–আমরা পালাতে পারি। কোলা বলল।
–কীভাবে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
-যখন এরা খেতে দিতে আসে তখন লোহার দরজা খোলা থাকে। তখন খোলা দরজা দিয়ে পালালো। কোলা বলল।
দরজার দুপাশে খোলা তরোয়াল হাতে প্রহরী থাকে। সেটা লক্ষ্য করেছো। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল।
–ওদের কাবু করে? কোলা বলল।
–অসম্ভব। ওরা অভিজ্ঞ তরোয়াল যুদ্ধে। খালি হাতে ওদের কাবু করা যাবে না। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে তো আমাদের মুক্তির কোন আশাই নেই। কোলা বলল।
–না নেই। ফ্রান্সিস বলল।
কোলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। পরে বলল–তোমরা আমাদের চেয়ে অনেক বুদ্ধিমান। তবে তোমরা যদি লড়াই করে পালাতে চাও আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি।
না। লড়াই করে পালাবার কথা এখন ভাবছিনা। সেটা করতে গেলে বেশ কয়েকজন বন্ধুকে হারাতে হবে। আমি তা চাই না। ফ্রান্সিস বলল।
লড়তে গেলে বাঁচামরা তো আছেই। কোলা বলল।
–তা ঠিক। তবে জেনেশুনে কেন মরতে যাবো? ফ্রান্সিস একটু থেমে বলল–বেশ কয়েকজন বন্ধুকে রেজিল বন্দরে ফেলে এসেছি। জানি না ওরা বেঁচে আছে কি না। তারপর আমরা যে কয়েকজন মাত্র আছি এদের মধ্যেও আবার কয়েকজনকে হারালে আমাদের দুঃখের শেষ থাকবে না।
–তুমি বন্ধুদের খুব ভালোবাসো? কোলা জিজ্ঞেস করল।
–প্রাণের চেয়ে বেশি। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলতে লাগল–যখন অভিযানে বের হয়েছিলাম তখন বন্ধুদের বলেছিলাম তোমাদের রক্ষা করার জন্যে আমি প্রাণ দিতে প্রস্তুত। আজকে সব জেনেশুনে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিই কী করে?
–তাহলে ক্রীদাসের হাটেই আমরা বিক্রি হয়ে যাবো, এটাই আমাদের ভাগ্য। কোলা বলল।
তাই তো দেখছি। ফ্রান্সিস বলল।
কোলা উঠে দাঁড়াল। বলল–পালাবার ফন্দী আমিও আঁটছি। দেখি শেষ পর্যন্ত কী করতে পারি।
কোলা নিজের জায়গায় চলে গেল। ফ্রান্সিসের সঙ্গে যা কথাবার্তা হল বন্ধুদের বলতে লাগল।
শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস যে লোহার ডাটা দিয়ে খাবার দেবার আগে লোহার দরজায় শব্দ করে সেই ডাণ্ডাটা হাতের কাছেই থাকে। ওটা দিয়ে অন্তত দুটো প্রহরীর মাথা ফাটিয়ে দেওয়া যায়।
–শাঙ্কো ঐ পাগলামি করতে যেও না। যাই কর আমাকে না জানিয়ে কিছু করো না। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস, শেষ পর্যন্ত আমাদের ক্রীতদাসের জীবনই কাটাতে হবে। কেউ আমাদের বাঁচাতে পারবে না।
এবার আমারও তাই মনে হচ্ছে। এই জলদস্যুরা পশুর মতো। হিংস্র হ্যারি আর কোন কথা বলল না।
জলদস্যুদের জাহাজ চলল। পেছনে ফ্রান্সিসদের জাহাজ বাঁধা। সেই জাহাজের কেবিনঘরে রাজকুমারী মারিয়া দুশ্চিন্তায় দিন কাটায়। ফ্রান্সিসদের দুর্বিষহ কষ্টের কথা ভেবে মারিয়া মাঝে মাঝে কাঁদে।
