রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর কোলা ফ্রান্সিসের কাছে এল। ফ্রান্সিস তখন চোখ বুজে শুয়ে পড়েছে। কোলা ওর মাথার কাছে বসল। বলল–মেয়েটির বাড়ি আমাদের গ্রামের পাশের গ্রামে। একদিন গভীর রাতে ক্রীতদাস ব্যবসায়ী গুণ্ডারা ওদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে ওদের ধরে নিয়ে আসে। ঐআমারগো বন্দরেরক্রীতদাসেরহাটেইবিক্রি করে। ওদের কাজ হল যাঁতায় গম ভাঙা।
-একদিনেই এত কথা জেনে গেলে। ফ্রান্সিস চোখ বুজেই হেসে বলল।
জিজ্ঞেসটিজ্ঞেস করে জানলাম। কোলা হেসে বলল।
কালকেও তো ঐ মেয়েটি এলে বকরবকর করবে। ফ্রান্সিস বলল।
–কতদিন পরে দেশের লোক পেয়েছি। কোলা হেসে বলল।
তাহলে এক কাজ কর। তোমরাই কথা বল। আমরা বলবো না। ফ্রান্সিস বলল।
না–না। তা কী করে হয়। তোমরাও বলবে আমরাও বলবো। কোলা বলল।
–তাহলে ব্যাপারটা জগাখিচুড়ি হয়ে যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে–আমরা অল্প কথা বলবো।
–আরে না না। –ফ্রান্সিস হেসে উঠল–তোমরা বেশি কথাই বলো।
–ঠিক আছে। কোলা বলল।
–গতকাল বিকেলের খাবার খাওনি। ফ্রান্সিস বলল।
–মনেই ছিল না। কোলা হেসে বলল।
–না খেয়ে থেকো না। শরীরটা ঠিক রাখো। ফ্রান্সিস বলল।
পরদিন বিকেল নাগাদ জল ছিটোনোর কাজ সেরে সবাই কয়েদঘরে ফিরে এল। সবাই শুয়ে বসে বিশ্রাম করছে। কোলা কিন্তু একা ঠায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ বাড়ির পূব দেয়ালের দিকে। ওদিক দিয়েই মারিয়ারা আসে।
তখনই বিকেলের খাবার দেওয়া হল। ফ্রান্সিস ডাকল–কোলা। কোলা ফ্রান্সিসের দিকে ফিরে তাকাল।
কোলা দরজা থেকে সরে এসে খাবার খেতে লাগল। তখনই মারিয়ারা এল। কোলার তখনও খাওয়া শেষ হয়নি। ফ্রান্সিস ধমক দিয়ে বলল–কোলা-খাবার খেয়ে যাও। এবার কোলা খাওয়া শেষ করল।
ফ্রান্সিসের আগেই খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। ও গিয়ে দরজায় দাঁড়াল। মারিয়া বলল ওষুধে কাজ হয়েছে?
–হ্যাঁ। জ্বালা যন্ত্রণা অনেকটা কমেছে। তবে যতদিন ধরে বালতি টানাটানি করবো ততদিন সবটা সারবে বলে মনে হয় না। ফ্রান্সিস বলল।
কর্তাসাহেব বদ্যিকে বলেছে সবাইকে কাজকরবার মতো সুস্থ করে তুলতে। প্রত্যেক সন্ধ্যায় বদ্যি ওষুধ দিতে আসবে। মারিয়া বলল।
-হ্যাঁ। আমাদের তো সুস্থ থাকতেই হবে। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল।
ততক্ষণে কোলা এসে দাঁড়িয়ে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছে। ফ্রান্সিস একবার হেসে ওদের দিকে তাকাল কিন্তু কিছু বলল না। মারিয়ার সঙ্গে এটা ওটা নিয়ে কথা বলতে লাগল।
হ্যারি দরজার কাছে এগিয়ে এল। মারিয়াকে জিজ্ঞেস করল রাজকুমারী, আপনি কেমন আছেন?
