-বেশ। তুমি কাঁচ ভাঙো। রাজা বললেন। তারপর প্রহরীদের গোল করে দাঁড় করালেন।
ফ্রান্সিস সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। তারপর হাতের পাথরটা সজোরে কাঁচের ঢাকনাটায় ঘা মারল। কালো কাঁচ ভেঙে পড়ল। সঙ্গে ঝর ঝর করে পড়তে লাগল দামি দামি অলঙ্কার সোনা রুপোর চাকতি। মেঝের ঝরে পড়ল সেসব। যোদ্ধারা লোকেরা অবাক বিস্ময়ে সেই গুপ্ত ধনভাণ্ডারের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস বা শাঙ্কো অবাক হল না। এরকম দৃশ্য ওরা আগেও দেখেছে।
রাজা পারকোনও বিস্ময়ে হতবাক। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও এই গুপ্ত ধনভাণ্ডার তিনি উদ্ধার করতে পারেননি। তিনি হা হা করে হাসতে হাসতে মূল্যবান হীরের অলঙ্কার মুক্তোর মালা দুহাতে তুলে তুলে রেখে দিতে লাগলেন।
তারপর হাসি থামিয়ে দুজন দেহরক্ষীকে বললেন–তোমরা এইসব একটা কাপড়ে বেঁধে নিয়ে আমার সঙ্গে চলো৷ দেহরক্ষী দুজন একটা কাপড় পেতে সেই গুপ্ত ধনভাণ্ডার বাঁধল। সেটা তুলে নিয়ে রাজা পারকোনের পেছনে দাঁড়াল।
এবার রাজাপারকোন ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বললেন-তোমারও তো কিছুপ্রাপ্য হয়।
না। আমরা কিছু নেবনা। একাইবিনীত নিবেদন-রাজা তুরীন যেন তার প্রাপ্য পান।
–এই ধনভাণ্ডার আমার পূর্বপুরুষের। তুরীনের প্রাপ্য হয় কী করে? রাজা পারকোন বললেন।
–কিন্তু গুপ্ত ধনভাণ্ডারের কিছুঅংশ রাজা তুরীনও পাবেন এই কথা বলেই আপনাদের শত্রুতা আমি মিটিয়েছিলাম।
–সে পরে দেখা যাবে। রাজা পারকোন বললেন।
–ঠিক আছে। না হয় পরেই দেখবেন। ফ্রান্সিস বলল।
উদ্ধার করা ধনভাণ্ডার নিয়ে রাজা পারকোন চলে গেলেন।
ফ্রান্সিস বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–এখন আমরা জাহাজে ফিরে যাবো। আর সময় নষ্ট করবো না।
গর্ভগৃহ থেকে সবাই বেরিয়ে এল। চলল দক্ষিণমুখো। ওদিকেই বন্দর, যেখানে ওদের জাহাজ রয়েছে।
কিছুদূর যেতেই পূব আকাশে কমলা রং ছড়িয়ে সূর্য উঠল। ফ্রান্সিসরা হাঁটতে লাগল।
জাহাজঘাটে যখন পৌঁছল তখন একটু বেলা হয়েছে। ফ্রান্সিসরা দেখল মারিয়া আর কয়েকজন ভাইকিং জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
ভাইকিংরা জাহাজেউঠতে উঠতে ধ্বনি তুলল—ও—হো–হো। মারিয়া হাসিমুখে এগিয়েএল। ফ্রান্সিস হেসে বলল-মারিয়া এবারও আমার হাত খালি। কিছুইআনতে পারিনি।
–আমার তাতে কোন দুঃখ নেই। মারিয়া হেসেই বলল।
ফ্রান্সিস ডাকল–ফ্লেজার। ফ্লেজার এগিয়ে এল।
–এখনই জাহাজ ছাড়ো–আমাদের মাতৃভূমির দিকে। সবাই হৈ হৈ করে উঠল। তারপর যে যার কাজে লেগে গেল।
ঘর ঘর শব্দে নোঙর তোলা হল। জাহাজ চলতে শুরু করল। খুলে দেওয়া পালে জোর হাওয়া লাগল। হাওয়ার তোড়ে পালগুলো ফুলে উঠল।
পূর্ণবেগে জাহাজ সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে চলল।
