কিছু শাঙ্কোর কোমরবন্ধনীতে আর বাকি সবটাই আমার কেবিনঘরের কাঠের ফাঁকে। ফ্রান্সিস বলল।
–রাজকুমারী জানেন? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
–হ্যাঁ। ওই রেখেছে। ফ্রান্সিস বলল।
–যদি তেমেলো আমাদের জাহাজটা বিক্রি করতে চায় তাহলে আমরাই কিছু সোনার চাকতি দিয়ে জাহাজটা কিনে নেবো। হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস একটু ভেবে বলল–ঠিক বলেছো। ক্যাপ্টেন তেমেলোঅর্থপিশাচ। ও সোনার চাকতি পেলে সহজেই রাজি হয়ে যাবে।
এছাড়া তো অন্য কোন উপায় দেখছি না। আমাদের জাহাজটা হাতছাড়া করা চলবে না। হ্যারি বলল।
প্রায় এক মাস পরে তেমেলো আর ফ্রান্সিসদের জাহাজ একদিন সকালে একটা বন্দরে ভিড়ল।
ফ্রান্সিসরা বুঝল যে জাহাজ কোনো বন্দরে ভিড়ল। জাহাজ চলাচলের খুঁটিনাটি ফ্রান্সিসরা সহজেই বুঝতে পারে।
শাঙ্কো একজন প্রহরীর কাছে গেল। বলল
–জাহাজদুটো কোন্ বন্দরে ভিড়েছে?
–এই বন্দরের নাম তো শোননি।
–না শুনিনি।
আমারগো বন্দর। ক্রীদাস বেচাকেনার বাজার হিসেবে আমারগো বিখ্যাত। প্রহরটি বলল।
বিখ্যাত নয়, কুখ্যাত। হ্যারি বলল।
–সে তোমরা যা বল। প্রহরীটি বলল।
–তাহলে এখানেই আমাদের বিক্রি করা হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। ক্যাপ্টেন তাই এই বন্দরে জাহাজ ভিড়িয়েছে।
বাঃ সুন্দর পরিকল্পনা। হ্যারি ঠাট্টা করে বলল।
–আমাদের ক্যাপ্টেন খুব বুদ্ধিমান। খুব ভেবেচিন্তে কাজ করে। প্রহরীটি বলল।
–মহাপুরুষ। হ্যারি আবার ঠাট্টা করল।
–ঠাট্টা করছো? প্রহরীটি বলল।
–তুমি ঠাট্টা বোঝো? হ্যারি একটু হেসে বলল।
ঠাট্টা বুঝি বৈ কি। তুমি ক্যাপ্টেনকে ঠাট্টা করে মহাপুরুষ বলেছো এটা যদি আমি ক্যাপ্টেনকে বলি ক্যাপ্টেন তোমার মুণ্ডু নেবে। প্রহরীটি বলল।
না ভাই। এত তাড়াতাড়ি আমি মু দিতে রাজিনই। তোমাদের মনমেজাজ তো বুঝি না। কাজেই কথাটা আমি ফিরিয়ে নিলাম। বলতে হলে বলো যে আমরা ক্যাপ্টেনের প্রশংসাই করি। বীর বুদ্ধিমান তরোয়াল চালনায় দক্ষ–এসব। হ্যারি বলল।
–ঠিক আছে। তোমরা প্রশংসা করেছো এটাই বলবো। প্রহরীটি বলল।
–হ্যাঁ। সেটাই বলো। তাহলে দুবেলা মাংস খেতে পাবো। হ্যারি বলল।
সেদিন হাটবার নয়। কাজেই ফ্রান্সিসদের কয়েদঘর থেকে বের করা হল না।
রাতে পরিবেশকদু’জন খাবার নিয়ে এলো। শাঙ্কো জিজ্ঞেস করল–আমাদের ক্রীতদাস বিক্রির হাটে নিয়ে যাওয়া হল না কেন?
