একটু রাত হ’তে হঠাৎ পাহারাদার সৈন্যদের মধ্যে ব্যস্ততা লক্ষ্য করলাম। একটু পরেই সেনাপতি এল। সৈন্যদের কি হুকুম করল। ওরা আমাকে ঘর থেকে টেনে বের করল। তারপর সেনাপতির পেছনে-পেছনে আমাকে নিয়ে চলল। চাঁদের দ্বীপের নক্সাটা অনেকবার দেখে আমার সবই জানা হয়ে গিয়েছিল। উত্তর-পূর্ব মুখে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে, বুঝলাম তার মানে গভীর বন এলাকা পার হয়ে মুক্তোর সমুদ্র। কিন্তু ওরা আমাকে ওখানে নিয়ে যাচ্ছে কেন, বুঝলাম না। সবার আগে যে যোদ্ধাটি চলছে, তার হাতে মশাল। তারপরেই সেনাপতি। তারপর আমাকে মাঝখানে রেখে সৈন্যরা চলেছে গভীর বনের মধ্য দিয়ে। আমরা চলেছি। বন্য পশুর ডাক শোনা যাচ্ছে মাঝে-মাঝে। রাতজাগা পাখিগুলো তীক্ষ্মস্বরে ডেকে অন্য গাছে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। ঝিঁঝি পোকার একটানা গান শোনা যাচ্ছে। একসময় গভীর বন শেষ হয়ে গেল। ছাড়া-ছাড়া গাছপালা শুরু হ’ল। তারপর আগুনে-প্রবালের একটা টিবি লম্বা চলে গেছে। সেটা দৌড়ে পার হতে হলো। ঢিবিটায় পা রাখা যায় না। এত গরম। তারপরই একটা ল্যাগুন। আকাশে ভাঙা চাঁদ। তারই নিস্তেজ আলোয় দেখলাম ল্যাগুনটার জল স্থির, ঢেউ নেই। ওপারে কাঁচ পাহাড় আর তার বাঁকানো চূড়া! বুঝলাম, এটাই মুক্তোর সমুদ্র। এই মুক্তোর সমুদ্র নিয়েই কত কল্পনা ছিল আমার। কত কথা শুনেছি এর সম্বন্ধে। আজকে সেটা আমার চোখের সম্মুখে। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে মুক্তোর সমুদ্র দেখতে লাগলাম।
একটু থেমে ফ্রেন্দারিকো বলতে লাগল, সেনাপতি আমার কাছে এলো। ভেংচিকাটার মত হেসে বলল–এই দ্যাখ মুক্তোর সমুদ্র। তোকে ভাসিয়ে দেব। যত পারিস্ মুক্তো তুলিস।
তারপর চড়া সুরে কি হুকুম দিলো। সৈন্যরা ছুটে এসে আমাকে ধরলো। টানতে টানতে জলের ধারে নিয়ে গেল। দেখলাম, জলের ধারে একটা নৌকার মতো বাঁধা। গাছের গুঁড়ি কুড়ে ভাজিম্বারা একরকমের নৌকো তৈরি করে। এটা সেই রকম নৌকো। আমাকে ওরা নৌকোয় তুললো। তারপর বুনোলতা দিয়ে নৌকোর সঙ্গে হাত-পা বেঁধে দিল। ওরা নৌকোটা জোরে ঠেলে দিতে আমি মুক্তোর সমুদ্রের মাঝ বরাবর ভেসে এলাম। বুঝে উঠতে পারলাম না, আমাকে না মেরে এভাবে জলে ভাসিয়ে দিল কেন। অবশ্য একটু পরেই এর কারণ বুঝলাম। নৌকাটার তলায় ফুটো, ফুটো দিয়ে নৌকায় ততক্ষণে জল উঠতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকোসুদ্ধ আস্তে-আস্তে ডুবে শিশু যাবো। মাহাবো হিংস্র লা মাছের কথা বলেছিল। এরাই নাকি মুক্তোর সমুদ্রের প্রহরী। একবার জলে পড়লে ওরা সুতীক্ষ্ম দাঁত দিয়ে আমার শরীর ফালাফালা