রাজা আলফ্রেডের স্বর্ণখনি
স্বদেশে ফেরার জন্য ভাইকিংদের আগ্রহ তুঙ্গে উঠল। এখন ওরা কোন কথা শুনতেই রাজি নয়। স্বদেশে ফিরবেই। কিন্তু ফ্রান্সিস? তাকে বোঝাবে কী করে? হ্যারি ব্যাপারটা আঁচ করতে পারল। কিন্তু ফ্রান্সিসকে কিছু বলল না। ও দেখবার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল বন্ধুরা কী করে।
ভাইকিং বন্ধুরা হ্যারিকে বলল—তুমিই ফ্রান্সিসকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে দেশে ফেরার জন্য রাজি করাও।
হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস আমার কথা শুনবে না।
–তুমি ওর প্রাণের বন্ধু। তোমার কথা শুনবে না।
–না। ও যা মনস্থির করে তাই করে। কারো মতামত গ্রাহ্য করে না। হ্যারি বলল।
–তাহলে উপায়? বন্ধুরা বলল।
–আমার অবশ্য বলা উচিত না তবু বলছি একমাত্র রাজকুমারীই পারে ফ্রান্সিসকে রাজি করাতে। হ্যারি বলল।
–ঠিক বলেছো। আমরা রাজকুমারীকে বলবো। বন্ধুরা বলল।
মারিয়া প্রতিদিন সূর্যাস্ত দেখতে জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়ায়। সেদিনও এসেছে।
তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সূর্য নেমে আসছে সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায়। আস্তে আস্তে উঁচু। উঁচু ঢেউয়ের মধ্যে সূর্য ডুবে গেল। একটু অন্ধকার হয়ে এল চারদিক।
শাঙ্কো বিস্কোরা রাজকুমারীর কাছে এল। এভাবে ভাইকিংরা কখনো রাজকুমারীর কাছে আসে না। সেদিন এল। রাজকুমারী একটু অবাক হয়েই ওদের দিকে তাকাল।
রাজকুমারী। শাঙ্কো ডাকল।
–কী ব্যাপার বলো তো৷ তোমরা আমাকে কিছু বলবে? মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ। শাঙ্কো বলল।
–বলো। মারিয়া বলল।
আমরা আর ঘুরে বেড়াতে রাজি নই। এবার আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই। বিস্কো বলল।
–সে তো আমিও চাই। কতদিন বাবা-মাকে দেখি না।
–আপনি ফ্রান্সিসকে বলুন যাতে ও দেশে ফিরে যেতে রাজি হয়। বিস্কো বলল।
–আমি বললেই কি ও রাজি হবে? তবু তোমরা বলছো। দেখি বলে। রাজকুমারী বলল।
শাঙ্কোরা চলে গেল। মারিয়া কেবিনঘরে এল। দেখল ফ্রান্সিস চুপ করে চোখ বুজে শুয়ে আছে।
রাজকুমারী বিছানার পাশে বসল। আস্তে আস্তে বলল–একটা কথা বলছিলাম।
–কী কথা? ফ্রান্সিস চোখ খুলে বলল।
এবার দেশে ফিরে চলো। রাজকুমারী বলল।
–আমরা তো এ দেশ ঐ দ্বীপ এসব জায়গায় থেমে থেমে ফিরবো। যদি কোন গুপ্ত ধনভাণ্ডারের খবর না পাই ফিরে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
-যদি কোন গোপন ধনভাণ্ডারের খোঁজ পাও? মারিয়া জিজ্ঞেস করল।
–তাহলে তো উদ্ধারের কাজে নামবো। ফ্রান্সিস বলল।
তার মানে তো আরো বেশ কিছুদিন নষ্ট হওয়া। মারিয়া বলল।
নষ্ট বলবো কেন? সময়টা তো আমরা কাজে লাগাবো।
না না। আর বিলম্ব নয়। এখন সোজা দেশে চলো। মারিয়া বলল।
