শাঙ্কো হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। গলা চড়িয়ে বলল–আর দূরে যাবো না। এবার পাহাড় জঙ্গলের আড়ালে আড়ালে পাহাড়ে যাবো।
সবাই ফিরে দাঁড়াল। ফিরে চলল পাহাড়ের দিকে। নিঃশব্দে। পাহাড়টার তলায় এসে সবাই থামল। তারপর দল বেঁধে পাহাড়ে উঠতে লাগল। কিছুদূর উঠতেই একটা গুহা দেখতে পেল। গুহার মুখে এসে দাঁড়াল। শাঙ্কো আস্তে আস্তে গুহার মধ্যে ঢুকল। বাইরের আলো থেকে এসে কিছুই দেখতে পেল না। অন্ধকার চোখে সরে আসতে দেখল গুহাটা খুবই ছোটো। ও গুহা থেকে বেরিয়ে এল। বন্ধুদের কাছে এসে বলল–গুহাটা ছোট। বড় গুহা খুঁজতে হবে। চলো সব। ওপর দিকে। ওপর দিকে উঠে ওরা গুহা খুঁজতে লাগল। পেলও একটা গুহা। শাঙ্কো গুহাটায় ঢুকতে যাবে, চারপাঁচজন যোদ্ধা খোলা বর্শা হাতে ছুটে এল। বন্ধুরা দাঁড়িয়ে পড়ল। শাঙ্কো যোদ্ধাদের দেখেই বুঝল–ওরা রাজা পারকোনের যোদ্ধা। গায়ে নীল পোশাক। শাঙ্কো দ্রুত দুহাত ওপরে তুলে বলল–আমরা ভাইকিং। তোমাদের বন্ধু। রাজা পারকোনের যোদ্ধারা দাঁড়িয়ে পড়ল। ওরা শাঙ্কোদের চিনল, ভাইকিং এরা শাঙ্কো এগিয়ে গেল। বলল-রাজা পারকোন কোথায়?
–এই গুহাতেই আছেন। একজন যোদ্ধা বলল।
–আমাদের তার কাছে নিয়ে চলো। শাঙ্কো বলল।
এসো। একজন যোদ্ধা বলল।
সবাই গুহার মধ্যে ঢুকল। অন্ধকার চোখে সরে আসতে সবাই দেখল একটা মোটা কাপড়ের ওপর রাজা পারকোন বসে আছেন। বেশ বড় গুহা। আর যোদ্ধারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে বসে আছে। একপাশে উনুন জ্বেলে রান্না হচ্ছে। শাঙ্কোর খিদে বেড়ে গেল। সেই সকালে খেয়েছে। এখন শেষ বিকেল। গুহার পাথরের গর্তে মশাল জ্বলছে।
শাঙ্কো রাজা পারকোনের কাছে গেল। রাজা পারকোন হেসে বললেন–তোমরাআমার প্রাণ বাঁচিয়েছো। তোমাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
কিন্তু মান্যবর, আপনি এখনও আপনার রাজত্ব ফিরে পান নি।
একটু চুপ করে থেকে রাজা পারকোন বললেন–সে কি আর ফিরে পাবো?
নিশ্চয়ই পাবেন। আমরা আপনাকে আপনার রাজত্ব ফিরিয়ে দেব। শাঙ্কো বলল।
–সেটা কি পারবে? রাজা পারকোন বললেন।
–সেটা নির্ভর করছে আপনার সৈন্যদল কতটা আমাদের সাহায্য করতে পারবে তার ওপর। কারণ আমরা সংখ্যায় বেশি নই। আপনার অন্য সৈন্যরা কোথায় আছে? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–এই পাহাড়ের কোন গুহায় পাহাড়ের নিচের জঙ্গলে। পারকোন বললেন।
—তাদের আমরা একত্র করবো। তারপর সময় সুযোগ বুঝে নতুন রাজা আভিন্দার সৈন্যদের আক্রমণ করবো। শাঙ্কো বলল।
লড়াই হবে।
নিশ্চয়ই লড়াই হবে। আমরা অবশ্যই জয়ী হবো। আপনি নিশ্চিত জানবেন। শাঙ্কো বলল।
–দেখ চেষ্টা করে। রাজা বললেন।
এবার আমাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করুন। সেইসকালে খেয়ে বেরিয়েছি। আমরা ক্ষুধার্ত। শাঙ্কো বলল।
নিশ্চয়ই ব্যবস্থা হবে। রাজা পারকোন গলা চড়িয়ে ডাকলেন।
–মিনাকা–মিনাকা রান্নার জায়গাতে ছিল। রাজার কাছে এগিয়ে এল।
–এদের খেতে দাও। রাজা পারকোন বললেন।
–এদের জন্যে রান্না করা হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার দেওয়া হবে। মিনাকা নিজের জায়গায় চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে মিনাকা শাঙ্কোর কাছে এল। বলল–আপনারা খেতে আসুন।