করে ফেলবে। ভয়াল মেরুদন্ড ফাপা কাটা বিঁধিয়ে দেবে। আমার মৃত্যু সুনিশ্চিত। ওপরে আকাশে ভাঙা চাঁদ। তারা জ্বলছে। এই সব কিছুমুছে যাবে। মৃত্যু এসে সব রং আলো মুছে দেবে। চোখের কোণ জলে ভিজে উঠলো। আমি চোখ বুঝলাম। হঠাৎ মনটা বিদ্রোহ করল। কেন মরবো? মরবার আগে একবার শেষ চেষ্টা করবো না? হাত-পা বাঁধা এই অবস্থায়। মৃত্যুকে মেনে নেব? আমি তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। পরের দিকে তাকালাম। দেখি তিন-চারটে মশাল জ্বলছে। বুঝলাম, ওরা পাহারা দিচ্ছে এখনো। সারা তীরটা জুড়েই পাহারা দিচ্ছে। ওরা নিশ্চিত জানে মুক্তোর সমুদ্র থেকে কেউ জীবন নিয়ে ফিরে আসে না। তবু আমার মৃত্যু সম্বন্ধে ওরা নিশ্চিত হতে চায়। আমি তাড়াতাড়ি বাঁধা হাত দুটো নিয়ে কোমরের গোঁজা খুঁজলাম। আয়না দুটো রয়েছে। অনেক কষ্টে একটা আয়না বের করলাম। তারপর আয়নাটার বাঁকা ছুঁচালো মুখটা হাতের তলাটায় ঘষতে লাগলাম। ভাগ্যি ভাল লতাটা শুকনো ছিল না। কাঁচা লতা-গাছটা ঘষতে ঘষতে লতাটা কাটতে লাগলাম। হাতটা অবশ্য অক্ষত রইল না। কেটে গিয়ে রক্ত পড়তে লাগল। হাত ধরে একটু বিশ্রাম করি। আবার ঘষি। কিছুটা ছিঁড়ে আসতে আবার হ্যাঁচকা টান দিলাম। লতাটা ছিঁড়ে গেল। ততক্ষণে নৌকার অর্ধেকটা ডুবে গেছে। বাঁধা হাত পা দুটো জলের নিচে। এবার পায়ের তলাটা কাটতে লাগলাম। পা’টাও আয়নার কোণায় খোঁচা লেগে কেটে গেল। রক্ত পড়তে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ এক টানা ঘষার পর পায়ের বন্ধনটা কেটে গেল। ভাবলাম, নৌকো থেকে ঝাঁপ দিয়ে জলে পড়ি। কিন্তু তাতে শব্দ হবে। শব্দ শুনলে সেনাপতির, ভাজিম্বা সৈন্যদের সন্দেহ হতে পারে। তাই আমি নৌকোর সঙ্গে সঙ্গে আস্তে-আস্তে জলের নীচে তলিয়ে গেলাম। প্রতি মুহূর্তেই আশঙ্কা করছিল লাফ মাছগুলো ছুটে আসবে। উঁচালো ধারলো দাঁত নিয়ে আমার শরীরটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ফালাফালা করে দেবে। নয়তো পিঠের ফাঁপা টনকটা ফুটিয়ে দেবে। হঠাৎ জলের নীচে দেখি এক আলোর আভাস। তাহলে এইখানেই কি মুক্তো আছে? আমি ভুলে গেলাম মৃত্যুদূত লা মাছের কথা। আমি তাড়াতাড়ি সেই আলো ধরে নীচে নেমে এলাম। সে এক অপরূপ দৃশ্য। ওখানের তলাটা একটু এবড়ো খেবড়ো হলেও সমান। তার ওপর বড়-বড় মুক্তো ছড়িয়ে পড়ে আছে। একটা তীব্র নীলচে আলো বেরোচ্ছে মুক্তোগুলো থেকে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে মুক্তোগুলোকে। মুক্তোগুলো পড়ে আছে মেঝের মত জায়গাটায়। আর চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বড়-বড় আকারে ঝিনুক কল্পনাই