দেহরক্ষীরা ঢুকল। অস্ত্রঘরের দরজা খুলল। দরজায় দাঁড়িয়ে থেকেই উঁইকারে রাখা তরোয়ালগুলোর ওপর ওদের তরোয়ালগুলো ছুঁড়ে ফেলল। ঝঝনাৎ শব্দ হল। শাঙ্কো তখন দেয়ালে প্রায় সেঁটে আছে। চার দেহরক্ষী চলে গেল। ঘরে ঢুকল না। ঘরে একটা মাত্র মশাল জ্বলছে। শাঙ্কোও ছায়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরে ঢুকলেও ওরা শাঙ্কোকে দেখতে পেত না। একটু পরেই সদর দরজার কাছে হালকা পায়ের শব্দ শোনা গেল। শাঙ্কো বুঝল মারিয়া আর পাংলু ফিরে এল। পাংশু দরজা বন্ধ করে দিল।
শাঙ্কো কিছুক্ষণ নিঃশব্দে অপেক্ষা করল। তারপরে আস্তে আস্তে কোন শব্দ না করে পাঁচটা তরোয়াল তুলে নিল। বগলে চেপে ধরল। তারপর পায়ের বেড়ি চেপে ধরে দরজার কাছে গেল। কিছু শব্দ না করে বসে বসে আস্তে আস্তে যাওয়ার জন্যে ওর সময় লাগল।
নিঃশব্দে দরজা খুলল। বাইরে বেরিয়ে এল। তারপর যতটা সম্ভব দ্রুত দেবদারু গাছগুলোর দিকে ছুটে গেল। সদর দরজার দুপাশেই লম্ফলস্য দেবদারু গাছ জায়গাটাকে বেশ অন্ধকার করে রেখেছে।
শাঙ্কো একটা একটা করে তরোয়াল যতটা সম্ভব দ্রুত দেবদারু গাছগুলোর আড়ালে লুকিয়ে রাখল। তারপর ওখান থেকে বেরিয়ে কয়েদঘরের দিকে চলল। কয়দঘরের সামনে প্রহরীরা তখন এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে। শাঙ্কো বুঝল ওকে খোঁজা হচ্ছে।
শাঙ্কো কয়েদঘরের আলোর কাছে এসে দাঁড়াল। প্রহরীরা ভূত দেখার মতো লাফিয়ে উঠল। একজন প্রহরী তরোয়াল খুলে শাঙ্কোর কাছে ছুটে এল। বলল–গুনতে গিয়ে দেখি একজন কম। কোথায় গিয়েছিলে তুমি?
–প্রস্রাব করতে। শাঙ্কো নির্বিকার মুখে বলল।
কয়েদঘরে করলেই পারতে। প্রহরী বলল।
–ভীষণ পেয়েছিল। যাক গে–আমি তো এসে গেছি।
–ভেতরে ঢোক। প্রহরী গম্ভীরগলায় বলল।
শাঙ্কো কোন কথা না বলে ফ্রান্সিসদের কাছে এল। প্রহরীরা তখনও দরজায় দাঁড়িয়ে। ফ্রান্সিস কোন কথা বলল না। মৃদুস্বরে বলল–ছকমতো কাজ হয়েছে? শাঙ্কো মৃদু হেসে বলল–পাঁচটা তরোয়াল-দেবদারু গাছের আড়ালে। ফ্রান্সিসও মৃদুস্বরে বলল–সাবাস।
রাতের খাওয়ার পর পরিবেশক চলে গেল। ফ্রান্সিস দরজার কাছে গেল। দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল–প্রহরীরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বলতে লাগল–ভাইসব–পালাবার ছক প্রত্যেককে বলেছি। সবাইকে সৈইমতো কাজ করতে হবে। কোনরকম ভুল যেন না হয়। এবার সবাই শুয়ে পড়। কিন্তু কেউ ঘুমিয়ে পড়বেনা। ছকঠিকমতো খাটলে আমাদের বহু আকাঙিক্ষত মুক্তি। কাজ অনেকদূর এগিয়েছে। এবার শেষ কাজটা বাকি।
রাত গভীর হতে লাগল। কয়েদঘর নিঃস্তব্ধ। বেশ গভীর রাতে ফ্রান্সিস মৃদু স্বরে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো কাছেই ছিল। বলল–বলো।
