কিন্তু সেনাপতির মুখ কঠিন। কথাটা সে বিশ্বাস করেছে বলে মনে হলো না। তখনই দেখি গতরাত্রে আমার সঙ্গী অন্য বন্ধুটি ক্যাপ্টেনের কাছে যাচ্ছে। ঐ বন্ধুটি জাতিতে স্প্যানিশ। আমি স্প্যানিশ ভাষায় বলে উঠলাম সাবধান গতরাত্রির কথা বলো না। বন্ধুটি বুদ্ধিমান। মাথাটা একবার নেড়ে সহজ ভঙ্গীতে ক্যাপ্টেনকে গিয়ে বললো–কাল বাতাস পড়ে গিয়েছিল। গরমের জন্যে আমরা অনেক রাত পর্যন্ত ডেকে ছিলাম। কাউকে দেখিনি। ক্যাপ্টেন সেনাপতির দিকে তাকিয়ে বললো–দেখলেন তো ও বলছে, ওরা কাউকে দেখে নি। কিন্তু সেনাপতির মুখের ভাবের কোন পরিবর্তন হলো না। ভাঙা-ভাঙা পর্তুগীজ ভাষায় বলল–ছেলেটি ভীষণ আহত ছিল। এই কথা বলে সেনাপতি মাথা নীচু করে ডেক-এর ওপর নজর রাখতে রাখতে জাহাজের পেছেনের দিকে যেতে লাগল। সৈন্যরাও সঙ্গে-সঙ্গে চলল। হঠাৎ পেছন দিককার ডেক-এর দিকে একজায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লো। বলে উঠল–রক্ত। ক্যাপ্টেনও সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। দেখলো সত্যিই ডেক-এ ফোঁটা-ফোঁটা রক্তের দাগ। সেনাপতি আপন মনে বিড়বিড় করে বলল–মাহাবো!
আমি কাছেই দাঁড়িয়েছিলাম। বুঝলাম, ছেলেটির নাম মাহাবো। সেনাপতি মুখ তুলে ক্যাপ্টেনকে বলল–জাহাজ দেখবো।
ক্যাপ্টেন বলে উঠল–বেশ তল্লাশী করুন।
সেনাপতি সঙ্গের সৈন্যদের নিয়ে জাহাজ তল্লাশী শুরু করল। প্রত্যেকটি কেবিন। ঘরে, দাঁড়টানার ঘরে, রসুই-ভঁড়ার ঘরে ঢুকে দেখল, কিছুই বাদ দিল না। কিন্তু মাহাবোকে কোথাও পেল না। সেনাপতিটি অপ্রসন্নমুখে ডেক-এ রক্তের দাগ-দাগ জায়গাটার কাছে কয়েকবার পায়চারি করলো। তারপর ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেস করলো–জাহাজ কবে ছাড়ছেন?
