রোদ চড়া। ভ্যাপসা গরম। ফ্রান্সিসরা ঘামতে লাগল।
বন্দরের কাছেই একটা মাঠমত। তার মাঝখানে একটা পাথরের বেদীমতো। যাদের বিক্রি করা হবে তাদের সেই বেদীতে তোলা হচ্ছিল। তিন-চারজন কালো পোশাক পরা লোক এই কাজ করছিল। তারা দুজন কৃষ্ণকায় যুবককে বেদীতে তুলল। বেদী ঘিরে বহু লোকের ভিড়। খরিদ্দাররা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেই যুবকদের দেখছিল। নিলামের মতো দর হাঁকা শুরু হল। কালো পোশাকপরা লোকেরা যুবকদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল।
দুজন যুবক বিক্রি হয়ে গেল। যে কিনল সে তাদের নিয়ে চলে গেল।
এবার ফ্রান্সিসদের বেদীতে ওঠার পালা। কালো পোশাকপরা লোকেরা এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল আমাদের একসঙ্গে বেদীতে তোল। যাতে একজন খরিদ্দারআমাদের কেনে।
-বেশ। তোমাদের একসঙ্গেই তুলছি। তবে একজন খরিদ্দারই কিনবে এটা নাও হতে পারে। একজন কালো পোশাক পরা তোক বলল।
–ঠিক আছে। তুমি তোল তো। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসদের বেদীর ওপর তোলা হল। ফ্রান্সিস একবার চারদিকে তাকাল। অনেক লোকের ভিড়। সবাই ক্রেতা নয়। কিন্তু ভিড় জমিয়েছে। দুঃখে ফ্রান্সিসের বুক ভেঙে যেতে লাগল। ও মন শান্ত করল। আমরা বিক্রি হতে চলেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্রীতদাস হতে চলেছি। ওপরের দিকে তাকাল। সূর্যকরোজ্জ্বল আকাশ। সামুদ্রিক পাখি উড়ছে। তীক্ষ্ণসুরে ডাকছে। সবাই মুক্ত। সে সারাজীবনের জন্যে বন্দী হতে যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস দেখল ব্যাপ্টেন তেমেলো একপাশেদাঁড়িয়ে হাসছে। অনেকপাউণ্ড পাওয়া যাবে।
এবার কালো পোশাক পরা লোকটি ফ্রান্সিসদের দেখিয়ে গলা চড়িয়ে বলল–এরা চাইছে এদের কেউ একসঙ্গে কিনুন। বোধহয় সবাই বন্ধু।
দাম হাঁকা শুরু হল। ভিড়ে চারদিক থেকে ক্রেতারা দর হাঁকতে লাগল। সবচেয়ে বেশি দাম যে দিল তার দিকে ফ্রান্সিস তাকাল। মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোক। মাথার চুল গোঁফ সোনালি রঙের। পরনের পোশাক বেশ দামী।
ভদ্রলোক বেদীর দিকে এগিয়ে এলেন। কালো পোশাকপরা লোকটি এগিয়ে ফ্রান্সিসদের দেখিয়ে বলল–এই আটজন আপনার ক্রীতদাস। ভদ্রলোকের সঙ্গে চার পাঁচজন সশস্ত্র দেহরক্ষী। দেহরক্ষীরা ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল।
তখনই রাজকুমারী মারিয়কে বেদীতে তোলা হল। ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। , এরকম সুন্দরী মেয়ে ক্রীতদাসী হবে?
ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্রেতা ভদ্রলোকের দুহাত জড়িয়ে ধরল। বলল–আমরা তো আপনার ক্রীতদাস হলাম। যে ভদ্রমহিলাকে বিক্রির জন্য তোলা হল তিনি আমাদের দেশের রাজকুমারী। আমার স্ত্রী। আমার একান্ত অনুরোধ এই রাজকুমারীকে আপনি কিনুন। তাহলে উনি আমাদের কাছাকাছি থাকতে পারবেন। বলতে বলতে ফ্রান্সিসদের চোখে জল এল। ভদ্রলোক ফ্রান্সিসদের মানসিক আবেগ বুঝতে পারলেন। একটু চুপ করে থেকে বললেন–অনেক দাম উঠছে যে।
–আপনি পারবেন কিনতে। দোহাই আমার এই বিনীত অনুরোধটা রাখুন।
–দেখছি। ততক্ষণে মারিয়ার জন্য বেশ দাম উঠেছে। ভদ্রলোক বেশি দাম হাঁকলেন। দামাদামি চলল কিছুক্ষণ। সবশেষে ঐ ভদ্রলোকই বেশি দাম হেঁকে মারিয়াকে কিনলেন।
আনন্দে ফ্রান্সিস প্রায় কেঁদে ফেলল। হ্যারি ফ্রান্সিসের কাঁধে হাত রাখল। চোখ মুছে বলল–ঈশ্বর করুণাময়। আমার পরিকল্পনা সার্থক হল।
কালো পোশাকপরা লোকেরা আরো লোক বেদীতে তুলতে লাগল। একজন কালো পোশাকপরা লোকমারিয়াকে ভদ্রলোকের কাছে নিয়ে এল। মারিয়া ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ফ্রান্সিসের মন দমে গেল। হ্যারি ফ্রান্সিসদের কাধ চাপ দিয়ে বলল–আবেগপ্রাপ্ত হয়ে না। তাহলে রাজকুমারী আরো দুর্বল হয়ে পড়বেন। শান্ত হও। ফ্রান্সিস তখন আবেগে কাঁপছে। ক্রেতা ভদ্রলোক এটা লক্ষ্য করলেন। মৃদুস্বরে বললেন–তোমার স্ত্রীর যাতে বেশী কষ্ট না হয়, সেদিকটা আমি দেখবো। ভদ্রলোকের দুহাত ঝাঁকুনি দিয়ে ফ্রান্সিস ছেড়ে দিল। ভদ্রলোক বললেন–তোমার নাম কী?
–ফ্রান্সিস।
–আমার নাম পার্তাদো। আমার অনেক জমি-জিরেত আছে। সেখানে কাজ করার জন্যেই তোমাদের নিয়ে যাচ্ছি।
তাহলে আপনি বড় জমিদার।
–হুঁ, তোমরা চাষের কাজ জানো?
–না।
–তাহলে শিখে নেবে। তোমাদের কিন্তু বন্দী হয়ে থাকতে হবে। আমি কাজ চাই। সেটা ভালোভাবে পেলেই আমি সন্তুষ্ট। এবার চলো। পালাবার চেষ্টা করো না। আমার দেহরক্ষীরা রয়েছে। পালাতে গেলে মরবে। চলো। তোমাদের পায়ে লোহার বেড়ি পরাতে হবে। ভদ্রলোক বললেন।
–বেড়ি না পরালে চলে না? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–না। বেড়ি পড়াতেই হবে।
পার্তাদো হাঁটতে লাগল। ফ্রান্সিসরা পিছু পিছু চলল। সঙ্গে দেহরক্ষীরাও চলল।
কিছু দূর যাওয়ার পর বাঁ পাশে একটা কামারশালা দেখা গেল। ফ্রান্সিসদের কামারশালায় ঢোকানো। হল। ফ্রান্সিসরা দেখল আগে যেসব যুবকদের ক্রেতারা কিনেছে তাদেরও সেখানে আনা হয়েছে। তাদেরপায়ে লোহার বেড়িপরানো হচ্ছে। ফ্রান্সিস বুঝল পায়ে বেড়ি পরানো হবেই।
আগের যুবকদের বেড়ি পরানো শেষ হল। এবার ফ্রান্সিসদের পালা।
কামাররা কয়েকজন ফ্রান্সিসদের পায়ে লোহার বেড়ি পরাতে লাগল। গায়ে তপ্ত লোহার– আঁচ লাগছে। কিন্তু ফ্রান্সিসদের তা সহ্য করতে হল। উপায় নেই। তবে সান্ত্বনা এটুকু পেল যে কথাবার্তায় বুঝল পার্তাদো মানুষটা খারাপ নয়। হয়তো ওদের ওপর অত্যাচারটা কমই হবে। কিন্তু তবুক্রীতদাসের জীবন। ফ্রান্সিস খুশি হল দেখে যে মারিয়াকে বেড়ি পরানো হল না।
