–না। দরজা ভেজানো থাকে। ঠেললেই খুলে যায়। মারিয়া বলল।
–কোন প্রহরী থাকে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–না। ফ্রান্সিস হেসে বলল–সবই অনুকুল। এবার ছক কাজে লাগানো।
রাতে কোলা এল।
পাংলুকে জিজ্ঞেস করেছো? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
হ্যাঁ। ও বলল–শুধু ভেতর থেকে তালা দেওয়া থাকে। বাইরে কোন তালা লাগানো হয় না। কোলা বলল।
–কাজটা সহজ হয়ে গেল। ফ্রান্সিস হাঁফ ছেড়ে বলল।
–তোমরা কি পালাতে পারবে? কোলা জিজ্ঞেস করল।
–এখনই ঠিক বলতে পারছি না। আগে কাজ শুরু করি। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা কবে পালাতে পারবে কে জানে। আমি একাই পালাবো। কোলা অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে ঘাড় নেড়ে বলল।
সাবধান। এভাবে বিপদ ডেকে এনো না। ফ্রান্সিস বলল।
কোলা গম্ভীরগলায় বলল–আমি তোমাদের বিশ্বাস করিনা। কথাটা বলে ও চলে গেল। আর একটা কথাও বলল না। কথাটা ফ্রান্সিসের ভালো লাগল না। ও নিজের সম্পর্কে এরকম কথা ও কখনও শোনেনি। ও ভাবল কোলার ওপর রাগ না করে ওকে বুঝিয়ে বলবে।
জঙ্গল প্রায় অর্ধেক কাটা হয়ে গেল। শুধু কাটা গুঁড়িগুলো উঁচিয়ে আছে।
গাছকাটার কাজ সেরে ফ্রান্সিসরা ফিরে এল। আসতে আসতে ওঙ্গা বলল–গাছ। কাটা হলে তোমাদের চাষের কাজে নামতে হবে।
–এই ক্ষেতে কীসের চাষ হয়? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–তুলো। ওঙ্গা বলল।
–তুলো? শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। দেখছো না এখানে মাটির রঙ কালো। ওঙ্গা বলল।
ওরা কয়েদঘরে ফিরে এল।
ফ্রান্সিস কয়েকদিন যাবৎ লক্ষ্য করল কোলা রাতের খাওয়ার পর আর ওর কাছে। আসে না। কাজ করতে করতেও কথা বলতে আসে না। কেমন গুম মেরে থাকে।
দু’দিন পরের ঘটনা।
সেদিন ফ্রান্সিসরা গাছ আগাছা কাটছে। ফ্রান্সিস ভাবল দেখে আসি জঙ্গলটা কত বড়। ও কুড়ুল রেখে গাছের গুঁড়ি এড়িয়ে হাঁটতে লাগল।
বন শেষ। বনের বাইরে এল। ওকে দেখে দেহরক্ষীরা তরোয়াল উঁচিয়ে ছুটে এল। ফ্রান্সিস দুহাত তুলে ওদের থামাল। তারপর জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। কাজের জায়গায় এল।
–কোথায় গিয়েছিলে? ওঙ্গ জানতে চাইল।
–জঙ্গলটা দেখলাম। জঙ্গলের গাছ আর বেশী বাকি নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–পালাতে চেয়েছিলে? ওঙ্গা বলল।
–না। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল।
–সেই চেষ্টাও কোরো না। সাহেবকর্তার হুকুম কেউ পালাতে গেলে মেরে ফেলবে। বনের শেষে দেহরক্ষীরা আছে। ওঙ্গা বলল।
-জানি। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস কাজে লাগল। হঠাৎ ওঙ্গা আর তার সঙ্গীর চিৎকারে ফ্রান্সিস ফিরে তাকাল। দেখল কোলা বনের মধ্যে দিয়ে ছুটে পূবমুখো যাচ্ছে আর ওঙ্গারা চিৎকার করে বলছে পালাচ্ছে–পালাচ্ছে।
