মারিয়া হাত বাঁধার দড়ির টুকরোগুলো হ্যারিকে দিল।
দেউড়ির দুপাশে মশাল জ্বলছে। সেই আলোতে ফ্রান্সিস দেখল তিনজন প্রহরী পাহারা দিচ্ছে।
তাড়াতাড়ি দেউড়ির সামনে চল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল।
দেউড়ির সামনে মশালের আলোয় প্রহরীরা অবাক। ওরা হকচকিয়ে গেল। তরোয়ালও বের করতে পারল না। ফ্রান্সিস একজনের বুকে তরোয়াল ঠেকিয়ে বলল-দরজা খুলে দাও। নইলে মারবে। শাঙ্কো আর বিস্কো অন্য দুটি প্রহরীর বুকে তরোয়াল চেপে ধরেছে। ফ্রান্সিস যার বুকে তরোয়াল চেপে ধরেছিল তার কোমরেই ঝুলছিল চাবির গোছা। সে চাবি বের করতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল–দুটোর হাত মুখ বাঁধো। হ্যারি দড়ি এগিয়ে দিল। শাস্কো দ্রুত হাতে একজনের হাত বাঁধল। ফিতে কাপড় দিয়ে মুখ বাঁধল। অন্যজনকে বিস্কো বাঁধল। তারপর দুজনকেই ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। দুজনের মুখ দিয়েই গোয়ানির শব্দ বেরিয়ে এল। শাঙ্কো ওদের গলায় তরোয়লের মুখ ঠেকিয়ে বলল গোঁ-গোঁ বন্ধ কর। নইলে মরবে। ওদের গোঁ গোঁ বন্ধ হল।
ততক্ষণে চাবিওয়ালা প্রহরী তালা খুলে দিয়েছে। সবাই দেউড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল। শুধু শাঙ্কো চাবিওয়ালার হাতমুখ বেঁধে একটু পরে এল।
সদর রাস্তায় এসে ফ্রান্সিস চাপা স্বরে বলল–যতটা দ্রুত সম্ভব ছোটো। কামার শালার পেছনে লুকোবো।
সবাই যতটা সম্ভব জোরে ছুটল। কামারশালার সামনে পৌঁছতে পেছনে প্রহরীদের চিৎকার চেঁচামেচি শুনল।
ওরা কামারশালার পেছনে গিয়ে লুকোল। ফ্রান্সিস কামারশালার ঘরের আড়াল থেকে পেছনে তাকাল। দেখল খোলা তরোয়াল হাতে চারজন দেহরক্ষী ছুটে আসছে।
ওরা কামারশালা ছাড়িয়ে ছুটতে ছুটতে জাহাজঘাটের দিকে চলে গেল। ওরা জানে ফ্রান্সিসরা জাহাজে চড়ে পালাবার চেষ্টা করবে।
এতগুলো লোক। ফিসফাস্ কথাবার্তাও চলছিল। কামারের ঘুম ভেঙে গেল। সে দরজা খুলে বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ওর বুকে তরোয়াল ঠেকাল। দাঁতচাপা স্বরে বলল–
–একটি কথাও বলবে না। আমাদের পায়ের বেড়ি খুলে দাও।
–ঠিক আছে। দিচ্ছি। কিন্তু এতজনের বেড়ি—
–আরো কয়েকজন কামারকে ডাকো। ফ্রান্সিস একইভাবে বলল।
–আমার তিন ছেলেই পারবে। ওদের ডাকি। কামার বলল।
–কিন্তু আস্তে। কোন শব্দ করবে না। ফ্রান্সিস বলল।
কামার ওর ঘরে ঢুকল। আস্তে ডাকাডাকি করল। কামার বেরিয়ে এল। তিন ছেলেও এল। ওরা ফ্রান্সিসদের দেখে অবাক। ফ্রান্সিসরা আবার বলল–কেউ কোন শব্দ করবেনা।
কামাররা আগুন জ্বালল। আগুনে লোহার শাবল মতো লোহা ঢোকাল। হাঁপড়টানতে লাগল। — কিছুপরে সেই আগুন লাল লোহার মুখ দিয়ে পায়ের বেড়ি কাটা শুরু হল। ফ্রান্সিস বলল–দেহরক্ষীরা পিছু ধাওয়া করছে। ওদের সঙ্গে লড়তে হবে। কাজেই আমি শাঙ্কো বিস্কোর আর হ্যারি আগে বেড়ি কাটিয়ে নিচ্ছি।