শাঙ্কোরা খেতে বসল। কোন গাছের তিনকোনা পাতা পেতে দেওয়া হল। খেতে দেওয়া হল রুটি আর আনাজপাতির ঝোল। ক্ষুধার্ত শাঙ্কোরা তাই পেট পুরে খেল। তারপর শুয়ে বসে বিশ্রাম করতে লাগল।
শাঙ্কো আর দেরি করল না। মিনাকাকে নিয়ে সন্ধ্যের মুখে গুহা থেকে বেরিয়ে গেল। পাথর ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে অন্য গুহার খোঁজ করতে লাগল। মিনাকাই ওকে একটু দূরের এক গুহামুখে নিয়ে এল। বলল–এই গুহাতেও কিছু সৈন্য আশ্রয় নিয়েছে। গুহামুখে দাঁড়িয়ে মিনাকা আস্তে করে নাম ধরে ডাকল। একজন যোদ্ধা বর্শা হাতে বেরিয়ে এল। মিনাকাকে দেখে বলল–এসো। মিনাকা আর শাঙ্কো গুহাটায় ঢুকল। গুহায় মশাল জ্বলছে। সেই আলোয়শাঙ্কো দেখল প্রায় ত্রিশ-চল্লিশজন যোদ্ধা গুহার মেঝেয় শুয়ে বসে আছে। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসবআমরা ভাইকিং। আমরা স্থির করেছিনতুন রাজা আভিন্দাকে এই রাজ্য থেকে তাড়াবো। তোমাদের সঙ্গে আমরাও লড়াই করবো। রাজা পারকোনকে তাঁর রাজত্ব ফিরিয়ে দেব। সময় হলেই তোমাদের ডাকা হবে। তোমরা লড়াইয়ের জন্যে। তৈরি থেকো। শাঙ্কো থামল। যোদ্ধারা কেউ কোন কথা বলল না। মিনাকা গলা চড়িয়ে। বলল–বন্ধুরা–এটাই শেষ লড়াই। আমাদের জিততেই হবে।
দুজনে গুহা থেকে বেরিয়ে এল। চলল পাহাড়ের পূর্বদিকে। এবার পেল একটা ছোট গুহা। সেখানেও দশ-পনেরোজন রাজা পারকোনের যোদ্ধাদের পেল। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে তাদেরও একটা কথা বলল। বেরিয়ে এল।
বাইরে চাঁদের আলো বেশ উজ্জ্বল। সেই আলোয় খুঁজে খুঁজে মিনাকা শাঙ্কোকে আর একটা গুহার মুখে নিয়ে এল। মশালের আলোয় দেখা গেল এখানেও ত্রিশ-চল্লিশজন, যোদ্ধা রয়েছে। শাঙ্কো আগের কথাগুলো বলল। যোদ্ধারা নীরবে কথাগুলো শুনল। কেউ কোন কথা বলল না।
বাইরে এসে মিনাকা বলল–আর সব.গুহা রাজা রবার্তোর রাজত্বের দিকে। ঐসব গুহায় বোধহয় কেউ আশ্রয় নেয়নি। এবার চলুন নিচের জঙ্গলে। শুনেছি সেখানেও কিছু যোদ্ধা আত্মগোপন করে আছে।
দু’জনে পাহাড় থেকে নিচের বনজঙ্গলে নেমে এল। ছাড়া ছাড়া গাছের জঙ্গল। গাছের। ডালপাতার ফাঁক দিয়ে এখানে ওখানে ভাঙা জ্যোৎস্না পড়েছে। কিছুদূর যেতে ওরা দেখল তিন-চারটে গাছের জটলা। সেই জটলার মাথায় ডাল কেটে তৈরি ডালপাতার ছাউনি। সেই ছাউনির কাছাকাছি আসতে অন্ধকার থেকে একটা বর্শা ছুটে এল। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বর্শাটা মিনাকার মাথার পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। দুজনেই সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ল। মিনাকা চাপাস্বরে বলল–আমি মিনাকা। বর্শা ছুঁড়ো না। সেই ছাউনি থেকে দুজন যোদ্ধা বর্শা হাতে বেরিয়ে এল। ভাঙা জ্যোৎস্নায় মিনাকাকে চিনল। শাঙ্কোকে দেখিয়ে বলল–এঁরা ভাইকিং। দুঃসাহসী। তোমাদের কিছু বলবেন। শোন। শাঙ্কো চাপাগলায় আগের কথাগুলো বলল। ছাউনির ভেতর থেকে আরো কিছু যোদ্ধা বেরিয়ে এল। সবাইশাঙ্কোর কথা শুনল। কিছু বলল না। শুধু একজন যোদ্ধা বলল–আমরা তৈরি থাকবো।
