–তাহলে এখনই কাজ আরম্ভ করতে হবে। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ এখনই। দুপুরে একঘণ্টা বিশ্রাম। তখন এখানে এসে খেয়ে যাবে। ওঙ্গা বলল।
–আমরা তো ক্ষেত থেকে পালাতে পারি। হ্যারি আস্তে বলল।
–পায়ের ঐ বেড়ি নিয়ে? সাত পাও যেতে পারবে না। তার আগেই প্রহরীরা মেরে ফেলবে। কাজেই পালাবার ভাবনা ছাড়ো। ভুলে যেও না তোমরা ক্রীতদাস। কর্তাসাহেবের সব হুকুম। মরে গেলেও সেই হুকুম মানতে হবে। একসময় আমরা দুজনেও এমনি অত্যন্ত কষ্টকর কাজ করেছি। দেখেছি সব সহ্য হয়ে যায়। সহ্য না হলে উপায়ও নেই। ওঙ্গা বেশ বিজ্ঞের মত বলল।
–ঠিক আছে। আমরা কাজ শুরু করছি। শাঙ্কো বলল।
কিন্তু একটা কথা। পায়ে বেড়ি নিয়ে তো আমরা দ্রুত কাজ করতে পারবো না। ফ্রান্সিস বলল।
–তবু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ করতে হবে। ওঙ্গা বলল।
ফ্রান্সিসরা ইঁদারার ধারে গেল। দড়ি-বাঁধা দুটো বড় বালতি। শাঙ্কো আর বিস্কো দুটো বালতির দড়ি হাতে নিল। তারপর জল তুলতে লাগল। বালতিতে ঢালতে লাগল।
বাকি সবাই জলভর্তি বালতি নিয়ে ক্ষেতের দিকে চলল। রোদ চড়া নয় বলে বাঁচোয়া।
ফ্রান্সিস দেখল ক্ষেতের মাটি শুকনো খটখটে। এত দূরবিস্তৃত ক্ষেতের মাটি শুধু বালতির জলে ভেজানো কি সম্ভব? কিন্তু উপায় নেই।
কর্তাসাহেবের হুকুম।
ফ্রান্সিসই প্রথম বালতি থেকে জল ছিটোলো। মুহূর্তে জল শুষে গেল। তবে জল পড়ে মাটির রঙ কালো হল। ফ্রান্সিস বুঝল কালো মাটি। তার মানে তুলোর চাষ হয়।
মাটিতে জল ছিটোনো চলল। বেড়ি পায়ে এতবার ইঁদারা থেকে ক্ষেত-এ যাওয়া। সবাই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ল। হাঁপাতে লাগল। কিন্তু ওঙ্গাদের কোনো হেলদোল নেই। ওরা নির্বিকারে দেখতে লাগল। রোদের তেমন তেজ নেই বলে ওদের কষ্টটা একটু কম হচ্ছিল।
ফ্রান্সিস এবার ভালো করে চারিদিকে তাকাল। দেখল চারপাঁচজন সশস্ত্র প্রহরী দূরের চেস্টনাট গাছটার নীচে বসে আছে। পালাবার পথ বন্ধ।
ক্ষেতে জল ছিটোনোর কাজ চলল।
দুপুর হল। ওঙ্গা গলা চড়িয়ে বলল–খেতে চল।
ফ্রান্সিসরা হাঁপাতে হাঁপনাতে কয়েদঘরে ফিরে এল। প্রায় সবাই ঢ ঢক্ করে জল খেতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল–এক্ষুনি অত জল খেও না। একটু জিরিয়ে নাও।
কিছু পরেই খাবার এল। ক্ষুধার্ত ফ্রান্সিসরা চেয়ে চেয়ে রুটি মাংস খেল। সবজীর ঝোল খেল।
আবার কাজে নামা।
বিকেল পর্যন্ত জল ছিটোনোর কাজ চলল। ওঙ্গারা ঘুরেঘুরে কাজ দেখতে লাগল। কেউ বসে পড়লে উঠিয়ে দিতে লাগল। বোঝাই গেল কাজের সময় বিশ্রাম পাওয়া যাবে না।
ওঙ্গার উচ্চকণ্ঠ শোনা গেল–এবার কয়েদঘরে চলো।
তখনই পার্তাদো বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। ওঙ্গারা ছুটে পার্তাদের কাছে গেল। পার্তাদো ওদের সঙ্গে কী কথাবার্তা বললেন। তারপর বাড়ির ভেতর চলে গেলেন। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকালেনও না। ক্ষেতের ধারে চেস্টনাট গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীরাও ফিরে এল।
