রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডাকল। হ্যারি ওর পাশেই বসে। ফ্রান্সিস গলার স্বর নামিয়ে দেশীয় ভাষায় ওর পালানোর ছকের কথা বলতে লাগল। হ্যারি আর শাঙ্কো মাথা নীচু করে শুনতে লাগল।
সব শুনে হ্যারি মৃদুস্বরে বলল–সাবাস ফ্রান্সিস।
–তাহলে পার্তাদো ফেরার আগেই ছক কাজে লাগাবে? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–সেটাই ইচ্ছে। কিন্তু পার্তাদো কবে ফিরবে ওঙ্গাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ওঙ্গা বলতে পারল না। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক। পালানোর রাতটা ঠিক কর। হ্যারি বলল।
–সেটাই ভাবছি। ফ্রান্সিস বলল।
–অনেক রাত হল। ঘুমিয়ে পড়। হ্যারি বলল।
তিনজনে শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো ভাবল–ফ্রান্সিস অনেক দায়িত্ব দিল। পারবো? পরক্ষণেই ভাবলো–পারতেই হবে। এই ক্রীতদাসের জীবন থেকে মুক্তি চাই। যে কোন মূল্যে!
পরের দিন সকালে ফ্রান্সিসরা সবে সকালের খাবার খেয়েছে পার্তাদো এসে হাজির। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পার্তাদো গলা চড়িয়ে বলল–কেমন আছো সব?
–একজন আপনার দেহরক্ষীর হাতে মারা গেছে। বাকিরা বেঁচে আছি। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। ওঙ্গার কাছে সব শুনলাম। আমি তো বলেছি পালাবার চেষ্টা করবে না। ওটা করলে মরতে হবে। পার্তাদো বলল।
–যে ভাবে বেঁচে আছি। মরে যাওয়াই ভালো। হ্যারি বলল।
-না না। শুধু শুধুমরতে যাবে কেন? দেখছি তো ভালোই আছো তোমরা। পার্তাদো একাই হেসে বলল।
কেউ কোন কথা বলল না। কোলার মৃত্যু দেখে সবাই রাগে ফুঁসছে। কিন্তু কথা বলা বৃথা। পার্তাদো ওদের মানুষ হিসেবে দেখে না। ক্রীতদাস হিসেবেই দেখে।
–আমি বলেছি তোমাদের মাংসটাংস দিতে–যাতে তোমরা গায়ে জোর পাও। পার্তাদো বলল।
এবার কেউ কোন কথা বলল না।
পার্তাদো চলে গেল।
–ফ্রান্সিস-পার্তাদো তো ফিরে এল। শাঙ্কো বলল।
–ঠিক আছে। ছক অনুযায়ী কাজ চলবে। ফ্রান্সিস বলল।
বল কাটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
বিকেলে কাজের শেষে ফ্রান্সিসরা ফিরে আসছে। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–শাঙ্কো, দেহরক্ষীরা এখনও ফেরে নি। সবাইকে বলে রেখেছি। ওঙ্গা আর তার সঙ্গী দরজা দিয়ে ঢুকছে। কাজে লাগো।
তারপর বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বলল–সব সদর দরজায় চলো। একসঙ্গে।
সবাই বেশ ছুটেই সদর দরজার কাছে গিয়ে জড় হল। শাঙ্কো ততক্ষণে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে খোলা দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
দেহরক্ষীরা তখনই ক্ষেতের ওপর দিয়ে ফিরে আসছিল। দূর থেকে ফ্রান্সিসদের জটলা দেখে ছুটে এল। তরোয়াল উঁচিয়ে ফ্রান্সিসদের সামনে এল ওরা। তখনও ওরা হাঁপাচ্ছে। একজন দেহরক্ষী এগিয়ে এল। বলল–কী ব্যাপার? তোমাদের তো কয়েদঘরে। ঢোকার কথা। এখানে কী চাই?
