ফ্রান্সিস লাফিয়ে গিয়ে হ্যারিকে আড়াল করে দাঁড়াল। শুরু হল তরোয়ালের লড়াই। ফ্রান্সিস ভাবল একে হত্যা করতেই হবে। ও সাবধানে তরোয়াল চালাতে লাগল আর সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগল।
হঠাৎ ফ্রান্সিস ঐ রক্ষীটির পেছন দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বলে উঠল–মারো একে। রক্ষীটি পেছনে ফিরে তাকাল। ফ্রান্সিস এই সুযোগই খুঁজছিল। আর দেরি করল না। রক্ষীটির গলায় তরোয়াল ঢুকিয়ে দিল। রক্ষীটি রাস্তার ওপর গড়িয়ে পড়ল। আর উঠল না।
অন্য রক্ষীটি একজন সঙ্গীদের এভাবে মরতে দেখে ভয় পেয়ে গেল। সে তরোয়াল ফেলে পার্তাদোর বাড়ির সদর গেট-এর দিকে ছুটল। বাকি একজনকে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো মিলে হত্যা করল।
হাঁপাতে হাঁপাতে ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–কোলা–তোমাকে হত্যার বদলা নিলাম। তবে একটা বেঁচে গেল।
কামারশালায় তখন সকলেরই পায়ের বেড়ি কাটা হয়ে গেছে।
শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি থেকে একটা সোনার চাকতি বের করে কামারকে দিল। কামার খুব খুশি। এর আগেও বেড়ি কেটেছে। কিন্তু সোনা পায়নি। সবাই জাহাজঘাটের দিকে চলল। জাহাজঘাটে যখন পৌঁছল তখন ভোর হয়ে এসেছে।
পাটাতন পাতাই ছিল। সবাই একে একে জাহাজে উঠল।
ডেক-এ উঠে ফ্রান্সিস ডেক-এর ওপর শুয়ে পড়ে ডেক-এ চুমু খেল। ওদের সুখদুঃখের সঙ্গী জাহাজটাকে আবার পাওয়া গেছে।
ফ্রান্সিসের দেখাদেখি ওর বন্ধুরাও শুয়ে পড়ে ডেক-এ চুমু খেল।
এবার ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–জাহাজ চালাও। এক মুহূর্তও দেরি নয়। পালা খাঁটাও। কয়েকজন দাঁড়ঘরে চলে যাও। দাঁড় বাও। জাহাজের গতি বাড়াও।
শাঙ্কো হুইল ধরো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে যেতে হবে।
সবাই কাজে লেগে গেল। নোঙর তোলা হল। জাহাজ চলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জোর গতি পেল। পালগুলো ফুলে উঠল। জাহাজ চলল দক্ষিণমুখো।
নিজের পরিচিত কেবিনঘরে ঢুকেইমারিয়া মাথার কাছে কাঠের দেয়ালের কাছে গেল। কাঠ ফাঁক করে দেখল সোনার চাকতিগুলো রয়েছে। কাঠ চেপে ফাঁক বন্ধ করে দিল। পাংলুও ঘরে ছিল। কিছু বুঝল না মারিয়া ওভাবে ছুটে গেল কেন? কী দেখল? পাংলু কাঠের মেঝেয় বসল।
ফ্রান্সিস ঢুকল। সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। মারিয়াও বিছানার একপাশে বসল। মৃদুস্বরে বলল–
-তোমার পায়ের অবস্থা কী?
