হঠাৎ ওরা লক্ষ্য করল জলদস্যুদের একটা জাহাজ ওদের জাহাজ লক্ষ্য করে দ্রুত আসছে। ওদের দুজন ছুটল সিঁড়িঘরের দিকে। কেবিনঘরের কাছে গিয়ে চিৎকার করতে লাগল–একটা জলদস্যুদের জাহাজ আমাদের আক্রমণ করতে আসছে। সবাই তরোয়াল নিয়ে এসো। সেই দু’জন ক্যাপ্টেন তেমেলোকেও গিয়ে বলল। তেমেলো তখন দিবানিদ্রায় ছিলো। ওদের চিৎকার চাঁচামেচিতে লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠল। ওরা জলদস্যুদের জাহাজ ওদের জাহাজ লক্ষ্য করে আসছে একথা বলল। ক্যাপ্টেন তেমেলো গলা চড়িয়ে বলল–লড়াই। সবাইকে ডেক-এ উঠে আসতে বলো।
–আমরা বলেছি। ওরা তৈরী হয়ে ওপরে উঠছে। সেই দুজন বলল।
ক্যাপ্টেন তেমেলো ডেক-এ উঠে এল। দেখল আক্রমণকারী জাহাজটা মাত্র কয়েকহাত দূরে। ঐ জাহাজের জলদস্যুরা খোলা তরোয়াল হাতে লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত। দুটো জাহাজ গায়ে গায়ে লাগান। আক্রমণকারীরা জাহাজের জলদস্যুরা লাফিয়ে তেমেলোর জাহাজে উঠে এল। শুরু হল লড়াই। তয়োয়ালে তরোয়ালে ঠোকাঠুকি চলল। চিৎকার আর্তনাদ গোঙানি শোনা যেতে লাগল।
ওদিকে ফ্রান্সিসরা প্রহরীদের ছুটোছুটি দেখে বুঝল কিছু একটা হয়েছে।
–হ্যারি–দেখো তোকী ব্যাপার। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি দরজার কাছে গেল। একজন প্রহরীকে জিজ্ঞেস করলকী ব্যাপার বলো তো?
–এক জলদস্যুদের জাহাজ আমাদের জাহাজ আক্রমণ করেছে। ডেক-এ লড়াই চলছে। একজন প্রহরী বলল।
লড়াইয়ে তোমরা হেরে গেলে কী হবে? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
–অসম্ভব। আমাদের বন্ধুরা দুর্ধর্ষ লড়িয়ে। তাদের হারানো যাবে না। লড়াই শেষ হোক দেখবে আমরা জয়ী হয়েছি। প্রহরীটি বলল।
–কিছুই বলা যায় না। উল্টোটাও হতে পারে। হ্যারি আস্তে বলল।
–হ্যাঁ। তোমরা তোআমাদের পরাজয়ই চাও। তাহলেই মুক্তি পাবে। ব্যাপারটা কিন্তু অত সহজ না। প্রহরীটি বলল। তোমরা কিন্তু মুক্তি পাবেনা। আমরা হেরে গেলে আমাদের জায়গায় ওরা তোমাদের বিক্রি করবে। তোমাদের মুক্তির কোন আশা নেই।
–তা তো বুঝতেই পারছি। তোমরা জলদস্যুরা সবাই এক চরিত্রের। ভালো মানুষ কখনও জলদস্যু হয় না। হ্যারি বলল।
কথা বাড়িও না। চুপচাপ বসে থাকো তো। প্রহরী বলল।
তা তো বটেই। হ্যারি বলল। তারপর ফ্রান্সিসদের কাছে এসে বসল।
–হ্যারি–সব শুনলাম। একটা আশার আলো দেখছি। ক্যাপ্টেন তেমেলো যদি হেরে যায় তাহলে নতুন জলদস্যুদের পাল্লায় পড়বো আমরা। এটা ঠিক হয়তো এরা আমাদের বিক্রি নাও করতে পারে। ফ্রান্সিস বলল।
–ফ্রান্সিস–আমার কিন্তু তা মনে হয় না। অর্থের লোভ বড় সাংঘাতিক। আমাদের বিক্রি করলে হাজার হাজার পাউণ্ড পাওয়া যাবে। সেই লোভে এরাও আমাদের বিক্রি করতে নিয়ে যাবে। সব জলদস্যুদের চরিত্রই এক। হ্যারি বলল।