ক্যাপ্টেন বললো–আমাদের তো লেনদেনের কাজ মিটে গেছে। আমরা আজকেই জাহাজ ছাড়বো।
সেনাপতি মাথা ঝকাল–না আজ জাহাজ যাবে না।
–কেন! ক্যাপ্টেন বেশ অবাক হলো।
সেনাপতি কালছে ছোপ লাগা দাঁত বের করে হাসল। মনে হ’লো মুখ ভ্যাংচাল। তারপর পর্তুগীজ ভাষায় বলল আমি কামেরোকে আনতে যাচ্ছি। ওকে নিয়ে আসা পর্যন্ত ভাজি সৈন্যরা এখানেই থাকবে। তারপর চোখ পিটপিট করে বলল কামেরোকে জানেন? রক্তের গন্ধ শুঁকে ও আহত শিকার ধরে আনে গভীর জঙ্গল থেকে। ওর নাকটা ছোট, কিন্তু ওর নাককে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব।
সেনাপতি আর কোন কথা না বলে জাহাজ থেকে নোঙরের দড়ি ধরে ধরে নৌকায় নেমে গেল। একাই বেয়ে চললো সোফালা বন্দরের দিকে। সৈন্যরা জাহাজেই রইল।
ফ্রেদারিকো এতক্ষণে থামল। ফ্রান্সিস তাড়া দিল–মুক্তোর সমুদ্রের ব্যাপারটা বলো।
–বলছি-বলছি–সব বলবো। তার আগে একটু জল খাবো। খুব তেষ্টা পেয়েছে। হ্যারি একটু সরে গিয়ে জলের জালা থেকে নারকেলের মালা দিয়ে জল ভরে নিয়ে এল। ফ্রেদারিকো ঢকঢক করে জল খেল। তলানি যে জলটুকু ছিল, তাই দিয়ে চামড়ার আঁকা নক্সাটা ভেজাল। তারপর আবার ভাঙা আয়নাটার পেছনে সেঁটে দিল। আবার কোমরের গাঁট থেকে তামাকপাতা বের করলো। মুখে ফেলে চিবুতে চিবুতে বলল–আমি বিপদ আঁচ করলাম। এরকম জংলী মানুষের কথা আমি শুনেছিলাম। শিকারীরা এদের নিয়ে জঙ্গলে শিকার করতে যায়। আহত জানোয়ারের রক্তে র গন্ধ শুঁকে-কে, যেখানেই জানোয়ারটা থাকুক না কেন ঠিক বের করে। কামেরো সেই রকম জংলী মানুষ। জাহাজী বন্ধুদের আমার কেবিনঘরে জড়ো করলাম। সব বললাম। জংলী কামেরো এসে ভাজিম্বা ছেলেটিকে ও খুঁজে বের করবেই। তবে একটা বাঁচোয়া। রক্তটা বাসি হয়ে গেছে ধরতে পারবে না মনে হচ্ছে। কিন্তু সাবধানের মার নেই। যদি মাহাবো’ অর্থাৎ ছেলেটি ধরা পড়ে, তবে আমাদের কাজ হবে সেনাপতি-শুদ্ধ সব ক’টা সৈন্যকে জলে, ফেলে দেওয়া আর এক মুহূর্ত দেরী না করে জাহাজ ছেড়ে দেওয়া।
কিন্তু ক্যাপ্টেন কি রাজি হবে? একজন জাহাজী বন্ধু বলল।
ক্যাপ্টেনকে বোঝাবার দায়িত্ব আমি নিলাম। ওদের বললাম, তোমরা শুধু সেনাপতি আর সৈন্যদের জলে ফেলে দিতে সাহায্য করো। ওরা রাজি হলো।
একটু থেমে ফ্রেদারিকো বলতে লাগল আমি সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে দেখা করলাম। গতরাত্রের সব ঘটনা বললাম। ক্যাপ্টেন কয়েকবার মাথা নেড়ে বললে–উঁহু মাহাবোকে ওদের হাতে তুলে দিতেই হবে।
আমি বললাম–তাহলে ওরা ওকে সঙ্গে-সঙ্গে মেরে ফেলবে।
–ওসব ওদের ব্যাপার–আমরা ওসবের মধ্যে নেই। ক্যাপ্টেন বলল।
–তাইবলে জেনেশুনে একটা এত অল্পবয়সী ছেলেকে খুনীদের হাতে তুলে দেবেন?
–উপায় কি? ক্যাপ্টেন হতাশার ভঙ্গী করল।
–উপায় আমরা বের করেছি। কিন্তু আপনি আপনার ঘর থেকে বেরোবেন না।
–কেন?
