–তুমি ঠিক বলেছো। এখান থেকে পালানো অসম্ভব। কোলা বলল। তারপর শুতে চলে গেল।
ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। তখনই পায়ের দিকে তাকাল। মশালের আলোয় দেখল-লোহার বেড়িতে ঘষা লেগেলেগে ঘা মতো হয়ে গেছে। জলের বালতি নিয়ে ছুটোছুটিতে আরো ঘা বাড়বে। পাশেই হ্যারি ঘুমিয়ে আছে। ফ্রান্সিস হ্যারির পায়ের দিকে তাকাল। হ্যারির পায়েরও এক অবস্থা। ওষুধ চাই। পার্তাদোকে বৈদ্যির কথা বলতে হবে। মারিয়াকেও দিনে একবার ওদের কাছে আসতে দিতে বলবে।
সেদিন জল ছিটোনোর কাজ সেরে ফ্রান্সিসরা সবে বিকেলের খাবার খাচ্ছে তখনই পার্তাদো কয়েদঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন। প্রহরীরা মাথা নুইয়ে সম্মান জানান।
–কেমন আছো তোমরা? একটু হেসে পার্তাদো বললেন।
–ভালো নেই। ফ্রান্সিস কথাটা বলে দরজার কাছে গেল।
–কেন? খাবার দাবার তো যথেষ্ট দেওয়া হচ্ছে। পার্তাদো বললেন।
ক্ষেতে জল ছিটোনো অত্যন্ত পরিশ্রমের কাজ। শাঙ্কো বলল।
পরিশ্রমের জন্যেই তো তোমাদের কিনে এনেছি। আমার লোক দিয়েই যদি হবে তাহলে আর তোমাদের আনলাম কেন!
পরিশ্রম তো করতেই হবে। কিন্তু তার জন্য তো শরীরটাকেও সুস্থ রাখতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
-কেন? তোমাদের কারো অসুখ করেছে? পার্তাদো বললেন।
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস পা দেখিয়ে বলল–লোহার বেড়ির ঘষায় আমাদের ঘা হয়ে গেছে। পার্তাদো তাকিয়ে দেখলেন। মুখে চুকচুশব্দকরলেন। বললেন–বৈদ্যি পাঠিয়ে দেব।
–পায়ের বেড়ি খুলে ফেললে হয় না? শাঙ্কো বলল।
–না। ওটি হবে না। পার্তাদো মৃদু হেসে বললেন।
এবার ফ্রান্সিস বলল–একটা কথা বলছিলাম।
-বলো। পার্তাদো ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকালেন।
–বলছিলাম-রাজকুমারী মারিয়াকে বিকেলবেলা মানে আমাদের কাজের শেষে যদি এখানে একবার সারাদিনেই একবার আসতে দেন তাহলে ভালো হয়। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমাদের রাজকুমারী ভালো আছে। আমার স্ত্রীর খাস সহচরী হয়ে আছে। সহচরী হিসেবে অমন শিক্ষিতা মেয়ে তো পাওয়া যায় না। পার্তাদো হেসে বললেন।
-সেটাই ওর মুখ থেকে শুনতে চাই। ও নিজেও আমাদের জন্য চিন্তায় থাকে। আমাদের দেখলে, আমাদের সঙ্গে কথা বললে ওর মনটাও ভালো থাকে। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমাদের অনুরোধের দেখছি সীমা নেই। পার্তাদো আবার হেসে বললেন।
-এটাই শেষ অনুরোধ। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। দেখছি। পার্তাদো বললেন।
পরদিন সকালের খাবার খাচ্ছে ফ্রান্সিসরা। তখন বদ্যি এল। গায়ে কালো রঙের বিরাট আলখাল্লা। মুখভর্তি দাড়ি গোঁফ। সব সাদা। গলায় নানারঙের পাথরের মালা। হাতে ঝোলানো কাপড়ের ঝোলা।
কয়েদঘরের দরজা খুলে দেওয়া হল। বদ্যি ঝোলা থেকে দুটো চিনেমাটির বোয়াম বের করল। আঠা-আঠামত কালচে মলম বেরকরল। দুটো মেশাল। তারপর ফ্রান্সিসদের পায়ের ক্ষতে লাগাতে লাগল। শাঙ্কোকে প্রথমে লাগাল। উরি বাবা! কী জ্বলুনি! শাঙ্কো প্রায় লাফাতে লাগল। একটু পরেই জ্বলুনি কমল। কোনো জ্বালা যন্ত্রণা নেই। সকলেরই এক অবস্থা হল।
বদ্যি হেসে বলল–খুব কড়া ওষুধ। লোহার বেড়ির ক্ষত এই ওষুধে অনেকটা সেরে যাবে। সবটা সারবে বিশ্রাম পাবার পর। অবশ্য যদি তোমাদের কপালে বিশ্রাম জোটে। সকলেরই কষ্ট যন্ত্রণা মোটামুটি কমল। বদ্যি ঝোলা তুলে চলে গেল।
এবার কাজ। ক্ষেতে জল ছিটানো। জল ছিটোনোর কাজ চলল দুপুর পর্যন্ত। তারপর খাওয়া। আবার ক্ষেতে নামা। বিকেলের দিকে ছুটি মিলল।
কয়েদঘরে ফিরে সবাই কমবেশি হাঁপাতে লাগল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস ডাকলশাঙ্কো?