–কাল রোববার হাটবার? কালকে নিয়ে যাওয়া হবে। প্রহরীটি বলল। তারপর পরিবেশকটি বলল–আজকে অঢেল মাংসের ঝোল। তোমরা পেট পুরে মাংস খাও।
খুব ভালো কথা। শাঙ্কো বলল। ফ্রান্সিসরা খেতে লাগল। খিদেও পেয়েছিল। তার ওপর চাইতেই মাংসের ঝোল পাওয়া যাচ্ছে। সবাই পেটপুরেই খেল।
ফ্রান্সিসরা তখন শুয়ে পড়েছে। কোলা ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–তাহলে আমাদের বিক্রি করতে কালকে নিয়ে যাছে।
-হ্যাঁ। প্রহরী তাই বলল। ফ্রান্সিস বলল।
–আর পালানো হল না। কোলা বলল।
–তাই তো দেখছি। ফ্রান্সিস বলল।
আমাদের যাতে একজন খরিদ্দার কেনে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এটা ক্যাপ্টেন তেমেলোকে বলবে। কোলা বলল।
–তা কি হবে? হয়তো ভাগ ভাগ করে আমাদের বিক্রি করল। ফ্রান্সিস বলল।
–তবু চেষ্টা করতে হবে যাতে আমরা একসঙ্গে থাকি। কোলা বলল।
–দেখি বলে। ফ্রান্সিস বলল।
–এখন পালাতে পারলাম না। পরে মালিকের হাত থেকে পালাবার চেষ্টা করতে হবে। কোলা বলল।
–মালিক আমাদের নিয়ে কী করে সেটা আগে দেখি। তারপর সময় সুযোগমতো পালানো। ফ্রান্সিস বলল।
— কি পারবো? কোলা সংশয় প্রকাশ করল।
অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করবো। ফ্রান্সিস বলল।
–আমরা যাতে একই মালিকের হাতে যাই তার ব্যবস্থাটা আগে করতে হবে। কোলা বলল।
–দেখি কীভাবে সেটা করা যায়। ফ্রান্সিস বলল।
কোলা আর কিছু বলল না। ঘুমুতে চলে গেল।
পরের দিন সকালের খাওয়ার পরই তেমেলো কয়েদঘরের সামনে এল। হেসে বলল– তোমাদের ক্রীতদাস কেনাবেচার হাটে নিয়ে যাওয়া হবে। সাবধান কেউ পালাবার চেষ্টা করবে না। পালাতে গেলে মরতে হবে। ফ্রান্সিসরা কোন কথা বলল না।
–হাত বেঁধে নিয়ে চল। প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে ক্যাপ্টেন তেমেলো বলল।
দু’জন প্রহরী কয়েদঘরে ঢুকল। সকলের হাত বেঁধে দিল। কোলা ফ্রান্সিসের কাছে এল। মৃদুস্বরে বলল–শুনেছি মালিকরা ক্রীতদাসদের পায়ে লোহার বেড়ি পরিয়ে নিয়ে যায়।
লোহার বেড়ি? ফ্রান্সিস চমকে উঠল।
–হ্যাঁ এখানেই কামারশালা আছে। কামারদের কাজই হল ক্রীতদাসদের পায়ে লোহার বেড়ি পরানো। কোলা বলল।
ফ্রান্সিস চিন্তায় পড়ল। পায়ে লোহার বেড়ি পরালে তো পালাবার কোন আশাই নেই। সারা জীবনই ক্রীতদাস হয়ে থাকতে হবে।
কোলা বলল–তোমরা পাঁচজন আমরা তিনজন। মোট আটজন যাতে একই মালিকের হাতে পড়ি তার চেষ্টা করতে হবে।
–সব দেখিটেখি। তারপর। ফ্রান্সিস বলল।
ক্যাপ্টেন তেমেলো চলে গেল।
প্রহরীরা খোলা তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিসদের পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল ফ্রান্সিস পিছু ফিরে দেখল তেমেলোর জাহাজের মাথায় মড়ার হাড় ও মড়ার মাথা আঁকা পতাকা নামানো। সেখানে সাদা পতাকা উড়ছে। ফ্রান্সিস তখন মারিয়ার কথা ভাবছিল। যে করেই হোকমারিয়াকে সঙ্গে রাখতে হবে। যে খরিদ্দার ওদের কিনবে তাকে বলে ব্যবস্থা করতে হবে।
ফ্রান্সিসরা সারি বেঁধে জাহাজ থেকে পাতা পাটাতনের ওপর দিয়ে নামল। জাহাজঘাটায় বেশ কয়েকটি জাহাজ নোঙর করা। তার মধ্যে একটা ছোট সুদৃশ্য জাহাজও আছে।
