সিনাত্ৰা বুঝল এখন ঐ নিগ্রো যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়তে যাওয়া বোকামি। ওরা গুরুতর আহত হবে। কয়েকজন মরবেও। তার চেয়ে এই লোকটি যা বলছে মেনে নেওয়াই ভালো। ভবিষ্যতে সুযোগ বুঝে পালানো যাবে।
তুম্ফা তখনই ঘরে ঢুকল। বলল–তোমরা যদি এখন পালিয়েও যাও তোমাদের জাহাজে উঠতে পারবে না। তোমাদের জাহাজ এখন প্রায় মাঝ সমুদ্রে।
সিনাত্রা ও বন্ধুরা ভীষণভাবে চমকে উঠল। সিনাত্রা বলল–আপনি দেখেছেন?
–না। আমি যখন দেখেছি তখন জলদস্যুরা সবেমাত্র তোমাদের জাহাজে উঠেছে। তারপর কী ঘটতে পারে ভেবে নাও। তুম্মা বলল। সিনাত্ৰাদের মন খারাপ হয়ে গেল। নিজেরা তো একটু পরেই বন্দীশালায় বন্দী হবে। ফ্রান্সিসরাও বন্দী হল?
সূর্যাস্ত দেখে মারিয়া কেবিনঘরে নেমে এল।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি দুজনেই বন্ধুদের জন্যে ভাবছে। হ্যারি ফ্রান্সিসের বিছানায় বসে আছে। মারিয়া মোমবাতির আলোয় উঁচসুতোর কাজ করছে।
হঠাৎ ওপরের ডেক-এ অনেক পায়ের শব্দ। হ্যারি বলল–সিনাত্রারা বোধহয় ফিরে এল।
ফ্রান্সিসের কেবিনঘরের বন্ধ দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ। হ্যারি দরজা খুলতে গেল। বন্ধুরা এসেছে। হ্যারি দরজা খুলে দিল।
কালো দাড়ি গোঁফওয়ালা জলদস্যু ক্যাপ্টেন। সঙ্গে খোলা তরোয়াল হাতে কয়েকজন জলদস্যু।
জলদস্যু ক্যাপ্টেন দাঁত বের করে হাসল। বলল–তোমাদের জাহাজের সঙ্গে আমাদের জাহাজ বাঁধা হয়ে গেছে। এখন আমাদের ক্যারাভেন জাহাজ তোমাদের জাহাজকে টেনে নিয়ে চলেছে। মাঝ সমুদ্রে।
ততক্ষণ ফ্রান্সিসদের জাহাজ দুলতে শুরু করেছে। বড়বড় ঢেউ ভেঙে পড়ছে জাহাজের গায়ে।
–নাও। দেরি করো না। ওপরের ডেক-এ উঠে এসো। ক্যাপ্টেন বলল।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি উঠে দাঁড়াল। হ্যারি দেশীয় ভাষায় বলল–কয়েদঘর থেকে আমাদের মুক্তি নেই।
–তাই দেখছি। এখন কতদিন বন্দীদশা চলবে মা মেরিই জানে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস হ্যারি মারিয়া ওপরে ডেক-এ উঠে এল। দেখল শাঙ্কো বিস্কো আর কয়েকজন বন্ধু ডেকএর একপাশে বসে আছে। পাহারা দিচ্ছে খোলা তরোয়াল হাতে কয়েকজন জলদস্যু।
পাহারাদার জলদস্যুরা ফ্রান্সিসদের শাঙ্কোদের পাশে বসিয়ে দিল। শাঙ্কো বলল– আমরা ছক্কা-পাঞ্জা খেলছিলাম। ডেক-এ কেউ ছিল না। আমরা বুঝতেই পারিনি কী ঘটে গেছে।
–যা ঘটে গেছে, গেছে। এখন আমাদের বন্দী জীবনই মেনে নিতে হবে। হ্যারি বলল।
কিছুক্ষণ পরে জলদস্যু ক্যাপ্টেন ফ্রান্সিসদের কাছে এল। হেসে বলল–এবার বেশ তরতাজা ইউরোপীয় যুবক পাওয়া গেছে। ভালো দাম পাওয়া যাবে। ফ্রান্সিস বলল–ওদের। ক্রীতদাসের হাটে বিক্রি করা হবে। ক্যাপ্টেন গলা চড়িয়ে বলল–এগুলোকে কয়েদঘরে ঢোকা। তিনচারজন জলদস্যু খোলা তরোয়াল হাতে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসদের কাছে এসে বলল–চলো সব। ফ্রান্সিসরা উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস ক্যাপ্টেনকে বলল–একটা কথা ছিল?
