–বেশ। তাই হবে। তবে পালাবার চেষ্টা করবে না। পার্তাদো বলল।
–আপনার দেহরক্ষীরা তো থাকবে। মারিয়া বলল।
–ওরা তো রাত জেগে তোমাকে পাহারা দিতে পারবে না। পার্তাদো বললেন।
–আমি আমার স্বামী-বন্ধুদের ফেলে একা পালাতে যাবো কেন? মারিয়া বলল।
—ঠিক আছে। তুমি ঐ জাহাজেই থাকবে। পার্তাদো বলল। ফ্রান্সিস বলে উঠল–কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাবো বুঝতে পারছি না।
–ধন্যবাদের কিছু নেই। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করতে হয়। পার্তাদো বলল।
–আপনি জাহাজ কবে ছাড়ছেন? ফ্রান্সিস প্রশ্ন করল।
–আমার সব কাজ মিটে গেছে। কাল সকালেই জাহাজ ছাড়বো। পার্তাদো বললেন।
পার্তাদো জাহাজ চালকের সঙ্গে কথা বলে চলে গেলেন।
ফ্রান্সিস ডেক-এ বসে রইল।
বিকেল হল। সূর্য তখন অস্ত যায় যায়। মারিয়া গিয়ে কাঠের রেলিং ধরে দাঁড়াল। মনে যত দুঃখ থাক মারিয়া সূর্যাস্ত দেখবেই।
সূর্য অস্ত গেল। গভীর কমলা রঙতখনও পশ্চিমের আকাশ জুড়ে। মারিয়া সেইদিকে তাকিয়ে রইল।
রাতের খাবারে মাংস দেওয়া হল না। ফ্রান্সিসরা অবশ্য সেটা আশাও করেনি। সামুদ্রিক মাছের ঝোলই খেতে হল। খাওয়ার সময় একজন রক্ষী এসে ফ্রান্সিসদের হাতের বাঁধন খুলে দিল। খাওয়া হলে আবার হাত বেঁধে দিয়ে গেল। দুপুরেও খাওয়া-দাওয়ার সময় এভাবেই ওদের হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে পরে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।
সেই রাতে মারিয়াকে আর তাদের জাহাজে পাঠানো হল না। মারিয়া ফ্রান্সিসদের সঙ্গে ডেক-এই ঘুমোলা। পরের দিন সকালে পার্তাদো জাহাজের ডেক-এ উঠে এল। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল
–তোমাদের জাহাজ যে চালাবে সে উঠে এসো। শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। পার্তাদোর কাছে গেল। পার্তাদো বলল–তোমাদের জাহাজে যাও। তোমাদের রাজকুমারীকে নিয়ে যাও। দুজন দেহরক্ষীও যাবে। হাত খোলা হবে শুধু খাওয়ার সময়। অন্য সময় বাঁধা থাকবে।
–বেশ। শাঙ্কো মাথা ঝুঁকিয়ে বলল–হাত বাঁধা নিয়ে আমি জাহাজ চালাবো।
মারিয়াকে নিয়ে শাঙ্কো পার্তাদের জাহাজ থেকে নেমে গেল। পেছনে দু’জন সশস্ত্র দেহরক্ষী। নিজেদের জাহাজের কাছে গিয়ে দেখল পাটাতন পাতা নেই। শাঙ্কো সমুদ্রের জলে নামল। সাঁতরে নিজেদের জাহাজের কাছে গেল। দড়ির মই বেয়ে জাহাজের ডেক-এ উঠল। কাঠের পাটাতন এনে পেতে দিল। মারিয়া আর দেহরক্ষীরা জাহাজে উঠে এল।
ভেজা জামাকাপড় নিয়েই শাঙ্কো পাল খুলে দিল। দড়িদড়া বাঁধন। মারিয়া নিজের কেবিনঘরে চলে গেল।
একটু বেলা হতেই পাৰ্তাদোর জাহাজ ছাড়ল। সেই জাহাজের পেছনে পেছনে শাঙ্কোও ওদের জাহাজ চালাল। দুহাত বাঁধা হুইল ঘোরাতে বেশ অসুবিধে হচ্ছে। কিন্তু শাঙ্কোর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ভালোভাবে জাহাজ চালাবেই। পায়ের বেড়িও কোন বাধা বলে মানবে না।
