ফ্রান্সিস গুহার বাইরে এল। মিনাকা এগিয়ে এল। বলল চলুন আপনাকে অন্য দিক দিয়ে পাহাড় থেকে নামিয়ে দিচ্ছি যাতে রাজা অভিন্দার সৈন্যদের নজরে না পড়েন। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ফ্রান্সিস কিছু জংলা গাছের ডাল দিয়ে আস্তে আস্তে রাজা আভিন্দার সৈন্যদের আবাসের পেছনে চেস্টনাট গাছটার নিচে পাতলা ডালপাতার আড়াল তৈরি করে মাটিতে শুয়ে পড়ল। ওখান থেকে সৈন্যবাসে সৈন্যদের চলাফেরা কথাবার্তারশব্দ পাচ্ছিল।
রাত হল। সৈন্যাবাসে ঘন্টা বাজল। রাতের খাওয়া শুরু হল। খাওয়াদাওয়া শেষ হল। ফ্রান্সিসদের ক্ষুধাবোধটা এবার মাথা চাড়া দিল। কিন্তু আজ রাতে কিছু খাওয়া হবে না। একেবারে নির্জলা উপোস।
সৈন্যরা যে যার ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারদিক নিস্তব্দ হয়ে গেল। শুধু দূরের বন থেকে ভেসে আসছে গাছের ডালপাতায় বয়ে যাওয়া বাতাসের শশন্ শব্দ।
ফান্সিস আকাশর দিকে তাকাল। উজ্জ্বল চাঁদ। চারদিকে জ্যোস্নার ছড়াছড়ি। তারায় ছাওয়া আকাশ। ভাবল–কোথায় আমার মাতৃভূমি। আর কোথায় আমি ডালপাতার আড়ালে ঘাসের ওপর শুয়ে আছি। অপেক্ষা করছি এক রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের জন্য। যদি এই লড়াই করতে গিয়ে মরে যাই। ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে এই চিন্তাটা তাড়াল।
রাত গভীর হল। ফ্রান্সিস পাশ ফিরে পাহাড়ের দিকে তাকাল। শাঙ্কোরা এখনও আসছেনা।
কিছু পরেই ও ফিস্ ফিস্ ডাক শুনল–ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে দাঁড়াল। দেখল, বন্ধুরা তরোয়াল হাতে দাঁড়িয়ে। সঙ্গে বর্শা হাতে রাজা পারকোনের যোদ্ধারা। সংখ্যায় তারা কম নয়।
চাঁদের আলোয় সবই দেখা যাচ্ছিল। ফ্রান্সিস হাত বাড়িয়ে সৈন্যবাসের সামনের দিকে সবাইকে যেতে ইঙ্গিত করল। সৈন্যাবাসের বারান্দায় উঠে ফ্রান্সিস সবাইকে ভাগ ভাগ করে ঘরের দরজার সামনে দাঁড় করাল। দু’জন যোদ্ধাকে দাঁড় করালো অস্ত্রঘরের সামনে কে কোন প্রহরী ছিল না।
এবার ফ্রান্সিস চাপা গলায় যোদ্ধাদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে বলল–দরজা বন্ধ থাকলে লাথি মেরে ভাঙো। ঘরে ঢুকে আক্রমণ কর। একটু থেমে ফ্রান্সিস এবার বলে উঠল–ভাঙো একসঙ্গে।
ভাইকিংরা যোদ্ধারা একসঙ্গে দরজায় লাথি মারতে লাগল। সময়ের একটু এদিক ওদিক হতে দরজা ভেঙে যেতে লাগল। সৈন্যদের ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠবার আগেই ভাইকিংরা তরোয়াল হাতে। যোদ্ধারা বর্শাহাতে আভিন্দার সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। নিরস্ত্র সৈন্যরা মরতে লাগলআহত হতে লাগল। কয়েকজন সৈন্য অস্ত্রঘরের সামনে এল। দেখল–বর্শা উঁচিয়ে দু’জন যোদ্ধা