একজন দেহরক্ষী ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। একটা ঘোড়ায় টানা গাড়িতে পার্তাদো ওদের পেছনে পেছনে চলল।
হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–ফ্রান্সিস, ডানদিকে তাকিয়ে দেখ–একটা কামারশালা। ফ্রান্সিস দেখল।
হ্যারি বলল–তার মানে এখানে বেশ কয়েকন জমিদার আছে। ক্রীতদাসদের বেড়ি পরানোর কাজ এখানে ভালোই চলে।
–হুঁ। ঠিকই বলেছো। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল।
তখনই কোলা ফ্রান্সিসদের পেছনে এসেদাঁড়াল। বলল–ভাই, তাহলে পালানো গেল না।
-তাই তো দেখছি। ফ্রান্সি একটু মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
–আর কি পালানো যাবে? কোলা বলল।
দেখা যাক। সময় আর সুযোগ বুঝে পালাতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
পারবে না। কোলা হাত নেড়ে বলল।
–দেখা যাক। ফ্রান্সিস আস্তে বলল।
পথ প্রদর্শক দেহরক্ষীটি একটা বিরাট বাড়ির প্রবেশপথের সামনে এসে দাঁড়াল। বেশ বড় একটা লোহার দরজা। একজন প্রহরী দরজায় পাহারা দিচ্ছে। ফ্রান্সিসদের দেখে ঘর ঘর শব্দেদরজা খুলে দিল। ফ্রান্সিসরা ঢুকল।
বাড়ি দেখে ফ্রান্সিস বেশ অবাক হল। কত বড় বাড়ি। পাথর আর কাঠে তৈরী। এসব অঞ্চলে এরকম বাড়ি দেখবে আশা করেনি। বোঝা গেল পাৰ্তাদো বেশ বর্ধিষ্ণু জমিদার।
ডানদিকে তাকিয়ে দেখল দূরে বিস্তৃত জমি। শূন্য। বোঝা গেল যা ফসল হয়েছিল তা কেটে ফেলা হয়েছে। নতুন করে চাষ শুরু হবে।
বাড়িতে ঢোকার দরজার সামনে এসে দেহরক্ষী দাঁড়াল। তখনই পাৰ্তাদের গাড়ি ঢুকল। পার্তাদো কোন কথা বললেন না। বাড়ির ভেতর ঢুকতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মারিয়াকে তার সঙ্গে যেতে ইঙ্গিত করলেন। মারিয়া দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–যাও। মারিয়া পার্তাদের পেছনে পেছেনে বাড়িতে ঢুকে গেল। ফ্রান্সিস স্ফস্তির শ্বাস ফেলল– যা হোক মারিয়া বাড়ির অন্দরমহলেই থাকবে।
দেহরক্ষীটি আবার হাঁটতে শুরু করল। ফ্রান্সিসরাও ওর পেছনে পেছনে চলল।
বাড়ির পেছনদিকে এল সবাই। একটা লোহার কাকদরজাওয়ালা ঘরের সামনে এল ওরা। দরজায় তালা ঝুলছে। দরজার কাছে দুজন সশস্ত্র প্রহরী দাঁড়িয়েছিল। একজন দরজা খুলে দিল। রক্ষীটি ইঙ্গিতে ফ্রান্সিসদের ঘরে ঢুকতে বলল।
ফ্রান্সিসরা ঘরটায় ঢুকল। বেশ বড় পাথরের ঘর। এই দিনের বেলাতেও কেমন অন্ধকার অন্ধকার। অনেক ওপরে দু’দিকে দুটো ফোকর। জানালার মতো। সারা ঘরের মেঝেয় শুকনো ঘাস আর পাতায় তৈরি দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা বিছানার মতো। এককোণে দু’জন কৃষ্ণকায় যুবক বসে আছে। ওরাও ক্রীতদাস।
ঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস বসল। হ্যারি পাশে এসে বসল। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–হ্যারি শরীর ভালো আছে তো?