–এটা ঠিক বলেছো। তবু আশা হয়তো নতুন জলদস্যুরা আমাদের মুক্তি দিতে পারে। ফ্রান্সিস বলল।
–সম্ভাবনা কম। হ্যারি বলল।
ডেক-এ তখন লড়াই প্রায় থেমে এসেছে। ক্যাপ্টেন তেমেলোর জলদস্যুরা জয়ের মুখে। তরোয়াল ঠোকাঠুকির শব্দ কমে এসেছে। চিৎকারও প্রায় থেমে এসেছে। এখন শুধু আর্তনাদ গোঙানি ও শ্বাস ফেলার শব্দ।
ক্যাপ্টেন তেমেলো জিতে গেল। আক্রমণকারী জলদস্যুরা নিজেদের জাহাজে উঠতে লাগল। ওদের ক্যাপ্টেন অসহায়ভাবে মাস্তুলে হাত রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
ওদের জাহাজ আস্তে আস্তে সরে যেতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই অনেকটা সরে গেল। তারপর আরো দূরে সরে যেতে লাগলো।
ক্যাপ্টেন তেমেলোর জলদস্যুরা তরোয়াল উঁচিয়ে হাত তুলে হৈ হৈ করতে লাগল লড়াই জেতার আনন্দে।
আক্রমণকারী জাহাজ অনেক দূরে চলে গেল। ক্যাপ্টেন তেমেলোর জলদস্যুরা আক্রমণকারী মৃত ও আহত জলদস্যুদের দুহাত দুপা ধরে ধরে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। সিঁড়িঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ক্যাপ্টেন তেমেলো মৃদু মৃদু হাসতে লাগল।
ওদিকে ফ্রান্সিসদের কয়েদঘরের সামনে এসেই প্রহরীটি চিৎকার করে বলতে লাগল– তোমরা তো ভেবেছিলে আমরা লড়াইয়ে হেরে যাবো। দেখ–আমরা জিতেছি। লড়াইয়ে আমাদের হারানো অত সোজা নয়।
শাঙ্কো গলা বাড়িয়ে বলল–অত চেঁচিও না। আমাদের তরোয়াল দাও। আমরাই তোমাদের হারিয়ে দেব। প্রহরীটি কেমন থতমত খেয়ে গেল। বলল–তোমরা ভাইকিং। ভালো লড়িয়ে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে পারবে না।
–সেই পরীক্ষাটা তো আর হবার উপায় নেই। তোমরা তো আর আমাদের তরোয়াল দেবে না। শাঙ্কো বলল।
–ঠিক আছে। তোমার কথাটা ক্যাপ্টেন তেমেলোকে আমি বলব। প্রহরী বলল।
–হ্যাঁ বলো। দেখ ক্যাপ্টেন তেমেলো কী বলে। শাঙ্কো বলল।
ক্যাপ্টেন তেমেলো আর ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে।
ফ্রান্সিসদের একঘেয়ে জীবন কাটতে লাগল। ওরা জানেনা কোন বন্দরে জাহাজ দুটো ভিড়বে।
একসময় ফ্রান্সিস ডাকল–হ্যারি।
–কিছু বলবে? হ্যারি বলল।
একটা সমস্যার কথা বলছি। যে বন্দরে তেমেলো জাহাজ ভেড়াবে সেখানে আমাদের জাহাজটাও যদি বিক্রি করে না দেয়? হ্যারি একটুক্ষণ ভাবল। বলল–কথাটা ভাববার। তেমেলো এটা করতে পারে।
তার আগে একটা ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু কীভাবে তেমেলোকে নিবৃত্ত করবো বুঝে উঠতে পারছি না। ফ্রান্সিস বলল।
উপায় একটা বের করতেই হবে–হ্যারি বলল–আচ্ছা ফ্রান্সিস–আমরা হিচকক দ্বীপের রাজার কাছ থেকে সোনার চাকতি নিয়েছিলাম। সেই সোনার চাকতিগুলো কোথায় আছে? হ্যারি জানতে চাইল।