হঠাই জাহাজ দুটো ঝড়ের মুখে পড়ল। জাহাজের সজোরে এপাশ-ওপাশ দুলুনিতে ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরের মেঝেয় এধার-ওধার গড়াতে লাগল। বিরাট বিরাট ঢেউয়ের ফাটলে জাহাজ পড়ছে উঠছে। সাংঘাতিক ঝাঁকুনিতে ফ্রান্সিসরা ছিটকে পড়ছে। বিদ্যুতের তীব্র আলো যেন আকাশ চিরে ফেলতে লাগল। সেইসঙ্গে গুরুগম্ভীর মেঘগর্জন আর প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া। বহুকষ্টে ফ্রান্সিসরা ঝড়ের দুলুনি সহ্য করতে লাগল।
ঝড় আধঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয়নি। তাতেই জলদস্যুদের প্রাণান্তকর অবস্থা। ঝড় থামলে দেখা গেল জলদস্যুরা ডেক-এর ওপর জড়াজড়ি করে পড়ে আছে। অসাড় নিস্পন্দ।
অল্পক্ষণের মধ্যেই জলদুস্যরা উঠে দাঁড়াতে লাগল। পালের মাস্তুলের হালের ছেঁড়া দড়িটড়ি বাঁধতে লাগল।
ততক্ষণে ফ্রান্সিসরা কেউ কেউ উঠে বসেছে। কেউ কেউ উঠে দাঁড়িয়েছে কেউ কেউ পায়চারি শুরু করেছে। ঝড়ের ধাক্কায় ফ্রান্সিসদের অবস্থা কাহিল।
জলদস্যুদের ক্যাপ্টেন তেমেলো একবার এসে ফ্রান্সিসদের অবস্থা দেখে গেল। হেসে বলে গেলঝড়ে এরকম অবস্থাই হয়। দু-একদিনের মধ্যেই শরীর ঠিক হয়ে যাবে। পেট পুরে খাও। শরীর ঠিক রাখো। ভালো দাম উঠবে। ফ্রান্সিসরা কেউ কিছু বলল না।
জলদস্যুদের ক্যাপ্টেন তেমেলোকে মারিয়া বলল–এই ঝড়জলে আমার স্বামী ও বন্ধুরা কেমন আছে আমি দেখতে যাবো।
–বেশ। যান। ক্যাপ্টেন তেমেলো আপত্তি করল না।
ফ্রান্সিস মারিয়াকে দেখে দরজার কাছে এগিয়ে এল।
–এই ঝড়জলে তোমাদের কোন কষ্ট হয়নি তো? মারিয়া জানতে চাইল।
ফ্রান্সিস হেসে বলল-ঝড় একেবারে দলাই মালাই করে দিয়ে গেছে। তবে মারাত্মক আহত হয়নি কেউ। কয়েকদিনের মধ্যেই শরীর ঠিক হয়ে যাবে। তোমার কিছুহয়নি তো?
–না না। আমি ভালো আছি। আমার চিন্তা তোমাদের জন্যে। মারিয়া বলল।
–আমাদের জন্যে ভেবো না। এখন চিন্তা এরপরে কী হবে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস মনে হয় এবার আমাদের কপালে অনেক দুঃখকষ্ট আছে। মারিয়া বলল।
–দেখা যাক। তুমি মন শক্ত রেখো। আমাদের জন্যে দুশ্চিন্তা করো না। ফ্রান্সিস বলল।
–আমি কি নিশ্চিন্ত থাকতে পারি। তবু তুমি বলছো চেষ্টা করবো বেশি চিন্তা না করতে। মারিয়া বলল।
–আমি সেটাই বলছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।
আকাশ নির্মেঘ। হাওয়ারও প্রচণ্ড বেগ। জলদস্যুদের জাহাজের আর ফ্রান্সিসদের জাহাজের পাল ফুলে উঠেছে। দুটো জাহাজই চলেছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে।
সেদিন দুপুরে। ফ্রান্সিসদের, জলদস্যুদের দুপুরের খাওয়া হয়ে গেছে। রোদ বেশ চড়া। জলদস্যুদের জাহাজের ডেক-এ মাত্র কয়েকজন সিঁড়িঘরের ছায়ায় বসে আছে।