–আমার তো জানোই। খুব পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছি। এতটা পথ পায়ের বেড়ি টানতে টানতে আসা। ক্রীতদাস হব কোনদিন ভাবিনি।
–অবস্থা বিপাকে সবই হতে হয়। ফ্রান্সিস বলল–এই নিয়ে দুঃখ কোরো না। দেখি না কী করা যায়।
পরদিন ফ্রান্সিসরা সবে সকালের খাবার খেয়েছে দুজন কৃষ্ণকায় ক্রীতদাস দরজায় এসে দাঁড়াল। কয়েদঘরের দরজা খোলা হল।
কৃষ্ণকায়দের একজন এগিয়ে এল। বলল–তোমাদের কয়েকটা কথা বলার আছে– মানে কাজের কথা। তার আগে আমার নাম বলে রাখি। আমার নাম ওঙ্গা। তোমাদের মাতব্বর কে?
মাতব্বর কথাটা শুনে ফ্রান্সিসদের রাগ হল। ও প্রথমে কথা বলতে চাইল না। তারপর ভেবে দেখল এখন রাগারাগি করাটা বুদ্ধিমানের কাজ না। ও উঠে দাঁড়াল। বলল–
–আমি ফ্রান্সিস।
–ঠিক আছে। শোন–ওঙ্গা বলতে লাগল–এখানে গত চারমাস এক ফোঁটা বৃষ্টি হয়নি অথচ এটাই বৃষ্টি হওয়ার ঠিক সময়। এখানে মুষলধারেই বৃষ্টি হয়। কিন্তু বৃষ্টি হওয়ার নাম নেই। তাই কর্তাসাহেবের নির্দেশ এই ঘরের পেছনে যে ইঁদারা আছে সেখান থেকে জল নিয়ে ক্ষেতে জল ছিটোতে হবে।
ক্ষেতে জল ছিটিয়ে চাষ হয়? হ্যারি বলল।
–সেটা কর্তাসাহেব বুঝবেন। ক্রীতদাসদের কর্তারা ক্রীতদাসদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ায় না। যতটাকাজ তাদের কাছ থেকে পাওয়া সম্ভব তা আদায় করে নেয়। তোমাদের যা বলা হচ্ছে তাই করতে হবে। রাজি না হলে সবাইকে চাবুক খেতে হবে। ওঙ্গা বলল।
–চাবুক? কর্তাসাহেব চাবুক মারবে? শাঙ্কো বেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল। ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল–পার্তাদো চাবুক মারেন?
–হ্যাঁ। দরকার পড়লে। কর্তাসাহেবদের চেহারা সর্বত্রই এক। ওঙ্গা বলল।
–ঠিক। আমি ব্যতিক্রম আশা করেছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–তবু তো চাবুক। কোথাও কোথাও হাত পা ভেঙে দিয়ে রাস্তায় বের করে দেওয়া হয়। ভিখারির জীবন কাটাতে হয় সেইসব ক্রীতদাসদের।
–এটা হতে পারে। ফ্রান্সিস বলল।
যাক গে–যেজন্যে এলাম। আমরা সব দেখিয়ে দিচ্ছি–তোমরা সেইভাবেই কাজে লাগো। ওঙ্গা বলল। তারপর হাত নেড়ে বলল–
এবার সবাই বেরিয়ে এসো।
ফ্রান্সিসরা বেরিয়ে এল। পুরনো বন্দী দুই কৃষ্ণকায়ও এল। কারো রেহাই নেই।
ফ্রান্সিসদের ঘরের পেছনে নিয়ে যাওয়া হল। একটা মস্তবড় ইঁদারা। তার ধারে ধারে আট দশটা বড় বড় কাঠের বালতি রাখা। ওঙ্গা বলল–এই বালতিগুলোয় জল ভরে ভরে ক্ষেতে ছিটোতে হবে। ক্ষেত জলে ভেজাতে হবে।
–অত বড় ক্ষেত–এ তো অনেকদিন লাগবে। শাঙ্কো বলল।
যতদিন লাগে লাগুক। তবে তোমাদের ভাগ্যি যদি ভালো হয় তবে হয়তো ততদিনে বৃষ্টি শুরু হবে। তাহলেই ক্ষেত ভেজানোর কাজ তখন বন্ধ হবে। ওঙ্গা বলল।