–আজ ভালোই আছি। কিন্তু তোমরা তো ভালো নেই। মারিয়া বলল।
—হ্যাঁ, গাধার খাটুনি খাটছি। হ্যারি বলল।
–হ্যারি তোমার শরীরের দিকে নজর রেখো। এত খাটুনি তুমি সহ্য করতে পারবে না। মারিয়া বলল।
–উপায় নেই। ক্রীতদাসত্ব এমনিই। হ্যারি বলল।
মারিয়া আর কিছু বলল না। ফ্রান্সিসও নিজেদের জায়গায় ফিরে এল। কোলা তখনও বব করে চলেছে।
মারিয়া ঘুরে দাঁড়াল। কোলাদের কথা বন্ধ হল। মারিয়া আর কালো মেয়েটি চলে গেল।
ফ্রান্সিস ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো ওর কাছে এল।
–ইদারার জলের অবস্থা কী? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–অফুরন্ত জল। জলের থই পাচ্ছি না। ইঁদারাটার সঙ্গে বোধহয় সমুদ্রের যোগ আছে।
সমুদ্রের নোনা জলে চাষ হয়? তা নয়। পার্তাদো খুব ভেবেচিন্তে কাজ করে। পার্তাদো খুব গভীর করে ইঁদারা খুঁড়িয়েছে। যাতে জলের অভাব না হয়। কবে জল শেষ হবে। ততদিন পশুর মত খাটতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–ফ্রান্সিস তাহলে পালানো যাবে না। শাঙ্কো বলল।
–তুমিই ভেবে বের করো না কীভাবে পালানো যায়। ফ্রান্সিস বলল।
-তোমার মতো বুদ্ধি আমার নেই। তুমি যা বল তাই আমরা করি। এটা তোমারই কাজ। শাঙ্কো মাথা নেড়ে বলল।
–ভাবছি বুঝলে? আমরা যাতে কেউ আহত না হই, মরে না যাই–সেভাবেই সব ভাবতে হচ্ছে। ফ্রান্সিস চিন্তিত স্বরে বলল।
–দেখ ভেবে। এই জীবন অসহ্য। শাঙ্কো বলে উঠল।
–মেনে নাও। তাহলে দেখবে কষ্টটা কম হচ্ছে। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো আর কিছু বলল না। নিজের জায়গায় ফিরে গেল।
জমিতে জল ছিটোনোর কাজ চলল। সারাদিন। মাঝখানে খাওয়ার জন্যে যেটুকু সময় বিশ্রামের।
সন্ধ্যেবেলা বৈদ্য আসে! ওদের পায়ের অবস্থা দেখে। ওষুধ দিয়ে যায়। রাতে জ্বালা যন্ত্রণা কমে। ওরা ঘুমুতে পারে। কিন্তু ক্ষত একেবারে সারেনা। বোধহয় পার্তাদো এভাবেই ওদের দিয়ে কাজ করাতে চায়।
বিকেলবেলা মারিয়া আর মেয়েটি আসে। মারিয়া ফ্রান্সিসদের সঙ্গে কথাটথা বলে। কোলা আর মেয়েটির বকবকানিও চলে। এটা ফ্রান্সিসদের গা সওয়া হয়ে গেছে। কোলার দুই বন্ধুস্থানীয় কোলার সঙ্গে ঠাট্টা তামাসা করে। কোলা কোন কথা বলে না। গুম হয়ে বসে থাকে।
সেদিন খাওয়া দাওয়ার পর কোলা ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–পাংলু এক অদ্ভুত কথা বলল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়েছিল। চোখ বুজেই বলল–পংলু কে?
কালো মেয়েটা। ওরা নাম পাংলু। কোলা বলল।
–অদ্ভুত নাম। ফ্রান্সিস বলল।
–আমাদের দেশের বাড়িতে এমনি অদ্ভুত নামই হয়। কোলা একটু অভিমানের সুরে বলল।
–তা অদ্ভুত কথাটা কী? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
তুমিতো আমারগো বন্দরের কথা জানো। কোলা বলল।
–হ্যাঁ ওখানেই তোক্রীতদাসেরহাট থেকেআমাদের কেনা হয়ে হয়েছিল। ফ্রান্সিস বলল।