গাছের কাটা গুঁড়িতে পা লেগে কোলা মুখ থুবড়ে পড়ল। উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটল। উঁচিয়ে থাকা গাছের গুঁড়ি দুপায়ে বেড়ি। কোলা জোরে ছুটতে পারছিল না।
ফ্রান্সিসও কোলার পেছনে পেছনে ছুটতে লাগল। চিৎকার করে বলতে লাগল– কোলা পালাবার চেষ্টা করো না। ফিরে এসো। কোলা–আ। কিন্তু কোলা ছুটে জঙ্গলের বাইরে চলে এল। ফ্রান্সিস দেখল চারজন দেহরক্ষী মধ্যে কোলা একজনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে খোলা প্রান্তর দিয়ে ছুটল। কিন্তু পায়ে বেড়ি। ও আর কত জোরে ছুটবে? প্রান্তরের প্রায় মাঝামাঝি এসেছে দেহরক্ষীরা ওকে ধরে ফেলল। ছুটন্ত কোলার মাথায় এক দেহরক্ষী কোপ বসাল। অন্যজন ওর বুকে তরোয়াল বিধিয়ে দিল। কোলা ঘাসের ওপর গড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে এই দৃশ্য দেখল। কোলা বারকয়েক এপাশ ওপাশ করে স্থির হয়ে গেল। ফ্রান্সিসের চোখে জল এল। বন্ধুরাও তখন ছুটে এসেছে। কিন্তু ওঙ্গা আর সঙ্গী দু’হাত ছড়িয়ে ওদের বনের বাইরে আস্তে দিল না।
ফ্রান্সিস–শাঙ্কো অস্ফুটস্বরে ডাকল। ফ্রান্সিস ফিরে তাকাল। শাঙ্কো ওভাবেই বলল–এখন পালানো যায় না?
–পায়ে বেড়ি নিয়ে কত জোরে আর ছুটবে। দেখছো না কোলার কী অবস্থা হল। ফ্রান্সিস বলল।
দেহরক্ষীরা কোলার মৃতদেহ দুহাত ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসতে লাগল। উপস্থিত সবাই তখন স্তব্ধ। কোলার মৃতদেহ দেখে বন্ধুদের অনেকের চোখেই জল এল। শুধু ফ্রান্সিস অরুদ্ধস্বরে বলল–আমি কোলাকে অনেকবার মানা করেছি। ও শুনল না।
বনের মধ্যে দিয়ে কোলার মৃতদেহ টেনে হিঁচড়ে দেহরক্ষীরা নিয়ে আসতে লাগল।
ওঙ্গা গলা চড়িয়ে বলল–আজকের মতো কাজ শেষ। ফিরে চলো সব।
কাদাটে ক্ষেতের ওপর দিয়ে কোলার মৃতদেহ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এল ওরা। কোলার দেহ কাদায় মাখামাখি।
মৃতদেহ এনে কয়েদঘরের সামনে ফেলে রাখা হল।
ফ্রান্সিসদের কয়েদঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। বাড়ির ভেতর থেকে কৃষ্ণকায়া পরিচারিকা এল। কিন্তু তাদের চোখেমুখে কোন দুঃখের চিহ্ন দেখা গেল না। কারণ ওরা এসব দেখে অভ্যস্ত।
কিছু পরে মারিয়া আর পাংলু এল। কোলার কাদামাখা মৃতদেহ দেখে পাংলু হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। মারিয়াও দুচোখ দুহাতে চেপে কান্না থামাল।
ফ্রান্সিসদের খুব তাড়াতাড়ি প্রহরীরা কয়েদঘরে ঢুকিয়ে দিল। পাছে কোলার এই নির্মম মৃত্যু দেখে ফ্রান্সিসরা ক্ষেপে ওঠে।
কয়েদঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। বার বার কোলার কথা মনে হতে লাগল। কোলার এই মৃত্যু ও মন থেকে মেনে নিতে পারছিল না। কী হত কোলাকেনা মেরে যদি বাঁচিয়ে রাখা হত। ওকে তো কয়েদঘরেই বন্দী হয়ে থাকতে হত। কেন ওকে হত্যা করা হল?
গতরাতে ফ্রান্সিস অনেক রাত পর্যন্ত জেগে পালাবার ছক কষেছিল। এবার সেসব গুছিয়ে ভাবতে লাগল।