করা যায় না। কোন কোন ঝিনুকের মুখ খোলা। তার মধ্যে মুক্তো। সেই আলোকিত জায়গাটার দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ ডানহাতে একটা প্রচন্ড ধাক্কায় আমার হাত থেকে আয়নাটা মেঝের মত জায়গাটায় পড়ে গেল। সেই আয়নাটা থেকে তীব্র আলো বিচ্ছুরিত হ’তে লাগলো। দেখলাম, একটা ছাইরঙা মাছ ঐ আয়নার মধ্যে প্রচন্ড জোরে ঢু মারল, ওটা নিশ্চয় মৃত্যুদূত লাফ মাছ। আরো লাফ মাছ ছুটে আসছে দেখলাম। আমার দম। ফুরিয়ে এসেছিল। আমি দ্রুত ওপরে উঠতে লাগলাম। তাড়াতাড়ি জলের ওপর পৌঁছলাম। দেখলাম, এখানে জলের গভীরতা বেশী নয়। এবার আয়নার রহস্যটা পরিষ্কার হয়ে গেল। আয়নাটার একটা বৈশিষ্ট্য আমি লক্ষ্য করছিলাম যে, এর আলো প্রতিবিম্বিত করার ক্ষমতা সাধারণ আয়নার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। এই আয়না মাছেদের আকৃষ্ট করে। মাছগুলো তখন পাগলের মত আয়নাটায় টু মারতে থাকে। ভুলে যায়, ধারে কাছে কোন শিকার আছে কিনা। লক্ষ্যই করে না কিছু। রাজ পুরোহিত তাই এই আয়না নিয়ে মুক্তো তুলতে আসতেন। যখন লা মাছেরা ফুঁ দিতে ব্যস্ত, তখন উনি মুক্তো সংগ্রহ করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জলের ওপরে উঠে আসতেন। তারপর সাঁতরে পারে উঠতেন। আমি এইসব ভাবতে-ভাবতে জলের ওপর ভেসে থেকে অনেকটা দম নিলাম। তারপর একডুবেনীচে নেমে গেলাম। হাতের কাছে যে মুক্তোটা পেলাম, সেটা নিয়ে উঠে আসছি, দেখি আয়নাটার কাছে অনেকগুলো লা মাছ জড়ো হয়ে ক্রমাগত টু দিচ্ছে জায়গাটার জল রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। হয়তো মাছগুলোর মুখ থেঁতলে গেছে। আমি তাড়াতাড়ি উঠে এলাম। দূরের পারের দিকে তাকালাম। পারে দুরে-দূরে তিন জায়গায় তিনটে মশাল জ্বলছে। ওদিক দিয়ে পালানো অসম্ভব। মুক্তোটা কোমরে গুঁজে আমি কাঁচ পাহাড়ের দিকে সাঁতরাতে লাগলাম। ঐ কাঁচপাহাড়টাই পেরোতে হবে। যেদিকে আগ্নেয়গিরি সেদিকটায় দেখলাম, জল থেকে খাড়া পাহাড় উঠে গেছে। আবার পারের ওদিকে ভাজিম্বা সৈন্যদের নিয়ে সেনাপতি ঘুরে-ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাজেই কঁচপাহাড় ছাড়া অন্য কোন দিক দিয়ে পালাবার উপায় নেই। কাঁচপাহাড়ের কাছাকাছি এসেছিলাম বোধহয়, তখনই হঠাৎ নিচের দিকে একটা টান অনুভব করলাম। আমি আর একটু সাঁতরে এসেছি, হঠাৎ এক প্রচন্ড জলের টানে আমি তলিয়ে গেলাম। সেই টানে আমি কোথায় ভেসে চললাম জানি না। প্রায় অজ্ঞানের মতো হয়ে গেলাম। হঠাৎ দেখি আমি কাঁচপাহাড় পেরিয়ে এসেছি। সামনে মহাসমুদ্রে চলে আসাটা আজও আমার কাছে রহস্যময় থেকে গেল।