দুপুরের মতো এবারও সবাই পরিশ্রান্ত। অনেকেইহাঁপাচ্ছে। কয়েকজন শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিসের হুঁশিয়ারিতে কেউ তক্ষুণি জল খেল না। একটু জিরিয়ে নিয়ে জল খাওয়া চলল।
বিকেলের খাবার দেওয়া হল। কলা আর আটার পিঠে। তাইফ্রান্সিসরা গোগ্রাসে গিলল।
কয়েদঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
হ্যারি শুয়ে পড়েছিল। হঠাৎ শুয়ে থেকেই হ্যারি হো হো করে হেসে উঠল। হ্যারি কখনও এরকম হাসে না। বন্ধুরা অবাক। ফ্রান্সিসের পাশেই হ্যারি শুয়ে পড়েছিল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে হ্যারির মুখের ওপর ঝুঁকে বলে উঠল
–হ্যারি কী হয়েছে? তোমার শরীর ভালো তো?
হ্যারি উঠে বসল–জানো তো আমি শরীরের দিক থেকে দুর্বল। খুবই পরিশ্রান্ত লাগছে।
-তুমি পরিশ্রম সহ্য করতে পারবে? ফ্রান্সিস বলল।
–এই পরিশ্রম আর কতদিন? হ্যারি হেসে বলল।
তার মানে? ফ্রান্সিস কথাটা শুনে বেশ অবাক হল।
ইঁদারা কি সমুদ্র না নদী? হ্যারি আবার হেসে বলল।
–আঁ? ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠল। গলা চড়িয়ে বলল–সাবাস হ্যারি–আমি এটা আগে ভাবতেই পারি নি। শুধু পরিশ্রম কষ্টের কথা ভেবেছি। এবার ফ্রান্সিস সকলের দিকে তাকিয়ে বলল–বেশ দ্রুত হাঁদারা থেকে জল তুলতে থাকো। তাড়াতাড়ি ইঁদারার জল শেষ কর। তাহলেই এই অমানুষিক খাটুনি থেকে মুক্তি।
এবার সবাই ব্যাপারটা বুঝতে পারল। বন্ধুরা ধ্বনি তুলল—হো হো হো। প্রহরীরা ছুটে এল। ভাবল বন্দীদের মধ্যে বোধহয় মারামারি লেগেছে। ফ্রান্সিসরা হাসতে লাগল। প্রহরীর বুঝল তেমন কিছু না। ওরা নিশ্চিন্ত মনে পাহারা দিতে লাগল।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর কোলা ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–তোমরা হো হো করছিলে। কী ব্যাপার?
আরে বাবা ইঁদারার জল তো অঢেল নয়। দিন কয়েকের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে। তখন আর জল উঠবে না। কাদামাটি উঠবে।
–তখন ঐ কাদামাটিই তুলতে বলবে। ফ্রান্সিস বলল কিন্তু সেটাই বা কতদিন? তারপর তো শুধুই মাটি।
তা ঠিক। আমরা এটা ভাবিনি। তাহলে তো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জল তুলে ফেলতে হয়। কোলা বলল।
–সে কথাই সবাইকে বলছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।
এটা করতেই হবে। কোলা বলল। তারপর বলল–এখানে আমাদের দেশের লোকও আছে।
ওঙ্গাই তো তোমাদের দেশের লোক। ফ্রান্সিস বলল।
–একবার ওদের বলে দেখবো? যদি ওরা আমাকে মুক্তি দিতে পারে। কোলা বলল।
–অসম্ভব। তোমার দেশের কেউ যদি তোমাকে পালাতে দেয় তাহলে সে পার্তাদোর চাবুক খেয়ে মরে যাবে। এসব বড় সাংঘাতিক জায়গা। কেউ একটু ওদিক করলে আর রক্ষা নেই। বেঘোরে মরতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
