–ভাই, তীরধনুক বানাতে পারো? শাঙ্কো বলল।
-কেন পারবোনা। অনেকেই শিকার ধরার জন্য তীরধনুক বানিয়ে নিয়ে যায়। তবে খাটুনি বেশি। বেশি দাম দিতে হবে। কামার হাপড় টানতে টানতে বলল।
শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি থেকে একটা সোনার চাকতি বের করে দিল। কামার সন্তুষ্ট। হেসে বলল কালকে সকালেই পেয়ে যাবেন।
সেদিন গভীর রাতেই ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো কেদিয়ার বাড়ির পেছনদিককার বন্দীঘরের কাছে গেল। ফ্রান্সিস ফোকরে মুখ দিয়ে চাপাস্বরে ডাকল-ফ্লেজার, সিনাত্রা–আ। ফ্লেজাররা জেগেই ছিল। ফ্লেজার ফোকরে মুখ রেখে বলল–বলো। ও মুখ সরাল। এবার ফ্রান্সিস বলল–তোমরা যখন ক্ষেতে কাজ করবে আমরা তখনই যাবো। শাঙ্কোর হাতে থাকবে একটা সাদা রঙের পতাকা। পতাকাটার দিকে নজর রাখবে। পতাকা দেখলেই আমাদের কাছে ছুটে আসবে।
–প্রহরীরাও তো আমাদের পিছু ধাওয়া করবে। ফ্লেজার বলল।
–শাঙ্কো তীর ছুঁড়ে ওদের আটকাবে। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কোর হাতে তীরধনুক থাকলে নিশ্চিন্ত। ফ্লেজার বলল।
ফ্রান্সিসরা জাহাজে চলে এল। বন্ধুদের কাছে ছকের কথা বলল। বন্ধুরা সব শুনে ঘুমুতে গেল।
সকালের খাবার খেয়েই ফ্রান্সিসরা তরোয়াল কোমরে গুঁজে জাহাজ থেকে নেমে এল। দোকানে বাজারে রাস্তায় ভিড়। তার মধ্যে দিয়েই ওরা চলল। শাঙ্কোর হাতের কাঠের ডায় সাদা পতাকা উড়ছে। ভিড়ের মধ্যে অনেকেই ফ্রান্সিসদের দেখল। তারা ভেবে পেল না কোমরে তরোয়াল গুঁজে হাতে পতাকা নিয়ে ওরা কোথায় চলেছে।
যেতে যেতে শাঙ্কো হেসে বলল–ফ্রান্সিস সাদা পতাকা কিন্তু শান্তির পতাকা।
–আমাদের কাছে আজ অশান্তির পতাকা। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
ফ্রান্সিসরা ক্ষেতের কাছে পৌঁছল। দেখল ক্ষেতের এককোনায় একজন প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে। কোমরে তরোয়াল। আর একজন প্রহরী একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
পতাকা হাতে ফ্রান্সিসদের দেখে প্রহরীটি কেমন হকচকিয়ে গেল। প্রহরীটি কিচ্ছু বোঝার আগেইশাঙ্কো পতাকা ফ্রান্সিসের হাতে দিয়ে ছুটে গিয়ে প্রহরীটির ওপরঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রহরীটি চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। শাঙ্কোর হাতে ছুরি ছিলই। ও প্রহরীটির বুকে ছুরিবিধিয়ে দিল।
ওদিকে ফ্রান্সিসের হাতের সাদা পতাকা দেখে ফ্লেজাররা ছুটে আসতে লাগল। প্রহরীরা বুঝল ওরা পালাচ্ছে। প্রহরীরাও ওদের পেছনে ছুটে আসতে লাগল। কাছাকাছি যে দাঁড়িয়ে ছিল সে খাপ থেকে তরোয়াল খুলে ফ্রান্সিসদের দিকে ছুটে এল। ফ্রান্সিস দ্রুত ছুটে গিয়ে প্রহরীটির ডান হাত লক্ষ্য করে তরোয়াল চালাল। প্রহরীটি সেই মার ঠেকাতে গেল। কিন্তু পারল না। ওর ডানহাতে তরোয়াল বসে গেল। ও তরোয়াল ফেলে হাত চেপে বসে পড়ল।
