–আগে মহাবোকে আমাদের হাতে ছেড়ে দাও।
–ঠিক আছে আপনারা ডেক-এ চলুন। আমরা মাহাবোকে নিয়ে যাচ্ছি।
সেনাপতি কিছুক্ষণ কঠিন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সৈন্যদের অনুসরণ করবার ইঙ্গিত করে ডেক-এ ওঠার সিঁড়ির দিকে চলল। মাহাবোকে আমার কেবিন ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে আমরাও ওপরের ডেক-এ উঠে এলাম। মাহাবোকে আমাদের সঙ্গে না দেখে সেনাপতি তাদের ভাষায় চীৎকার করে কি বলে উঠলো। সৈন্যরা বর্শা উঁচিয়ে আমাদের দিকে ছুটে আসতে লাগল। আমরাও ভাঙা হালের টুকরো, বড়-বড় পেরেক, আর নোঙরের ভাঙা টুকরো নিয়ে সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। লড়াই শুরু হলো। আমাদের বন্ধুদের কয়েকজন তরোয়াল ভালোই চালাত। প্রথমেই সেনাপতি ঘায়েল হলো। ওর হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে পড়লো। আমরা সেনাপতিকে ধরাধরি করে তুলে ছুঁড়ে জলে ফেলে দিলাম। সেনাপতির এই অবস্থা দেখে বাকী সৈন্যদের মনোবল ভেঙে পড়ল। দু’জন বর্শা ফেলে জলে ঝাঁপিয়ে পড়লো। বাকিগুলোকে আমরাই ধরে জলে ফেলে দিলাম। কামেরোকেও জলে ছুঁড়ে ফেলা হলো। ওরা সাঁতরে ওদের নৌকোর দিকে চললো। ততক্ষণে জাহাজের নোঙর তুলে ফেলা হয়েছে। দ্রুত তাতে দড়ি দড়া ঠিক করে পাল তুলে দিলাম। দাঁড়িরাও দাঁড় বাইতে লাগল! মুহূর্তের মধ্যে জাহাজ বাইরের সমুদ্রে চলে এলো। সোফালা বন্দর, চাঁদের দ্বীপ চোখের সামনে থেকে মুছে গেল। আমরা মহাসমুদ্রে এসে পড়লাম। জাহাজ বেগে চললো উত্তরের দিকে।
ফ্রেদারিকো থামল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি প্রচন্ড মনোযোগের সঙ্গে ওর গল্প শুনতে লাগল। একটু থেমে ফ্রেদারিকো আবার বলতে শুরু করলো–মাহাবোকে সুস্থ করে তোলার জন্য আমরা চেষ্টার ত্রুটি করলাম না। ওষুধপত্র সেবাশুশ্রূষা সবই চললো। কিন্তু মাহাবো সুস্থ হলো না। বরং ঘা পেকে ফুলে ওর অবস্থা দিন-দিন খারাপ হতে লাগল। আমাদের বৈদ্যি বললো, যে বর্শা দিয়ে ওকে আঘাত করা হয়েছিল। তাতে নাকি বিষ মাখানো ছিল। বিষক্রিয়ার জন্যই ওই ঘা শুকোবে না, বরং শরীরের অন্য জায়গাও বিষ ছড়িয়ে যাবে। মাহাবোকে বাঁচানো যাবে না। কয়েকদিন পরেই মাহাবোর ভীষণ জ্বর এল। ওর শরীরটা কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগল। ওর আচ্ছন্নের মত পড়ে রইলো। সেদিন গভীর রাত্রি। আমি মাহাবোর বিছানার পাশে বসে