ফ্রান্সিস ক্ষেতের সীমা থেকে সরে এল। বুঝল বেশী কিছু জানা যাবে না। তবে বন্ধুরা এখানে বন্দী হয়ে থাকতে পারে। অন্তত সম্ভাবনা আছে।
ফেরার পথে ফ্রান্সিস দেখল একটা বাড়ির বারান্দায় একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে।
ফ্রান্সিস বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে গেল। কাছে গিয়ে বলল–দেখুন, আমরা বিদেশি। এই রেজিল বন্দর এলাকা আমরা চিনি না। এখানকার বড় বড় জমিদারেরা কি চাষাবাদের জন্যে ক্রীতদাস রাখে?
–কী বলবো? ঐ জমিদার কেদিয়া এখানকার রাজা বললেই হয়। কার সাধ্য ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। বৃদ্ধ বলল।
–তুম্ফা কী করে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–তুম্ফার কাজই হল যেসব জাহাজ বন্দরেআসে তাই থেকে যুবকদের লোভ দেখিয়ে কেদিয়ার বাড়িতে নিয়ে আসা পেট ভরে খাওয়ান। বলে এখানে চাষের কাজ করলে দুমাসে তোমরা বড়লোক হয়ে যাবে। জাহাজে কাজ করে কী পাও? বৃদ্ধ বলল।
–তারপর? ফ্রান্সিস আগ্রহী হল।
তারপরেই তাদের বন্দীঘরে বন্দী করে রাখা হয়। প্রচুর খাওয়া-দাওয়া আদরযত্ন চলে। কিন্তু বন্দী হয়েই থাকতে হয়। বাইরে বেরোবার উপায় নেই। কড়া পাহারা। বৃদ্ধ বলল।
তারপর তাদের চাষের কাজে লাগায়। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক। সারাদিন ক্ষেতের কাজ করায়। খাওয়াও আর আগের মতো দেওয়া হয় না। বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন মিলিয়ে যায়। বৃদ্ধ বলল।
–এ তো ক্রীতদাসেরই জীবন। ফ্রান্সিস বলল।
–সত্যিই তাই। বৃদ্ধ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
–অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। ফ্রান্সিসরা ফিরে এল।
জাহাজে এসে ফ্রান্সিস হ্যারি বিস্কো আর কয়েকজন বন্ধুকে ডাকল। যা খবর এনেছে বলল। তারপর বলল-যা বুঝতে পারছি আমাদের বন্ধুরা প্রায় ক্রীতদাস হয়ে আছে। হয় কেদিয়া বা অন্য কোন জমিদারের বাড়িতে। এবার খোঁজখবর নিতে হবে। রাতে আমি আর শাঙ্কোই যাবো খোঁজখবর নিতে।
মনে হয় কেদিয়ার বাড়িতেই ওদের পাবো। হ্যারি বলল।
–আমারও তাই মনে হয়। যারা চাষ করছিল তাদের এতদূর থেকে দেখেছি চিনতে পারিনি। কেদিয়াই বোধহয় এখানকার সবচেয়ে বড় জমিদার। অঢেল জমি। মনে হয় তার বাড়িতেই বন্ধুরা বন্দী হয়ে আছে। তুই ওদের ভুল বুঝিয়ে নিয়ে গেছে। কেদিয়ার বাড়িটাই আগে দেখতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
সেদিন রাতে খাওয়ার পর ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। বিশ্রাম করতে লাগল।
কিছুপরে দরজায় টোকার শব্দ। ফ্রান্সিস উঠে পড়ল।
-কোথায় যাচ্ছো? মারিয়া জিজ্ঞেস করল।
বন্ধুদের খোঁজে। ফ্রান্সিস বলল।
এত রাতে। এই বিদেশ। কোন বিপদআপদ
হতে পারে। তবে সাবধানে থাকবো। ফ্রান্সিস বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। দরজা খুলল। শাঙ্কো দাঁড়িয়ে।