কর্তাসাহেবকে ডেকে দাও। কথা আছে। ফ্রান্সিস বলল।
কর্তাসাহেব তোমাদের মত ক্রীতদাস নয় যে ডাকলেই আসবে। অন্য রক্ষীটি বলল।
–কিন্তু একটা দরকারি কথা ছিল। ফ্রান্সিস বলল।
–কী কথা। রক্ষীটি বলল।
–তোমাকে নয়। কর্তাসাহেবকে বলব। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। আমাকে বলো। আমি কর্তাসাহেবের কাছে গিয়ে বলছি। রক্ষী বলল।
–তাহলে শোন। গত দুদিন যাবৎ বদ্যি আসছে না। আমাদের পায়ের ক্ষত এখনও শুকোয়নি। আরো ওষুধ চাই। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। তোমরা কয়েদঘরে যাও। আমি গিয়ে বলছি। দেহরক্ষীটি বলল। তারপর ওরা বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরে ফিরে এল। বিকেলের খাবার খেল। তখনই মারিয়া আর পাংলু এল। পাংলুর চোখমুখ দেখেই ফ্রান্সিস বুঝল পাংলু খুব কান্নাকাটি করেছে। ফ্রান্সিস মনে গভীর ব্যথা অনুভব করল। পাংলু চুপ করে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল।
ফ্রান্সিস দেশীয় ভাষায় চাপাস্বরে বলল–মারিয়া আজ রাতে আমরা পালাবো। মারিয়া। চমকে উঠল। একবার চারিদিক তাকিয়ে নিয়ে বলল–পারবে?
–আলবাৎ পারবো। এবার তোমাকে যা বলছি মন দিয়ে শোন। আজ রাতে ঘুমিয়ে পড়বে না। পাংলুকেও বলবেনা ঘুমোতে। রাত গভীর হলে তোমরা দু’জনে সদর দরজার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে। তোমাদের অন্দরমহলে কোন প্রহরী থাকে?
–না। মারিয়া বলল।
তারপর কান পেতে থাকবে বাইরে কুকুরের ডাক শোনার জন্য। ফ্রান্সিস বলল।
–এ বাড়িতে তো কুকুর নেই। মারিয়া বলল।
দরকার নেই। কুকুরের ডাক শুনলেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসবে। দেখবে আমরা আছি। পাংলু দরজা বন্ধ করে অন্দরমহলে চলে যাবে। পাংলুকে সব বুঝিয়ে বলতে পারবে? ফ্রান্সিস বলল।
অনেকদিন একসঙ্গে আছি। ইশারা ইঙ্গিতে পংলু আমার কথা বোঝে। ওর কথাও আমি বুঝি। সেদিক থেকে কোন অসুবিধে হবেনা। তবে একটা কথা বলছিলাম পাংলুকেও আমাদের সঙ্গে নিয়ে চলো না। পাংলুও তো মুক্তি চায়।
–পাংলুকে সঙ্গে নিলে সমস্যায় পড়তে পারি। ফ্রান্সিস বলল।
–আমি গেলে পাংলুও যেতে পারবে। আমার সঙ্গে থাকবে। কোনো বন্দরে ওকে নামিয়ে দিও। ওর সমস্যার সমাধান ওই করবে। মারিয়া বলল।
–বেশ। পাংলুকেবলো। ফ্রান্সিস বলল–যা বললাম ঠিক সেইমতো কাজ করবে। একটু এদিক ওদিক হলে জীবন সংশয় হবে।
-না-না। আমি আমার কাজ ঠিক পারবো। মারিয়া বলল।
–ঠিক আছে। আর একটা হাত বাঁধার কিছু দড়ি নিয়ে আসবে। অস্ত্র ঘরেই পাবে। ফ্রান্সিস বলল।
ওদিকে শাঙ্কো অস্ত্রঘরের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। কান পেতে সব শুনছে।
কিছুক্ষণ পর বাড়ির দরজা খোলার শব্দ হল। শাঙ্কো বুঝল কেউ ঢুকল।