দাঁড়িয়ে। ওরা লাফ দিয়ে প্রান্তরের ওপর নামল তারপর ছুটে পালাতে লাগল। যারা মারা গেল না তেমন আহত হল না। তারা প্রান্তরে নেমে ছুটে পালাতে লাগল। আহতদের আর্তনাদে গোঙানিতে ভরে উঠল সৈন্যাবাস। আভিন্দার সৈন্যরা সহজেই হার স্বীকার করল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বললআর কাউকে হত্যা করবে না। বন্দী কর। ভাইকিংরা সৈন্যাবাসের মালখানা থেকে দড়ি নিয়ে এল। আভিন্দার সৈন্যদের বন্দী করতে লাগল।
ওদিকে গর্ভগৃহের সৈন্যাবাসের সৈন্যরা এই লড়াইয়ের শব্দ চিৎকার আর্তনাদ অস্পষ্ট শুনল। এই গর্ভগৃহে বেশি সৈন্যদের রাখা যাচ্ছিল না বলে রাজা আভিন্দা ওপরে সৈন্যদের জন্য বাড়ি তৈরি করিয়েছিল। সেই সৈন্যরা হেরে গেল। এবার গর্ভগৃহের সৈন্যাবাস থেকে সৈন্যরা বেরিয়ে এল। প্রান্তরের ওপর আসতে ফ্রান্সিস এক বন্ধুর হাত থেকে তরোয়াল নিয়ে ওদের দিকে ছুটে গেল। বাঁ হাত তুলে বলে উঠল–তোমরা অস্ত্র ত্যাগ কর। লড়াই করতে এলে কেউ বাঁচবে না। ওপরের সৈন্যাবাসের সবাই হার স্বীকার করেছে। তোমরাও আত্মসমর্পণ কর। লড়াই মৃত্যু রক্তপাত আমরা চাইনা।
সৈন্যরা থমকে দাঁড়াল। দেখল ভাইকিংরা রাজা পারকোনের সৈন্যরা ওদের চেয়ে অনেক বেশি। ওদের জেতার কোন উপায় নেই। একজন সৈন্য তার বর্শা মাটিতে ফেলে দিল। একে একে সবাই বর্শা ফেলে দিল। সবাইকে বন্দী করা হল।
তখন আকাশ সাদাটে হয়ে গেছে। পূর্ব আকাশেকমলা রং ধরেছে। সূর্য উঠতে দেরি নেই।
ওদিকে বাইরের লড়াইয়ের শব্দ রাজা আভিন্দার কানে এল। সে বিছানা ছেড়ে উঠে সৈন্যাবাসের দিকে গেল। একজন সৈন্যও নেই। তাহলে ওপরে লড়াই চলছে।
আভিন্দা ওপরে উঠে এল। তখন সূর্য উঠেছে। নিস্তেজ রোদ পড়েছে প্রান্তরে সৈন্যাবাসে। সেই আলোয় রাজা আভিন্দা দেখল তার সৈন্যরা সব বন্দী। তখনও আহতদের গোঙানি শোনা যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসেরদিকেতাকিয়েআভিন্দাবলল–আমার সৈন্যরা হেরে গেছে।
-হ্যাঁ। আপনার হাত বাঁধবো না। তবে আপনাকে এই মুহূর্তে যে অবস্থায় আছেন সেই অবস্থায় জামিনায় আপনার নরপশু রাজা কার্জার কাছে চলে যেতে হবে। আবার রাজা পারকোন এখানকার রাজা হবেন।
কিন্তু গুপ্তধন? আভিন্দা বলল।
–গুপ্তধনের আশা ছাড়ুন। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে গুপ্তধন খুঁজে দেবে বলে তুমি আমাকে ধোঁকা দিয়েছিলে? আভিন্দা বলল।
হ্যাঁ। আপনাকে এখান থেকে তাড়াতে। তবে সেই গুপ্তধন আমি নিশ্চয়ই খুঁজে বের করবো। তবে সেটা পাবেন রাজা পারকোন। আপনি বা কাদর্জা নন।
আভিন্দা ভালো করেই বুঝল লড়াইয়ে সে হেরে গেছে। এখন এই রাজত্ব ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। বলা যায় না যেতে না চাইলে হয়তো এরা তাকে ফাঁসিও দিতে পারে।
