কাঠের দেয়ালে একটা ঝকঝকে আয়না আটকানো। আয়নার চারপাশের কারুকাজ দেখার মতো। তার সামনের তাকে দাড়ি কামাবার ক্ষুর। দাড়ি কামাবার সাবান রাখার একটা রুপোর বাটি। সুন্দর একটা তোয়ালে ঝুলছে। উল্টেদিকের দেয়ালে একটা তৈলচিত্র। স্টিল লাইফ ছবি। একটা আপেল, ভাঙা বেদানা, কলা একটা ফুল, জ্বলন্ত মোমবাতি। মোমবাতির আলো একপাশ থেকে পড়েছে। বড় সুন্দর ছবি। একটা ছোট্ট টেবিল। তার ওপর কয়েকটা বাঁধানো বই। তাহলে পার্তাদের পড়াশুনোর অভ্যেস আছে। এরকম মানুষ খারাপ হতে পারে না।
পার্তাদো বলল–সবাই দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াও।
ঝড়ের প্রথম ধাক্কায় জাহাজটা জোরে লাফিয়ে উঠল। ফ্রান্সিসরা প্রায় ছিটকে পড়ল। শুরু হল প্রচণ্ড দুলুনি। ফ্রান্সিসদের অনেক সময়ও জাহাজে কাটে। ঝড় জল বৃষ্টির ধাক্কা। ওরা ভালোই সামলাতে পারে।
প্রায় কুড়ি পঁচিশ মিনিট ঝড়-বৃষ্টি চলল। জাহাজে ক্যাচকোঁচ শব্দ উঠল।
পার্তাদো চুপ করে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আয়না ছবি দেয়ালে শক্ত করে গাঁথা। ওগুলো নড়তে লাগল কিন্তু ছিটকে পড়ল না।
ফ্রান্সিস ভাবছিল একাশাঙ্কো ঝড়ের মোকাবিলা করতে পারছে কিনা। দেহরক্ষীরা তো আর নাবিক না। সমুদ্রের ঝড়ে জাহাজ সামলে নিয়ে যাওয়া ওরা জানে না। শাঙ্কোকে একাই সব সামলাতে হয়েছে। মারিয়াও একা। তবে ঝড়বৃষ্টিতে জাহাজে থাকা ওর অভ্যাস হয়ে গেছে।
বৃষ্টি থেমে গেল। ঝোড়ো বাতাসের বেগও কমে গেল। মেঘ কেটে গেল। সূর্য দেখা গেল। বিকেল হল। সূর্য অস্ত গেল। সমুদ্র অনেকটা শান্ত হল। জাহাজ দুটো চলল। ফ্রান্সিসদের জাহাজ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। শাঙ্কো একাই বোধহয় পালটাল ঠিককরছিল। জাহাজের গতি বাড়িয়েছিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিসদের জাহাজ পার্তাদোর জাহাজের কাছে চলে এল।
পরের দিন কয়েক ধরে সমুদ্র শান্তই রইল। পার্তদোর নির্দেশে জাহাজের গতি বাড়ানো হল। উন্মুক্ত ডেক-এ ফ্রান্সিদের দিনরাত কাটতে লাগল। একঘেয়ে জীবন। উপায় নেই। মেনে নিতেই হচ্ছে।
তিন-চারদিন পর একদিন সকালে পার্তাদো ডেক-এ উঠে এলেন। ফ্রান্সিসদের কাছে এলেন। বললেন–সামনেই এনকোবার বন্দর। আমরা ওখানেই নামবো।
দূর থেকে এনকোবার বন্দর দেখা গেল। যতদূর দেখা যাচ্ছে তাতে বোঝা গেল খুব বড় বন্দর নয়।
আস্তে আস্তে দুটো জাহাজ এনকোবার বন্দরের জাহাজঘাটায় এসে থামল। নোঙর ফেলা হল। পাটাতন পাতা হল।
নিজেদের জাহাজ থেকে শাঙ্কো আর মারিয়া নেমে এল। পার্তাদের ছোট জাহাজে এল। দেখল ফ্রান্সিসরা ডেক-এ শুয়েবসে আছে। ফ্রান্সিসকে দেখে মারিয়া চমকাল। ফ্রান্সিসের চেহারা বেশ খারাপ হয়ে গেছে। ও তাড়াতাড়ি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল– তোমার শরীর ভালো আছে তো? ফ্রান্সিস হেসে বলল–আমার জন্যে ভেবো না।
