ফ্রেদারিকো থামল। ওর গল্পের এই ভাজিম্বা ছেলেটির জন্য ফ্রান্সিস ও হ্যারি দু’জনেই গভীর সহানুভূতি অনুভব করল। দু’জনেই চুপ করে রইলো। ফ্রেদারিকো চুপ করে তামাক চিবোচ্ছে। কিন্তু ওরা দু’জন আর ওকে বলবার জন্যে অনুরোধ করতে পারল না। ফ্রেদারিকো নিজে নিজেই বলতে শুরু করল–ফ্রান্সিস তোমাকে সব ঘটনাটাই বলবো। শোন তারপর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। আয়নাটা পরে থাকি। লোকে দেখলে হাসে। আমিও আয়নাটায় মুখ দেখি, ভেংচিকাটি। দিন কাটতে লাগল এ জাহাজে, ও জাহাজে ঘুরে-ঘুরে। কিন্তু দক্ষিণ সমুদ্রের দিকে যাবে এমন জাহাজ অনেকদিন চেষ্টা করেও পেলাম না। হঠাৎ একটা জাহাজ পেলাম। শুনলাম, জাহাজটা চাঁদের দ্বীপের সোফালা বন্দরে যাবে। তবে অনেকক’টা বন্দরে ঘুরে যাবে। আমি সেই জাহাজে খালাসীর কাজ নিলাম। এ বন্দর সে বন্দর ঘুরতে-ঘুরতে জাহাজটা একদিন সোফালা বন্দরে এসে, ভিড়ল। মাহাবো বলেছিল, আয়নাটা যেন কোন ভাজিম্বার চোখে না পড়ে। রাজপুরোহিতের আয়না আমার গলায় দেখলে ওরা আমাকে সঙ্গেসঙ্গে মেরে ফেলবে। কারণ ওরা বিশ্বাস করে যে আয়নাটা মন্ত্রপুত। রাজপুরোহিত ছাড়া আর কারো ওটা পরার অধিকার নেই। একটা কথা বলা হয়নি, আয়নাটা একদিন গলা থেকে খুলে পরিষ্কার করছি। হঠাৎ হাত থেকে পড়ে গেল। আয়নার জোড়াটা খুলে গেল। তখনই ভেতরে সাঁঠা চামড়ায় আঁকা নক্সাটা পেলাম। যা হোক–আমি আয়না দু’টো কোমরে গুঁজে সোফালা বন্দরে নামলাম। তখন রাত হয়েছে। ঘন বন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চললাম মুক্তোর সমুদ্রের দিকে। কিন্তু জানতাম না যে কেউ যাতে মুক্তোর সমুদ্রে নেমে মুক্তো চুরি করতে না পারে, তার জন্য ভাজিম্বারা মুক্তোর সমুদ্রের এপাশে বনের মধ্যে অনেক ফাঁদ পেতে রেখেছে। কারোর উপায় নেই সেই ফাঁদ এড়িয়ে যায়। আমিও পারলাম না। বুনো লতায় তৈরি সেই ফাঁদে হঠাৎ পড়ে গেলাম। খোঁড়া গর্তের মধ্যে পড়ে রইলাম। হয়তো একটু তন্দ্ৰামত এসেছিল। তন্দ্রা ভেঙে গেল পাখির ডাকে। ভোর হয়েছে। কত বিচিত্র রকম পাখি। কিন্তু এসব দেখার অবকাশ কোথায়। ভাজিম্বাদের হাতে ধরা পড়লাম। ভাগ্যে কি আছে কে জানে। একটা বিচিত্র বর্ণের লেমুর তার আঙ্গুলগুলো মানুষের সমান। গর্তটার কাছ দিয়ে কয়েকবার ঘুরে গেল। ভাবলাম, ভাজিম্বাদের হাতে ধরা পড়ার আগে বুনো শুয়োরের দাঁতের ঘায়ে প্রাণটা না যায়।
