এবার বেড়ি পরা অবস্থায় হাঁটতে গিয়ে লোহার ভারে ভালো করে হাঁটতেই পারছিলনা কেউ।
জাহাজঘাটায় এল সবাই। ফ্রান্সিস দেখল জলদস্যুদের জাহাজটা নেই। বুঝল ক্যাপ্টেন তেমেলো প্রচুর অর্থ নিয়ে বেপাত্তা হয়ে গেছে।
একপাশে নোঙর করা ছিল যে সুদৃশ্য ছোট জাহাজটা, সেটার কাছে এল সবাই। বেশ কষ্ট করে হেঁটে জাহাজটায় উঠল সবাই।
পার্তাদো বলল–শোন–কেবিনঘরে জায়গা নেই। আমাদের সবাইকে ডেক-এ থাকতে হবে। শুধু ঝড়বৃষ্টির সময় তোমাদের নীচে নামানো হবে।
ফ্রান্সিস পার্তাদোর দিকে এগিয়ে গেল। বলল–
একটা কথা ছিল।
বল। পার্তাদো বলল।
–এখানে আমাদের জাহাজ নোঙর করা আছে। জলদস্যুরা খুব ভাগ্যি যে আমাদের জাহাজটা নিয়ে পালিয়ে যায়নি। আমার অনুরোধ আমাদের জাহাজটা আপনি আপনার জাহাজের সঙ্গে বেঁধে নিয়ে চলুন।
–আমার ছোটজাহাজ। তোমাদেরজাহাজকে টেনে নিয়ে যেতেপারবে? পার্তাদো বললেন।
–তাহলে আমি কথা বলি। ফ্রান্সিস বলল।
–বলো। পার্তাদো বললেন।
আমাদের চারজনকে আমাদের জাহাজ চালাতে দিন। জাহাজটা আপনার জাহাজের পেছনে পেছনেই চালাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–না। তোমাদের হাতের বাঁধন খোলা হবে না। পার্তাদো বললেন।
–হাত বাঁধা অবস্থাতেই আমরা জাহাজ চালাবো। ফ্রান্সিস বলল।
জলে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে যেতে পারো। পার্তাদো বললেন।
–আমাদের পায়ের বেড়ি যে কী ভারী আপনার তা ধারণাই নেই। এই লোহার বেড়ি পায়ে সাঁতরানো অসম্ভব। জলে নামলেই আমরা জলে তলিয়ে যাবো। হাঙরের মুখে পড়বো আমরা। কেউ বাঁচবো না। জীবনের ভয় তো আমাদের আছে। ফ্রান্সিস বলল।
পার্তাদো কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন–ঠিক আছে। কিন্তু সবাই তোমাদের জাহাজে থাকবে না। মাত্র একজন–যে তোমাদের জাহাজ চালাবে।
–বেশ। তাই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–একটা কথা। পার্তাদো বলল।
–বলুন। ফ্রান্সিস বলল।
–এই জাহাজে তোমরা ডেক-এ থাকবে। ঝড়-বৃষ্টির সময় শুধুনীচে নামবে। ঝড়বৃষ্টি থেমে গেলে আবার ডেক-এ চলে আসবে। পার্তাদো বলল।
-ঠিক আছে। আমরা রাজি। হ্যারি বলল।
–আমাদের খুব খিদে পেয়েছে। খেতে দিন। শাঙ্কো বলল।
পাঁচসাতজন যুবকই আমি কিনবো ভেবেছিলাম। তাই তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা জাহাজে আগেই করে রেখেছি। একটু পরেই খাবার দেওয়া হচ্ছে। পার্তাদো বললেন।
পার্তাদো সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেলেন।
ফ্রান্সিসরা ডেক-এ বসে পড়ল। পা নাড়াতে কষ্ট হচ্ছে। লোহার বেড়ি পায়ে পায়ে লেগে শব্দ তুলছে।
ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। চোখ বুজল। হ্যারি ডাকল–ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস চোখ বন্ধ রেখেই মুখে শব্দ করল–হু।
রাজকুমারী কোথায় থাকবেন? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
–মারিয়াকেও আমাদের জাহাজে রাখবো। ফ্রান্সিস বলল।
–সেটা তো বললে না। হ্যারি বলল।
–একসঙ্গে সব চাওয়া না। মনে তো হচ্ছে পার্তাদো ভদ্রলোক। আপত্তি করবে না। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া তখনই ফ্রান্সিসের কাছে এসে বসল। বলল–শেষ পর্যন্ত ক্রীতদাস হতে হল।
–উপায় কি। অবস্থার বিপাকে সবই মেনে নিতে হয়। তবে সময় সুযোগ বুঝে ঠিক পালাবো। ফ্রান্সিস বলল।
ক্রীতদাসের জীবন। শরীরের শক্তি অর্ধেক হয়ে যাবে। তখন পারবে পালাতে? মারিয়া বলল।
–অবশ্যই পারবো। মনের জোরটাই বড় কথা। মনে জোর থাকলে অথবঅবস্থায়ও পালানো যায়। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখা যাক। কিন্তু আমিও কি এই ডেক-এই থাকবো? মারিয়া বলল।
না। তোমাকে আমাদের জাহাজে রাখার জন্যে অনুরোধ করবো। পার্তাদো নিশ্চয়ই রাজি হবে। ফ্রান্সিস বলল।
দেখ বলে। মারিয়া মাথা নেড়ে বলল।
এবার ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকাল। বলল–অনেক করে বলে পার্তাদোকে রাজি করিয়েছি। ফ্লেজার নেই। তুমি জাহাজ চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবে?