কী? ক্যাপ্টেন বলল।
আমাদের সঙ্গে রয়েছেন আমাদের দেশের রাজকুমারী। তাঁকে আমাদের সঙ্গে কয়েদঘরে রাখবেন না। তাকে আমাদের জাহাজেই রাখুন। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল। জলদস্যু ক্যাপ্টেন একটু ভাবল। তারপর বলল-রাজকুমারী? তা বেশ। তবে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে পালাতে গেলে মরবে।
–সেটা উনি ভালোভাবেই জানেন। বোকার মত উনি তা করতে যাবেন না। ফ্রান্সিস বলল।
–তা হলেই ভালো। তোমাদের রাজকুমারীকে বিক্রি করতে গেলে ভালো দাম পাবো। ক্যাপ্টেন বলল।
তিন চারজন জলদস্যুর পেছনে পেছনে ফ্রান্সিসরা চলল। নিজেদের জাহাজ থেকে জলদস্যুদের জাহাজে গিয়ে উঠল। সিঁড়ি দিয়ে একেবারে নিচের কয়েদঘরে নিয়ে আসা হল ফ্রান্সিসদের।
প্রহরীদের একজন কোমর থেকে চাবির গোছা বের করল। চাবি বেছে নিয়ে ঢং-ঢং কি, শব্দে লোহারদরজা খুলল।
রাজা আলফ্রেডের স্বর্ণখনি। ফ্রান্সিসরা আস্তে আস্তে কয়েদঘরে ঢুকল। দুধারের দুই মশালের আলোয় ফ্রান্সিসরা দেখল কিছু কৃষ্ণকায় মানুষও বন্দী রয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে ক্রীতদাস কেনাবেচার হাটে এদেরও বিক্রি করা হবে।
ফ্রান্সিসরা মেঝেয় বসল। হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–এবার আমাদের খুবই দুর্ভাগ্য। শাঙ্কো ফিরলো না আমরাও বন্দী হলাম। সব কেমন তছনছ হয়ে গেল।
-বুঝতে পারছি না কীভাবে মুক্তির চেষ্টা করবো। একবার মুক্তি পেলে বন্ধুদের খোঁজে রোজিল বন্দরে যাবো। মনে তো হয়–ওরা ভালো আছে। ফ্রান্সিস বলল।
মনে হয় না। হয়তো ওদেরও কোন বিপদ হয়েছে। হ্যারি বলল।
–বিপদ হলে ওদেরই মোকাবিলা করতে হবে। আমরা তো অসহায় এখন। ফ্রান্সিস বলল।
–মুক্তির ব্যাপারটা গভীরভাবে ভাবো। হ্যারি বলল।
–তা তো ভাবতে হবেই। ফ্রান্সিস বলল।
একজন বলিষ্ঠ কৃষ্ণকায় বন্দী যুবক ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বলল আপনাদের দলনেতা কে?
হ্যারি নিঃশব্দে আঙুল তুলে ফ্রান্সিসকে দেখল। যুবকটি ফ্রান্সিসদের পাশে এসে বসল।
-তোমার নাম? যুবকটি জানতে চাইল।
–ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস বলল।
–আমার নাম কোলা। যুবকটি বলল।
–ও। তুমি কিছু বলবে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
হ্যাঁ। অনেক ভেবেচিন্তে এখান থেকে পালাবার উপায় বের করতে হবে। কোলা বলল।
–কোন উপায় নেই। জলদস্যুরা আমাদের নিয়ে যা করতে চাইবে তাই করবে। ফ্রান্সিস বলল।
তার মানে ক্রীতদাসের জীবনই আমাদের ভাগ্য। কোলা বলল।
তাই তো মনে হচ্ছে। ফ্রান্সিস বলল।