দুজনে জাহাজ থেকে নেমে এল। রাস্তা ধরে চলল কেদিয়ার বাড়ির দিকে।
রাস্তা জনশূন্য। চাঁদের আলো উজ্জ্বল। দুজনে হাঁটতে লাগল।
কেদিয়ার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।
বিরাট বাড়ি। ফ্রান্সিসরা বাড়ির পেছন দিকে এল। দেখল একটা লম্ফটে কাঠের ঘর। একেবারে ওপরে দুটি জানলামত। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–শাঙ্কো–এটাই বন্দীঘর।
ফ্রান্সিস কাঠের দেওয়ালের কাছে গেল। চাপাস্বরে ডাকল–ফ্লেজার সিনাত্রা। ঘরের ভেতরে কোন সাড়াশব্দ নেই। বেশি জোরে ডাকতে সাহস পাচ্ছেনা। নিশ্চই ঘরে প্রহরী আছে। আবার বার দুয়েক ডাকল-ফ্লেজার-ভেন। ঘরের ভেতর থেকে কোন শব্দ শোনা গেলনা।
দাঁড়াও। কাঠের দেয়াল ফুটো করছি। শাঙ্কো বলল। তারপর গলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ওর ছোরাটা বের করল। কাঠের দেয়ালে ছোরা চেপে ঘোরাতে লাগল। শক্ত কাঠ। তবু শাঙ্কো হাল ছাড়ল না। ছোরা ঘোরাতে ঘোরাতে সত্যিই একটা ফুটো মত হল। সেই ফুটোয় মুখ চেপে ফ্রান্সিস গলা চেপে ডাকল–ফ্লেজার সিনাত্রা–ফ্লেজার। ভেনভেন।
একটু পরে ঘরের ভেতরে নড়াচড়ার শব্দ পেল। কেউ যেন উঠে এল। ফুটোয় মুখ চেপে ফ্রান্সিস বলল–এইখানে এসো। এখানে ফুটো।
যে উঠেছিল সে ফুটোর কাছে এগিয়ে এল। ফুটোয় মুখ রেখে বলল–কে? ফ্লেজারের গলা। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে হাসল। শাঙ্কোও হাসল।
এবার ফ্রান্সিস ফুটোয় মুখ রাখল। বলল
–আমি ফ্রান্সিস। সঙ্গে শাঙ্কো। তোমরা কী বন্দী?
–হ্যাঁ। আমাদের দিয়ে চাষের কাজ করায়। ফ্লেজার বলল।
–জানি। ফ্রান্সিস বলল। ও বুঝল ফুটোর কাছে এসে কয়েকজন দাঁড়িয়েছে।
–আর দু’একদিন অপেক্ষা কর। তোমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করছি। ততদিন চুপচাপ থাকো। প্রহরীদের মনে যেন কোন সন্দেহ না হয়। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। ফ্লেজার বলল।
বন্ধুদের আমাদের কথা বল। কালকে আবার আসবো। পালাবার ছক বলবো। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা আস্তে আস্তে চলে এল।
জাহাজে ফিরে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো হ্যারির কাছে গেল। হ্যারির ঘুম ভাঙিয়ে বলল তোমার অনুমানই ঠিক। কেদিয়ার বন্দীঘরেই আমাদের বন্ধুরা বন্দী হয়ে আছে। এখন আমাদের কাজ হল ওদের মুক্ত করা।
ফিরে আসার সময় শাঙ্কো বলল–বন্ধুরা পালিয়ে আসতে গেলেই প্রহরীরা ওদের তাড়া কররে। তখন তরোয়ালের লড়াই চালাতে হবে। হয়তো প্রহরীদের কয়েকজনকে হত্যা করতে পারবো। কিন্তু আমরাও অক্ষত থাকবো না। সবচেয়ে ভালো হচ্ছে তীরধনুক নিয়ে ওদের সঙ্গে লড়া।
–তাহলে সকালের খাবার খেয়েই চলো তীরধনুকের ব্যবস্থা করতে। ফ্রান্সিস বলল।
–তাই চলো। শাঙ্কো বলল।
পরদিন সকালে ওরা দুজনে রাস্তা দিয়ে চলল। দোকানপাটে বাজারে বেশ ভিড়। ওরা একটা কামারশালা খুঁজতে লাগল। পেয়েও গেল। ছোট দোকান। ওরা দোকানে ঢুকল। কামার একটা কুড়ুল বানাচ্ছিল।