একটু বেলা হতে দূরে কাদের কথাবার্তা শুনলাম। একটু পরেই একদল ভাজিম্বা শিকারী ওখানে এল। ওরা ভেবেছিল, কোন বুনো জানোয়ার বোধহয় ফাঁদে পড়েছে। আমাকে দেখে ওরা খুব অবাক হলো না। হয়তো মুক্তো চুরি করতে এসে অনেকেই এইরকম ফাঁদে ধরা পড়েছে। এটা নতুন কিছুনয়। ওরা আমাকে টেনে তুললো। তারপর বুনো লতায় হাত বেঁধে আমাকে নিয়ে চললো। ওদের লক্ষ্য ছিল যে রাজবাড়ি, সেটা বুঝতে আমার অসুবিধে হ’ল না। কারণ দুটো আয়নার মাঝখানে সাঁঠা চাঁদের দ্বীপের নক্সাটা দেখে-দেখে আমার প্রায় মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। রাজবাড়িতে যখন পৌঁছলাম, তখন বেশ বেলা হয়েছে। বোধহয় রাজাকে আমার ধরে আনার খবর দেওয়া হয়েছিল। রাজসভায় রাজা, মন্ত্রী, সেনাপতি একটু পরেই এলেন! সেনাপতি আমাকে ঠিক চিনল। কাঁচে ছোপ ধরা দাঁত বের করে দাঁত খিচুনি দেওয়ার মত হাসলো। আমার বিচার শুরু হ’ল। সেনাপতি আমাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বার-বার রাজাকে কি সব গড় গড় করে বলে গেল। ন্যাড়ামাথা রাজা ডান হাতটা ওপরের দিকে তুলে তর্জনীটা উঁচিয়ে ধরলেন, তারপর বেশ জোরে কি যেন বললেন। তারপর মুক্তো বসানো কাঠের সিংহাসন থেকে নেমে চলে গেলেন। মন্ত্রী আর উপস্থিত অন্যান্য দু’চারজন গণ্যমান্য ব্যক্তি রাজার পিছু পিছু চলে গেলেন। সেনাপতি এগিয়ে এসে ভাঙা-ভাঙা পর্তুগীজ ভাষায় বলল–মুক্তো চুরি করতে এসিছিলি। সেই মুক্তোর সমুদ্রেই তোকে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। যত পারিস, মুক্তো তুলে নিস্। কথাটা বলে দাঁত খিঁচিয়ে হাসলো। সৈন্যদের কি হুকুম দিল। ওরা আমাকে টেনে নিয়ে চললো। সৈন্যরা একটা ঘরে আমাকে ঢুকিয়ে দিল। ঘরটা দেখেই বুঝলাম, এটাই শাস্তিঘর। মাহাবোর মুখে এই শাস্তিঘরের কথাই শুনেছিলাম। ঘরটার চারদিকে কাটাগাছের বেড়া। রেনট্রির পাতায় ছাওয়া ঘর। মেঝেটা মাটির। এবড়ো-খেবড়ো। একপাশে একটা মাটির পাত্রে জল রাখা। মাঝখানে একটা জ্বলন্ত উনুন। ধোঁয়ায় ছোখ জ্বালা করতে লাগল। গমে দর দর করে ঘামতে লাগলাম। কাল রাত্রে সেই জাহাজ থেকে খেয়ে বেরিয়েছিলাম। এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো–কিছু খাই নি। ওরা খেতে দেবে বলেও মনে হলো না। চুপ করে বসে রইলাম। ভাবতে লাগলাম একমাত্র ভরসা কোমরে গাঁজা দু’টো আয়নার টুকরো। আয়নার ধারালো কোণা দিয়ে যদি কোনভাবে পাতার বাঁধন কাটতেপারে। কিন্তু বাঁধন কাটলেই কি পালাতে পারবো? বাইরে ভাজিম্বা যোদ্ধারা পাহারা দিচ্ছে। মাহাবো বলেছিল, ওরা নাকি অন্ধকারেও দেখতে পায়।
একটু থেমে ফ্রেদারিকো বলতে লাগল–এসব সাতপাঁচ ভাবতে-ভাবতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। কিছুই খেতে দিলো না। মাটির পাত্রটায় মুখ চুবিয়ে পেট ভরে জল খেলাম। রাত হলো। শাস্তিঘরের সামনের উঠোনে মশাল জ্বালিয়ে দিলো। পাহারা ঠিকই চললো।