ওর মাথার জলে ভেজা ন্যাকড়া বুলোচ্ছি আর হাওয়া করছি। ও হঠাৎ চোখ খুললো। দেখলাম চোখ–দুটো লাল টক্ট করছে। ও কিন্তু সুস্থ মানুষের মতোই ব্যবহার করতে লাগল। আমার হাতটা দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে ভাঙা-ভাঙা গলায় বলতে লাগল–বন্ধু তোমার, নাম জানি না, কিন্তু তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আমার পরিচয় তুমি জানো না। তুমি কি চাঁদের দ্বীপের রাজসভা দেখেছো নিশ্চয়ই। কত বড়-বড় মুক্তো দিয়ে রাজসভা সাজানো। রাজা, মন্ত্রী, সেনাপতি সকলের গলায় মুক্তো। মুক্তো সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করে আনতো এসব আমার বাবা।
–তোমার বাবা ছাড়া আর কেউ মুক্তো সংগ্রহ করতে পারে না কেন? আমি জানতে চাইলাম।
মাহববা বলল, কারণ মুক্তোর সমুদ্রের প্রহরী লামাছ। এই মাছেরা যে কি সাংঘাতিক, কল্পনাও করতে পারবেনা। এদের চোখের দৃষ্টি স্থির আর হিংস্র। সমুদ্রের নীচেরশ্যাওলা আগাছা এসবের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। তীক্ষ্ম ধারালো দাঁত দিয়ে এরা শিকারের ওপর আঁপিয়ে পড়ে। আত্মরক্ষার জন্যে এদের পিঠের শিরদাঁড়ায় সারি-সারি ফাঁপা ছুঁচের মত কাঁটা থাকে। এই কাঁটাগুলো ওরা শিকারের গায়ে বসিয়ে দেয়। সেইসঙ্গে ফাঁপা কাঁটাগুলোর মধ্যে দিয়ে আঠা-আঠা বিষ ঢেলে দেয়। যার গায়ে ঐ বিষ ঢোকে, সে অসহ্য ব্যথায় অজ্ঞান হয়ে যায়। তারপরেই সে মরে যায়। এই হিংস্র লাফ মাছ ঐ মুক্তোর সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়। ওদের হাত থেকে বাঁচবার কোন উপায় নেই।
–তাহলে তোমার বাবা মুক্তো সংগ্রহ করে অক্ষত দেহে ফিরে আসতে কি করে? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
–সেটাই রহস্যময়। তবে একটা জিনিস লক্ষ্য করতাম। বাবা মুক্তোর সমুদ্র থেকে ফিরে এলে বাবার গলায় ঝোলানো ভাঙা আয়নাটা থাকতো না। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন–সাঁতরাবার সময় খুলে পড়ে গেছে। বাবা তার কিছুদিন পরেই ভিনদেশী কোন জাহাজে চড়ে মরিটাস দ্বীপে চলে যেতেন। আমি জানি না মরিটাস দ্বীপ কোথায়। কিছুদিন পরে ফিরে আসতেন। গলায় ঝোলানো থাকতো ঠিক অমনি আকারের একটা ভাঙা আয়না। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, বসির আয়নাঅলার কাছ থেকে আয়নাটা তৈরি করে এনেছেন। আমি শুধু এইটুকুই জানতাম।
–তারপর?