শান্ত সমুদ্র। বাতাসেরও তেমন বেগ নেই। দুটো জাহাজই দ্রুত চলল।
পার্তাদের জাহাজের ডেক-এই ফ্রান্সিসদের রাতদিন কাটতে লাগল।
পার্তাদোর জাহাজ একটা ছোট বন্দরে থামলো। পাটাতন ফেলা হল। পার্তাদোর রাঁধুনি নেমে গেল। ওদিকে শাঙ্কোও ওদের জাহাজ থামাল।
তখন বিকেল। মারিয়া জাহাজ থেকে নেমে ফ্রান্সিসদের জাহাজে এল। শাঙ্কোও এল। ফ্রান্সিস আর হ্যারির সঙ্গে কথাবার্তা বলল।
পার্তাদোর রাঁধুনি একগাদা ফুলফলের চারা নিয়ে এল। হয়তো পাৰ্তাদোর বাড়িতে বাগানটাগান আছে। গাছগুলো লাগানো হবে।
সূর্য অস্ত গেল। মারিয়া সূর্যাস্ত দেখে নিজেদের জাহাজে চলে গেল। শাঙ্কোও ফিরে গেল।
আবার জাহাজ দুটো চলল। সমুদ্র কিছুটা অশান্ত হলেও জাহাজ চালাতে অসুবিধে হচ্ছিলনা।
হ্যারি ফ্রান্সিসকে বলল
–একটা ব্যাপারে আমারা খুব ভাগ্যবান। ক্যাপ্টেন তেমেলো আমাদের জাহাজটা বিক্রি করে দিয়ে পালায়নি।
–যা বলেছো। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
–কিন্তু পাৰ্তাদোর জমিদারিতে ক্রীতদাসের কাজ করতে করতে কি আমরা পালাতে পারবো? পায়ের এই বেড়ি নিয়ে?
–এখন কিছু বলতে পারছি না। আমাদের থাকার ব্যবস্থা, কাজের ব্যবস্থা সব দেখি তখন ভাববো।
হ্যারি একটু থেমে বলল–ফ্রান্সিস-আমার কি ভয় জানো? হয়তো দেশে আর ফেরা হবে না।
–হবে। মন দুর্বল করো না। আমরা মুক্তিও পাবো দেশেও ফিরবো। ফ্রান্সিস গলায় জোর দিয়ে বলল।
-তুমি আশাবাদী। আমি অতটা আশাবাদী হতে পারছি না। হ্যারি আস্তে আস্তে বলল।
আগে থেকেই হতাশ হয়ে পড়ছো কেন? দেখই না কি হয়। ফ্রান্সিস বলল।
–অগত্যা দেখা যাক। হ্যারি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
সেদিন দুপুরে আকাশ অন্ধকার করে গভীর কালো মেঘ জমল। ফ্রান্সিসরা বুঝলঝড় আসছে। আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। সেইসঙ্গে ঘন ঘন বাজ পরার গুরুগম্ভীরশব্দ।
পার্তাদোর রাঁধুনি ডেক-এ উঠে এল। বললঝড়বৃষ্টি আসছে। মালিক তোমাদের নিচে আসতে বলেছেন।
ফ্রান্সিসরা উঠে দাঁড়াল। তারপর একে একে নীচে নামল। দুটো কেবিনঘর। একটা বড়। একটা ছোট। বড়টা বোধহয় পার্তাদোর জন্যে। অন্যটা রক্ষী আর রাঁধুনির জন্য।
সেই ঘরেই ফ্রান্সিসরা ঢুকল। কিন্তু এত ছোট কেবিনঘর যে ফ্রান্সিসদের প্রায় জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকতে হল। পাশের কেবিনঘর থেকে পার্তাদো বলল–তোমরা কয়েকজন এইঘরে আসতে পারো।
ফ্রান্সিসরা কয়েকজন পার্তাদোর কেবিনঘরে গেল। ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। বোঝাই যাচ্ছে পার্তাদো খুব বিলাসী মানুষ। ঘরের সবকিছু সাজানো গোছানো। বিছানার চাদর ফুল আঁকা ধবধবে সাদা।