শাঙ্কো এগিয়ে এল।
ইঁদারার জলের অবস্থা কী দেখলে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–অসম্ভব। এত গভীর ইঁদারা আর এত জল যেন সমুদ্রের জল। কবে ঐ জল। ফুরোবে বলা কঠিন। শাঙ্কো বলল।
এমনসময় মারিয়া এল। পেছনে একটি কৃষ্ণাঙ্গিনী মেয়ে। বোঝা গেল পাৰ্তাদো মারিয়াকে পাহারার ব্যবস্থাও রেখেছে।
মারিয়া দরজার কাছে এল। ফ্রান্সিস উঠে দরজার কাছে গেল।
–তোমাদের খুব খাটাচ্ছে? মারিয়া জানতে চাইল।
ক্রীতদাস দিয়ে তো খাটানোই হয়। তবে শুনে নিশ্চিন্ত হলাম তুমি নাকি কর্ত্রীর সহচরী হয়েছো? ফ্রান্সিস হেসে বলল।
–হ্যাঁ। তবে ক্রীতদাসী তো। সাবধানে থাকতে হয়। বেশি বাড়াবাড়ি না হয়ে যায়। মারিয়া বলল।
–এ ব্যাপারে খুব সাবধানে থেকো। ফ্রান্সিস বলল।
–শুনলাম বদ্যি এসেছিল। মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ। বেড়ির ঘষায় পা ছুলে গিয়ে–ফ্রান্সিস বলল।
–ওষুধ দিয়েছে তো? মারিয়া জিজ্ঞেস করল।
হ্যাঁ। ওষুধে ভালো কাজ হয়েছে। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল।
ইতিমধ্যে কোলা উঠে এল। সে হেসে হেসে কৃষ্ণাঙ্গিনী মেয়েটির সঙ্গেহাতমুখ নেড়েই ইঙ্গিতে কথা বলতে লাগল। মেয়েটি এবার একটু হেসে কী বলে উঠল। কোলা চেঁচিয়ে বলল–ফ্রান্সিস এ আমার দেশের মেয়ে।
–তাহলে গল্প জুড়ে দাও। ফ্রান্সিস হেসে বলল। মারিয়াও হাসল। এবার কোলা অনর্গল কী সব বলতে লাগল। মেয়েটি কোনটার জবাব দিল কোনটার জবাব দিল না। এতে মারিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সিসের কথা বলতে অসুবিধে হচ্ছিল। ফ্রান্সিস একবার কোলার দিকে দেখে নিয়ে হেসে বলল–মারিয়া, ওদের কথা বলতে দাও। আমাদের কথা থাক। মারিয়াও হেসে সম্মত জানাল। কোলার কথার তখনও শেষ নেই।
মারিয়া ফিরে দাঁড়াল। মেয়েটিও মারিয়ার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। দুজনে সদর দরজার দিকে চলল। কোলা তখনও ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। ফ্রান্সিস বুঝল কোলা কতদিন পরে দেশের লোক পেয়েছে। ওর কথা তাই ফুরোচ্ছে না।