–সেই পুরনো কায়দাটাই কাজে লাগাতে হবে। সেই পেটব্যথা। প্রহরীদের ঘরে ঢোকানো। বন্দী কর। শুরু কর। ফ্রান্সিস বলল।
হঠাৎ শাঙ্কো চাপা চিৎকার শুরু করল। প্রায় সবাই উঠে পড়ল। শাঙ্কো বিছানার ওপর এপাশ ওপাশ করতে লাগল আর গোঙাতে লাগল। প্রহরী দু’জন ছুটে দরজার কাছে এল। ওরা বুঝে উঠতে পারল না কী করবে।
বিস্কো উঠে দরজার কাছে গেল। বলল–শিগগির বদ্যি ডাকো। আমাদের এক বন্ধু পেটের ব্যথায় মারা যাচ্ছে।
–এত রাতে বদ্যি কোথায় পাবো? একজন প্রহরী বলল।
–তাহলে বন্ধুটি কি মারা যাবে? বিস্কো বলল।
অন্য প্রহরীটি বলল–ও কিছুক্ষণ পরেই ঠিক হয়ে যাবে।
–ঠিক আছে। একবার এসে তো দেখ বন্ধুর অবস্থাটা।
তখনও শাঙ্কোর গোঙানি চলছে।
–দেখি তো কী ব্যাপার? চলো। একজন প্রহরী বলল।
দরজা খুলে একজন প্রহরী ঢুকল। অন্যজন দরজা ভেজিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–ঢুকল। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে গলার কাছ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ছোরাটা বের করে ছোরাসুদু হাতটা পিঠের নীচে রাখল। প্রহরীটি শাঙ্কোর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে ছোরাটা ওর বুকে ঠেকাল। দাঁতচাপা স্বরে বলল–চুপ করে থাকো। চিৎকার করেছো কি মরেছো। দরজায় দাঁড়ানো প্রহরীটি বুঝল কিছু গণ্ডগোলে ব্যাপার। ও খাপ থেকে তরোয়াল খুলে ছুটে ঘরে ঢুকল। বিস্কো তৈরীই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে প্রহরীটির পেটে জোর ঠুমারল। প্রহরীটি দেয়ালের গায়ে গিয়ে পড়ল। হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে গেল। দেয়ালে মাথা ঠুকে গেল। ও মেঝেয় বসে পড়ল।
হ্যারি ফ্রান্সিসের নির্দেশমত ওর কোমরের ফেট্টি খুলে ছিঁড়ে ছিঁড়ে লম্ফ ফিতের মতো করে রেখেছিল। হ্যারি সেসব বেরকরল। শাঙ্কো একজন প্রহরীর হাত বাঁধল ঐ ফিতে দিয়ে। ফ্রান্সিস তার মুখ চেপে ফিতে বাঁধল। প্রহরীটি গোঁ গোঁ করতে লাগল। শাঙ্কো ওর গালে জোরে এক থাপ্পড় মারল। প্রহরীটির গোঁ গোঁ বন্ধ হল। অন্যটিরও হাত মুখ বাঁধা হল।
কয়েদঘরের দরজা খোলা।
মুক্তি।
ফ্রান্সিস চাপা স্বরে বলল–আস্তে।
আস্তে আস্তে সবাই কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে এল।
সদর দরজার মাথায় মশাল জ্বলছে। মশালের আলোর বাইরে এসে ওরা অন্ধকারে। দাঁড়াল। শাঙ্কো দেবদারু গাছের নীচে ঢুকল। তরোয়ালগুলো বের করে নিল। ফ্রান্সিস চাপা স্বরে বলল কুকুরের ডাক। শাঙ্কো মুখের সামনে হাতের তালু রেখে ডেকে উঠল– ভৌ-ভৌ।
খটকরে সদর দরজা খুলে গেল। মারিয়া আর পাংলু বেরিয়ে এল। ওদের সঙ্গে যোগ দিল।
–গেট এর দিকে ছোটো। দু’পা ফাঁক করে ছুটতে হবে। তাহলে বেড়িতে বেড়িতে লেগে শব্দ হবে না। ফ্রান্সিস চাপা স্বরে বলল।