–অনেকটা সেরে গেছে। দিনকয়েকের মধ্যেই সেরে যাবে। বেড়ির ঘষা তো আর লাগছে না। ফ্রান্সিস মৃদু স্বরে বলল।
দরজায় আঙুল ঠোকার শব্দ হল। পাংলু উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল। হ্যারি শাঙ্কো আর একজন বন্ধু ঘরে ঢুকল।
হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস জাহাজ দক্ষিণদিকে চালাতে বললে কেন? দেশে যেতে হলে তো উত্তরদিকে জাহাজ চালাতে হবে।
–না। রেজিল বন্দরে নেমে যাবো। বাকি বন্ধুরা কী অবস্থায় আছে কে জানে। ওদের তো সঙ্গে নিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
-তা ঠিক। বন্ধুদের নিয়ে তো দেশে ফিরবে? শাঙ্কো বলল।
না। ফেরার পথে আমারগো বন্দরে নামবো। ওখান থেকে কিছুদূরে রাজা আলফ্রেডের গুপ্ত ধনভাণ্ডার খুঁজে বের করবো।
–আবার? প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মারিয়া।
ফ্রান্সিস হেসে বলল হ্যাঁ। আবার। তারপর উত্তরমুখো–দেশে।
কিছু বলার নেই। তুমি যা ভালো বোঝ। মারিয়া গোমড়ামুখে বলল। হ্যারিরা চলে গেল। রেজিল বন্দর লক্ষ্য করে জাহাজ চলল। জাহাজ আমারগো বন্দরে ভিড়ল! জাহাজ নোঙর করল। তিনজন কৃষ্ণকায় ফ্রান্সিসের কাছে এল। আকারে ইঙ্গিতে বলল”আমরা এখানেই নেমে যাবো।
–বেশ তো। ফ্রান্সিস বলল।
পুরনো মনিবের কাছেই থাকবে বলছে। মারিয়া বলল।
ও যা চাইবে তাই হবে। আমিও ওর পুরনো মনিব সামুছার কাছে আসবো। সামুছার সাহায্য না পেলে কিছুই করতে পারবো না। ফ্রান্সিস বলল।
পাংলু আর কৃষ্ণকায় তিনজন নেমে গেল। পাংলুর জন্য মারিয়ার মন খারাপ হয়ে গেল। অনেকদিন একসঙ্গে ছিল। পাংলুর ওপর কেমন একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল।
জাহাজ চলল।
পনেরো কুড়িদিন পর জাহাজ রেজিল বন্দরে পৌঁছল। বন্দরে ব্যস্ত জীবন। দোকানে বাজারে ভিড়।
ফ্রান্সিস বলল–শোন–দেরি করা চলবে না। এক্ষুনি বন্ধুদের খোঁজে বেরোতে হবে। প্রথমে শাঙ্কো আর আমি যাচ্ছি।
ফ্রান্সিস ও শাঙ্কো পাটাতন দিয়ে নেমে এল। এদিক ওদিক ছোট ছোট বাড়িঘর। সেসব ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা আসতে দেখল একটা বড় বাড়ি। বোঝাই যাচ্ছে বেশ অর্থব্যয় করে বাড়িটা তৈরী। কোন বড় জমিদারের বাড়ি হবে।
বাড়ির সামনেই অনেকদূর পর্যন্ত গমের ক্ষেত। একটা নয়, পরপর কয়েকটা। ক্ষেতের চারপাশে সশস্ত্র প্রহরী। ক্ষেতে চাষের কাজ চলছে।
ফ্রান্সিস ক্ষেতের সীমার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। একজন প্রহরী খাপ থেকে তরোয়াল খুলে ছুটে এল। গম্ভীর গলায় বলল–কী চাই?
–কিছুনা। দেখছিলাম–চাষীদের মধ্যে আমার বন্ধুরা আছে কিনা। ফ্রান্সিস বলল।
তুমি তো বিদেশি।
–হ্যাঁ। আমার বন্ধুরাও তো বিদেশি। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ কিছু বিদেশি আছে চাষীদের মধ্যে। প্রহরী বলল।
–বিদেশি আছে। ফ্রান্সিস চমকে উঠল। বলল–তাদের একজনকে ডেকে দেবে।
–আমি তোমার ক্রীতদাস? হুকুম করলেই শুনবো। প্রহরী বলল।
–চাষীরা কি ক্রীতদাস? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
না। তবে ক্রীতদাসের মতোই। পায়ে বেড়ি নেই। কিন্তু বন্দী। পালাবার পথ বন্ধ। প্রহরী বলল।
–কোথায় রাখা হয় ওদের? ফ্রান্সিস বলল।
-তোমার অত প্রশ্নের জবাব দিতে পারবো না। ভুরু মোটা প্রহরীটি বলল–যাও। রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াও।