বেড়ি কাটা শুরু হল। কিছুক্ষণের মধ্যে পাঁচজনের বেড়ি কাটা হয়ে গেল। আগুন মুখ লোহার আঁচে তখনও ফ্রান্সিসদের পা দপ্ করছে। তবু বেড়ি থেকে মুক্তি। অন্যদের বেড়ি কাটা চলল।
ওদিকে দেহরক্ষীরা জাহাজঘাটে পৌঁছল। কিন্তু ফ্রান্সিসদের চিহ্নমাত্র নেই। কোথায় পালালো সব? একজন বলল–নিশ্চয়ই ওদের জাহাজে লুকিয়ে আছে। কিন্তু কোনটা ফ্রান্সিসদের জাহাজ তা বুঝল না। পার্তাদের বাহারি জাহাজটা জলে ভাসছিল। ওরা সেই জাহাজে উঠল। ঘুমন্ত চালককে তুলল। একজন বলল-ক্রীতদাসরা পালিয়েছে। এদিকেই এসেছে। ওদের জাহাজ কোনটা? চালক আঙুল তুলে ফ্রান্সিসদের জাহাজটা দেখাল।
দেহরক্ষীরা ফ্রান্সিসদের জাহাজের কাছে এল। পাটাতন পাতা নেই। একজন জলে নামল। সাঁতার দিয়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজের কাছে গেল। হালের কাছেদড়িদড়া ধরে জাহাজে উঠল। ডেক-এ এল। ডেকজনশূন্য। ও পাটাতন টেনে আনতে লাগল। কিন্তু দারুণ ভারি পাটাতন। আনতে সময় লাগল। বেশ কষ্ট করে পাটাতন পাতল। বাকি তিনজন উঠে এল।
ওরা তরোয়াল হাতে সিঁড়ি দিয়ে কেবিনঘরগুলোর কাছে এল। কেবিনঘর, রান্নাঘর খুঁজে দেখল। কেউ নেই। তাহলে ওরা গেল কোথায়? বেশিদূর তো যেতে পারেনি। পায়ের বেড়ি নিয়ে আর কত জোর ছুটবে?
তখনই একজন বলল–ওরা নিশ্চয়ই কামারশালায় গেছে। বেড়ি কাটতে।
–ঠিক। আর একজন বলল।
ওরা কামারশালার দিকে চলল।
কামারশালার কাছে এসে হাঁপর টানার শব্দ শুনল। তাহলে বেড়ি কাটার কাজ চলছে।
ফ্রান্সিস কামারশালার আড়াল থেকে নজর রেখেছিল। রক্ষীদের দেখল। গলা বাড়িয়ে বলল–শাঙ্কো, বিস্কো তোমরা এসো। ওরা এসেছে। একটাকেও ছাড়বেনা। সব কটাকেই হত্যা করবে। কোলাকে ওরা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। বদলা নিতে হবে।
ফ্রান্সিস দ্রুত ছুটে গিয়ে একজন রক্ষীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। রক্ষীরা এত দ্রুত আক্রমণ আশা করেনি। পায়ে বেড়ি নেই। এখন পায়ের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে না। ফ্রান্সিস সেই রক্ষীর তরোয়ালে এত জোরেঘা মারল যে রক্ষীরতরোয়াল ছিটকে গেল। খালি হাতেও বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস একমুহূর্তও দেরি করল না। সোজা ওর বুকে তরোয়াল বিঁধিয়ে দিল। তারপর তরোয়ালটা টেনে খুলে নিল। রক্ষীটি গড়িয়ে রাস্তার পাশের ঝোপে পড়ে গেল।
অন্য তিনজনের সঙ্গে তখন শাঙ্কোরা লড়াই চালাচ্ছে। পায়ে বেড়ি নেই। ওরা স্বচ্ছন্দে। লড়াই চালাচ্ছে। শুধু হ্যারিই পারছিল না। তরোয়ালের ডগা লেগে ওর জামা জায়গায় জায়গায় কেটে গেছে।