ততক্ষণে ফ্লেজাররা ফ্রান্সিসদের কাছে এসে গেছে। প্রহরীদের একজন ফ্রান্সিসদের– অনেক কাছে চলে এসেছিল। শাঙ্কো ধনুকে তীর পরিয়ে তীর ছুঁড়ল। শাঙ্কোর নিশানা নিখুঁত। তীর গিয়ে বিঁধল প্রহরীটির পেটে। প্রহরীটি ক্ষেতের ওপর পড়ে গেল।
এই দেখে অন্য প্রহরীরা থমকে দাঁড়াল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। এই সুযোগে শাঙ্কো একটার পর একটা তীর ছুঁড়তে লাগল। তীরগুলো কারো হাঁটুতে, কারো কাঁধে, কারো বুকের কাছে বিধল।
প্রহরীদের গতি রুদ্ধ হয়ে গেল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল জাহাজ ঘাটের দিকে জলদি।
সবাই জাহাজঘাটের দিকে ছুটল। লোকের ভিড়ের মধ্য দিয়েই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুটল সবাই।
তিনজন প্রহরী কিন্তু জাহাজঘাটের কাছে এসে গেল।
ফ্রান্সিসরা ততক্ষণ জাহাজে উঠে গেছে। পাতা পাটাতনের কাছে দাঁড়াল ঐ তিনজন। ফ্রান্সিস কোমর থেকে তরোয়াল খুলল। চেঁচিয়ে বলল–উঠেএসো। তোমাদের লড়াইয়ের সাধ মিটিয়ে দিচ্ছি।
প্রহরী তিনজন নিজেদের মধ্যে কী বলাবলি করল। তারপর পিছু ফিরেহাঁটতে লাগল।
ওদিকে ফ্লেজারদের পালাবার সময় অন্য বন্দীরাও পালাল। প্রহরীরা ফিরে এসে দেখল একজন বন্দীও নেই। ওদের রাগ পড়ল ফ্রান্সিসদের ওপর। কিন্তু কিছুই করার নেই। এখন কর্তার কাছেজবাবদিহি করতে হবে। এই চিন্তা নিয়ে অলস পায়ে কেদিয়ার বাড়ির দিকে চলল।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল-জাহাজ ছাড়ো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। কেদিয়া এখানকার জমিদার। তার যথেষ্ট লোকবল আছে। আমরা বিপদে পড়বো।
সবাই ভাগ হয়ে ছুটলো। পাল খুলে দেওয়া হল। পালগুলো ফুলে উঠল। নোঙর তোলা হল। দাঁড়ঘরে দাঁড় বাওয়া শুরু হল। জাহাজ চলল। অল্পক্ষণের মধ্যেই বেশ গতি পেল।
জাহাজ তখন বেশ দূরে চলে এসেছে। দূর থেকে ওরা দেখল জাহাজঘাটে বেশ ভিড় জমেছে।
জাহাজ ক্রমে মাঝ সমুদ্রে চলে এল। তখনও দাঁড় বাওয়া চলছে।
জাহাজ উত্তরমুখো চলল।
দুদিনের মাথায় জাহাজ ঝড়ের মুখে পড়ল। ভাইকিংরাঝড়ের মোকাবিলায় অভ্যস্ত। ওরা পাল নামিয়ে দড়িদড়া টেনে জাহাজ ভাসিয়ে রাখল।
প্রায় দিন পনেরো কুড়ি পরে ওদের জাহাজ আমারগো বন্দরে ভিড়লো।
তখন শেষ রাত।
ফ্রান্সিস স্থির করল আর দেরি করবে না। পরদিন সকালেই সামুছার খোঁজে যাবে।
পরদিন সকালেই ফ্রান্সিস, শাঙ্কো আর হ্যারিকে নিয়ে বন্দরে নামল। দোকানের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে সামুছার বাড়িতে এল।
এমন কিছু বিশাল বাড়ি নয়। ছোট বাড়ি। কাঠ পাথরে তৈরি।
বাড়ির ওপাশে তাকাতেই রাজা আলফ্রেডের দুর্গের প্রায় ধ্বংসস্তূপ দেখল। সমস্ত দূর্গটাই প্রায় ভেঙে পড়েছে। দুএকটা জায়গায় তখনও ছাদমত আছে। কয়েকটা দেয়ালও খাড়া আছে।
