারটা চোখে সরে আসতে দেখল একটা ঘর। ও একনজর দেখে বুঝল একটা ভাঙা চৌকোনো ঘর। ও ঘরের ভেতর নামল। তখনই আবছা দেখল ওপাশে আর একটা ভাঙা দরজা। তবে ছোট।
ফ্রান্সিস দড়ির মুখ কাঁধে ঝুলিয়ে ভাঙা পাথরের মেঝের ওপর দিয়ে সেই ঘরের দরজার কাছে গেল। এদিকটা ভেঙে পড়ায় ওপরে ছাদের মত হয়ে গেছে। সেই ঘরটায় ঢুকতে গিয়ে ফ্রান্সিস দ্রুত পিছিয়ে এল। আবছা দেখল সেই ঘরটা বেশ নীচে। ওর মনে হল বোধহয় দূর্গের ভিতেরও নীচে। কিন্তু একেবারে অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ঘরটা কেমন বোঝাই যাচ্ছে না। শুধু পাথর আর পাথর।
মশাল চাই। ফ্রান্সিস সরে এল। দড়ি ধরে ধরে আগের ঘরের দরজার কাছে এল। দুহাতের তালু মুখের কাছে গোল করে চিৎকার করে ডাকল–শাঙ্কো–শাঙ্কো।
শাঙ্কো ডাক শুনে ঘাবড়ে গেল। ফ্রান্সিস কি কোন বিপদে পড়ল? ও চিৎকার করে বলল–কোন বিপদ নয়তো?
–না–না। তুমি একটা মশাল জ্বালিয়ে নিয়ে এসো। ফ্রান্সিস বলল।
কিছু পরে শাঙ্কো একটা জ্বলন্ত মশাল বাঁ হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে দড়ি ধরে ধরে নেমে এল।
দড়ি ধরে ধরে দুজনে প্রথম ভাঙা ঘরটায় ঢুকল। সেই ঘর পার হয়ে সেই ছোট ঘরটার ভাঙা দরজার কাছে এল।
ফ্রান্সিস এবার জ্বলন্ত মশালটা নীচের ঘরের মাঝখানটায় ছুঁড়ে ফেলল। মশালের আলোয় ছোটঘরটা কিছুটা স্পষ্ট দেখা গেল। ফ্রান্সিস ভীষণভাবে চমকে উঠল। আশ্চর্য! ঘরটা ত্রিকোণ ঘর। এরকম ত্রিকোণ ঘরভাঙা দুর্গ কোথাও দেখেনি। রাজা আলফ্রেডের বইয়ে ত্রিকোণ আঁকা আছে। তাহলে তিনি এই ঘরটাকেই বুঝিয়েছেন। ত্রিকোণের উত্তরের মাথাটায় আঁকা আছে একটা চন্দ্রমুখী ফুল। সেই ঘরের উত্তরের কোণের দিকে তাকাল ফ্রান্সিস। খুব অস্পষ্ট দেখলপথটা পাথরের স্তূপ।
ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে ডাকল–শাঙ্কো।
-বল। শাঙ্কো এগিয়ে এল।
ঘরের উত্তরের কোণার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েফ্রান্সিস বলল–ঐখানে আছে স্বর্ণখনি। শাঙ্কো বলল–ওখানে তো পাথরের স্তূপ।
–ওসবের নীচেই আছে স্বর্ণখনি। ফ্রান্সিস বলল।
–তুমি নিশ্চিত? শাঙ্কো সংশয় প্রকাশ করল।
—হ্যাঁ নিশ্চিত। এবার স্ফাখনি খুঁজে বের করা। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে তো এই ঘরে নামতে হয়। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ নামবো। তারপর পাথরের পাটা সরাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। চলো। নামি। শাঙ্কো বলল।
দুজনে দড়ি বেয়ে বেয়ে সেই ত্রিকোণ ঘরটার ভাঙা মেঝেয় নামল। ভাঙা পাথরে পা রেখে রেখে শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে ওরা উত্তর কোণায় এল। দেখল পাকার পাথরের ভাঙা পাটা।
–সব পাথর সরাতে হবে। হাত লাগাও। ফ্রান্সিস বলল।
–বলছো কি। আমরা দুজনে সব সরাতে পারবো? শাঙ্কো বলল।
হাত তো লাগাই। দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।