–নিশ্চয়ই পারবো। তুমি ঠিক জানোনা ফ্লেজার কিআর সবসময় হুইলে থাকতো? ওর জায়গায় আমিও অনেকদিন জাহাজ চালিয়েছি। কাজেই আমি ঠিক জাহাজ চালিয়ে যেতে পারবো। শাঙ্কো বলল।
দু’হাত কিন্তু বাঁধা থাকবে। ফ্রান্সিস বলল।
–তা নিয়েও পারবো। আমার জামার নীচে ছোরা আছে। হাতের বাঁধন কেটে ফেলবো। শাঙ্কো বলল।
–পারবেনা। পার্তাদোর দেহরক্ষীরা জাহাজে থাকবে।
-হ্যাঁ। এটা ভুলে গিয়েছিলাম। ঠিক আছে হাত বাঁধা অবস্থাতেই জাহাজ চালাবো। শাঙ্কো গলায় জোর দিয়ে বলল।
ওরা কথাবার্তা বলছে তখনই সকলের জন্যে খাবার নিয়ে রাঁধুনি এল। চিনেমাটির বাসনে ওদের খেতে দেওয়া হল। সবাইক্ষু ধার্ত। প্রথমে সুপ দেওয়া হল। চেটে খেয়ে ফেলল সবাই। তারপর সবজি তরকারি। কী সুস্বাদু! সবাই সাগ্রহে খেতে লাগল। তারপর দেওয়া হল মাংস রুটি। এত সুস্বাদু খাবার কতদিন খায়নি। সবাই চেটেপুটে খেতে লাগল। বারবার মাংসের ঝোল চাইতে লাগল। রাঁধুনিও দিতে লাগল। তারপর রাঁধুনি হেসে বলল–আর নেই। শুধু আমাদের মালিকআর রক্ষীদের আর জাহাজ চালকের খাবার রয়েছে।
-কিন্তু তুমি? হ্যারি জানতে চাইল।
–আমি অল্প খাবো। তোমরা এরকম রাক্ষসের মতো খাবে তাতো জানতাম না। রাঁধুনি হেসে বলল।
তুমি বুঝবে না ভাই। কতদিন পরে যে এরকম সুস্বাদু খাবার খেলাম তা মনেও করতে পারছি না। হ্যারি হেসে বলল।
–জাহাজ কখন ছাড়া হবে? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–মালিক জানে। রাঁধুনি বলল।
তখনই পার্তাদো ডেক-এ উঠে এলেন। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। পার্তাদোর কাছে গেল। বিনীতভাবে বলল–আপনি আমাদের সব অনুরোধই রেখেছেন। এটাই আমার শেষ অনুরোধ। মারিয়াকে দেখিয়ে বলল–আমার স্ত্রীকে আমাদের জাহাজে তার কেবিনঘরে থাকতে দিন। এই ডেক-এর ওপর তার পক্ষে থাকা সম্ভব নয়। পার্তাদো মারিয়ার দিকে তাকাল। ভাবতে লাগল। মারিয়া মৃদুস্বরে বলল বলল–আপনি দয়া করে এই অনুরোধ রাখুন।