–তাহলে আপনার দায়িত্ব থাকবে না। যা করবার আমরাই করবো। ক্যাপ্টেন কিছুতেই রাজি হবে না। আমিও নাছোড়বান্দা। আমি আশ্বাস দিলাম এই চাঁদের দ্বীপে আবার কবে আসবো–তার ঠিক কি? আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনি শুধু ঘর থেকে বেরোবেন না, তাহলেই হলো। ক্যাপ্টেন বারকয়েক–আপত্তি করে অবশেষে রাজি হলো।
একটু থেমে ফ্রেদারিকো বলতে লাগল–দুপুরের দিকে সেনাপতি নৌকায় চড়ে এল। সঙ্গে সেই জংলী মানুষ কামেরা। জাহাজে উঠেই সেনাপতি ক্যাপ্টেনের খোঁজ করলো। আমরা বললাম, উনি অসুস্থ। নিজের কেবিনে শুয়ে আছেন। সেনাপতি কামেরোকে রক্তের দাগ পড়েছে ডেক-এর যে জায়গায়, সেদিকে নিয়ে চললো কামেরো উচ্চতায় তিনফুটও হবে না। মাথায় বড়-বড় চুল ওর চোখ-মুখ ঢেকে দিয়েছে। পরনে একটা নেংটি। সারা গায়ে নানারকম নানারঙের উল্কি আঁকা। কামেরো রক্তের শুকিয়ে যাওয়া ফোঁটাগুলোর ওপর উবু হয়ে বোধহয় গন্ধই শুকলো। মুখ তুলে সেনাপতিকে কি বললো। বোধহয় বাসি হয়ে গেছে বলে রক্তোর গন্ধ পাচ্ছে না, সে কথাই বলল। কামেরো আবার বার কয়েক গন্ধ শুকলো। তারপর ঐ অবস্থাতেই চললো নিচে নামবার সিঁড়ির দিকে। আমরা আগে লক্ষ্য করি নি। এবার লক্ষ্য করলাম, সিঁড়ির কোণের দিকে বেশ কিছুটা রক্ত লেগে আছে। মনে পড়লো, মাহাবো এই জায়গায় টাল নিয়ে পড়ে যাচ্ছিল। আমি ধরে ফেলেছিলাম। এই জায়গায় তাই ও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। তাই ফোঁটা-ফোঁটা রক্ত জমে বেশকিছুটা রক্তের দাগ এখানে রয়েছে। কামেরো মুখ উবু অবস্থায় কুকুরের মত একটা লাফ দিল বুঝলাম, আর উপায় নেই। মাহাবো ধরা পড়বেই। আমি চাপা গলায় বন্ধুদের সে কথা বললাম–সব তৈরি থেকো। একজনকে পাঠালাম নোঙরের জায়গায়। আমরা ইসারা করতেই ও যেন নোঙর তুলে ফেলে। অন্যরা সব। তৈরি হয়ে গেলাম। এবার কামেরো চলল আমার কেবিনঘরের দিকে। সেখানে রক্তমাখা কম্বলের টুকরো ছেঁড়া কাপড় পেল। কামেরো লাফাতে লাগল। তারপর চললোভড়ার এ ঘরের দিকে। কপাল মন্দ। ভাড়ার ঘরের মধ্যেই পড়ে ছিল রক্তভেজা আর একটা কম্বলের টুকরো। তাড়াতাড়িতে অসাবধানে ওটা পড়ে গিয়ে থাকবে। কামেরো এবার ভাঁড়ার ঘরের চারিদিকে তাকাতে-তাকাতে ঘুরতে লাগল। যে ময়দার বস্তার আড়ালে মাহাবো লুকিয়ে ছিল, কামেরো হঠাৎ সেইদিকে ছুটে গেল। সেনাপতি আর সৈন্যরাও ছুটলো। মাহাবো ধরা পড়ে গেল। আমরা গিয়ে মাহাবোকে ঘিরে দাঁড়ালাম। আমার বন্ধুদের কয়েকজনের হাতে তরোয়াল দেখে সেনাপতি একবার থমকাল। সৈন্যরাও কি করবে বুঝে উঠতে পারলো না। আমিও সেনাপতিকে বললাম–ওপরে ডেক-এ চলুন।