-তোমার শরীর বেশ খারাপ হয়ে গেছে। মারিয়া বলল।
বন্ধুদের দেখ! ওদেরও আমার মতো অবস্থা। দিনরাত ডেক-এ পড়ে থাকা। বেঁচে আছি এটাই যথেষ্ট। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল।
তুমি কক্ষনো মৃত্যুর কথা বলবে না। অভিমানী স্বরে মারিয়া বলল।
–আমরা কি মৃত্যুকে এড়াতে পারবো? ফ্রান্সিস আগের মতোই হেসে বলল।
–সেসব বুঝি না। তুমি এভাবে কখনও বলবে না। মারিয়া মাথা নেড়ে বলল।
পার্তাদো ডেক-এ উঠে এলেন। বললেন–তোমরা এখানে নামো। আমার দেহরক্ষীরা তোমাদের পাহারা দিয়ে আমার বাড়িতে নিয়ে যাবে।
ফ্রান্সিসরা আস্তে আস্তে জাহাজ থেকে নামতে লাগল। পায়ে বেড়ি। শব্দ হচ্ছে। হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছে। তবু যেতে হবে। নতুন আস্তানা। কেমন হবে কে জানে। তবে ক্রীতদাসদের আস্তানা। সে কি কখনও ভালো হয়।
নীচে নেমে ফ্রান্সিস পার্তাদোর কাছে গেল। বলল–আপনার জাহাজের জন্য তো পাহারাদার থাকবে।
নিশ্চয়ই। পাহারাদার থাকবে জাহাজচালক। পার্তাদো বললেন।
–তাহলে একটা অনুরোধ। সে যেন আমাদের জাহাজটাও পাহারা দেয়। আমাদের কেউ তো থাকতে পারবে না। ফ্রান্সিস বলল।
না। তোমাদের কাউকে ছাড়া হবে না। পার্তাদো বললেন।
তাহলে আপনার জাহাজ চালক যেন আমাদের জাহাজটারও দেখাশুনা করে। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। বলে দিচ্ছি। পার্তাদো বললেন। তারপর ইশারায় জাহাজ চালককে ডাকলেন। জাহাজচালক ওর কাছে এল। পার্তাদো বললেন–শোনো। আমাদের জাহাজটার যেমন দেখাশুনো করবে তেমনি এদের জাহাজটারও দেখাশুনা করো। দেখো দুটো জাহাজই যেন চুরি না হয়ে যায়। তারপর বললেন
–তোমাদের জাহাজটার জন্যে আর মায়া বাড়াচ্ছো কেন? আর কোনদিন কি জাহাজটায় চড়তে পারবে?
–তবু আমাদের অনেক সুখদুঃখের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঐ জাহাজটা। ওটা চুরি হয়ে যাক এটা চাইনা।
–বেশ। তোমরা চাইছো তাই পাহারার ব্যবস্থা করে দিলাম। এবার চলো সব। পার্তাদো হাত নেড়ে বললেন। দেহরক্ষীরা ততক্ষণে ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়িয়েছে। হাতে খোলা তরোয়াল। খুব বড় বন্দর নয় এই এনকোবার বন্দর। ছোট বন্দরই বলা যায়। আরো দুটো জাহাজ নোঙর করে আছে দেখা গেল।
ফ্রান্সিসরা বাঁচল যে রোদের তেমন তেজ নেই। বেশ হাওয়া ছেড়েছে। কষ্ট একটু কমল।
ফ্রান্সিস চারদিকে দেখতে দেখতে যাচ্ছিল। দুপাশে দোকানপাট। লোকজনেরও ভিড় আছে। লোকেরা ফ্রান্সিসদের দেখল। তবে খুব একটা অবাক হল না। ক্রীতদাস দেখায় তারা অভ্যস্ত। তবে কৃষ্ণকায় যুবক-যুবতীদেরই ওরা দেখে থাকে। আজকে দেখল বিদেশি ইউরোপীয় যুবক ও মারিয়াকে। তাই একটু অবাকই হল।