–কয়েকদিন আগের কথা চাঁদের দ্বীপের রাজা বাবাকে ডেকে বললেন–এই মুক্তো ভিনদেশী লোকের মোহরের বিনিময়ে কিনে নিতে চায়। মুক্তোর সমুদ্রে তো অঢেল মুক্তো আছে। এবার আমরা কিছু মুক্তো তুলে বিক্রি করবো। বাবা ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন–এই মুক্তো চাঁদের দ্বীপের অধিষ্ঠাতা দেবতার দান। এমনি দিতে পারেন, কিন্তু দেবতার এই দান নিয়ে ব্যবসা করতে পারবেন না। কিন্তু রাজারও এক গোঁ। বিক্রী করার জন্যে আরো মুক্তো তোলাবেন। রাজা দু’জন ভাজিম্বাকে পাঠালেন মুক্তোর সমুদ্র থেকে মুক্তো তুলে আনতে। তারা সেই যে জলে নামলো, আর ওপরে উঠতে পারল না। আমাদের একটা প্রবাদই আছে–যদি চিরদিনের জন্যে কোথাও যেতে চাও, তাহলে মুক্তোর সমুদ্রে যাও। রাজার যত রাগ গিয়ে পড়লো বাবার ওপর। রাজা বুঝলেন বাবা ছাড়া কেউ অক্ষত শরীরে মুক্তো নিয়ে আসতে পারবেন না। শুরু হলো এর উপায় বলে দেবার জন্যে বাবার ওপর দৈহিক অত্যাচার। যখন চরমে উঠলো, বাবা তখন আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। শাস্তিঘরে দেখলাম, বাবা প্রায় অজ্ঞানের মত এ পড়ে আছেন। ঐ অবস্থাতেই আমাকে কাছে ডাকলেন। বাবার হাত-বুনো লতা দিয়ে বাঁধা। আমার কানের কাছে মুখ ফিসফিস্ করে বললেন আমার গলা থেকে আয়নাটা খুলে নে। এটা জোড়-লাগানো দুটো আয়না। বসির আয়নাওলার আয়না সঙ্গে থাকলে মুক্তোর সমুদ্রে কোন ভয় নেই। বাবা আর কিছু বলতে পারলেন না। চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস নিতে লাগলেন। আমি বাবার গলা থেকে জোড়া লাগানো আয়নাটা খুলে কোমরে গুঁজে রাখলাম। ব্যাপারটা কিন্তু সেনাপতির তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে ধরা পড়ল। ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই সেনাপতি আমাকে বলল, দেখি তোমার বাবা তোমাকে কি দিলো। আমি কোমরে গোঁজা আয়নাটা বের করবার ভান করলাম। চারদিক এই ফাঁকে দেখে নিলাম। এখানে ওখানে মশাল জ্বলছে। তখন রাত গভীর। একজন সৈন্য শুধু বর্শা হাতে পাহারা দিচ্ছে। অন্য কয়েকজন গুটিসুটি মেরে ঘরের বারান্দায় বসে আছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে এক লাফে আলোর এলাকা ছাড়িয়ে অন্ধকারে পড়লাম। সেনাপতি চেঁচিয়ে উঠল–মাহাবোকে ধন্ । ঐ সৈন্যটা সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারেই আমাকে লক্ষ্য করে বর্শা ছুঁড়ল। ওরা অন্ধকারেও দেখতে পায়। আমি বসে পড়তে-পড়তে বর্শাটা ছুটে এসে কাঁধে বিধল। আমি বর্শাটা টেনে খুলে ফেললাম। রক্ত ছুটল। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটলাম। একবার ভাবলাম বনের দিকে যাই। কিন্তু জানতাম কামেরোকে লেলিয়ে দেবে সেনাপতি। ও ঠিক আমাকে খুঁজে বের করবে। তার চেয়ে ভিনদেশী জাহাজে চড়ে পালিয়ে যাওয়া ভালো। তাই অন্ধকারে ছুটতে ছুটতে এসে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। তারপর তোমাদের জাহাজে এসে উঠলাম। মাহাবো সমস্ত ঘটনাটা এইভাবে থেমে থেমে বললো। বুঝতে পারছিলাম ওর খুব কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু মুক্তোর সমুদ্রের রহস্যের টানে ওকে আর থামতে বলিনি। মাহাবো দুর্বল হাতে ওর কোমরের জোড়া আয়নাটা বের করে আমার হাতে দিল। ম্লান হেসে বলল–যে জন্যে আমার বাবা মারা গেল, যে জন্যে আমিও বাঁচবে না, সেই অমূল্য জিনিসটি তোমাকে দিয়ে যাচ্ছি। অযত্ন করো না। পারো তো মুক্তো এনো। কিন্তু সেই মুক্তো নিয়ে ব্যবসা করো না। তাহলে চাঁদের দ্বীপের অধীশ্বরের অভিশাপ লাগবে। এই ছিল মাহাবোর শেষ কথা। শেষরাত্রের দিকে আমার কোলে মাথা রেখে মাহাবো মারা গেল। এই কয়েকদিনেই ছেলেটির ওপর আমার মায়া পড়ে গিয়েছিল। ওর মৃতদেহটি কোলে নিয়ে আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম।
