রান্না চলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রান্না হয়ে গেল। ফ্রান্সিসরা উঠোনেই খেতে বসল। মাছ ঝোলতরকারি শাক দিয়ে ফ্রান্সিসরা মোটামুটি পেট পুরেই খেল।
ফ্রান্সিসরা শুয়ে বসে বিশ্রাম করতে লাগল।
বিকেল হল। মহিলাটির স্বামী ফিরল। হ্যারি গৃহকর্তার কাছে গেল। বলল–আমরা বিদেশী। আপনার বাড়িতে অতিথি হয়েছি। আপনার স্ত্রী আমাদের খেতে দিয়েছেন। আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। সন্ধ্যে হলেই আমরা চলে যাবো।
–রাতেও থেকে যেতে পারেন। গৃহকর্তা হেসে বলল।
–না। আমাদের তাড়া আছে। হ্যারি বলল।
শাঙ্কো কোমরবন্ধনী থেকে একটা সোনার চাকতি বের করে বলল–এটা আপনাকে নিতেই হবে।
-না-না। আপনারা অতিথি। ভদ্রলোক বললেন।
–তবু কিছু তো কেনাকাটা করতে হয়েছে। নিন। শাঙ্কো বলল।
–বেশ। দাও। গৃহকর্তা সোনার চাকতি নিল।
সন্ধ্যে হল। চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–আর দেরি নয়। ছোটো। রাজা কাদর্জার সেনাপতির রাজত্বে ছুটে আমরা দক্ষিণ দিকে চলে যাবো। সেখানে পাহাড়ি এলাকায় কোন গুহায় আশ্রয় নেব।
ফ্রান্সিসরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। তারপর অন্ধকারে ছুটল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা সৈন্যাবাসের কাছে এল। ফ্রান্সিসরা গলা চড়িয়ে বলল–কেউ দাঁড়িয়ে পড়বেনা। সমান গতিতে ছুটবে।
সৈন্যাবাস থেকে কয়েকজন সৈন্য অলস দৃষ্টিতে ফ্রান্সিসদের দৌড়ে যেতে দেখল। ফ্রান্সিসরা দৌড়ুচ্ছে কেন ওরা বুঝল না।
পাহাড়ি এলাকার কাছাকাছি এসেছে তখনই সেনাপতির একদল সৈন্যকে দক্ষিণ দিক থেকে আসতে দেখা গেল। সৈন্যদের কয়েকজন ফ্রান্সিসদের চিনল। ওরা নিরস্ত্র। খালি হাতে ফ্রান্সিসদের ধরতে এল। খালি হাতে লড়াই লেগে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন সৈন্য আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
ফ্রান্সিসরা আর দাঁড়ালনা। আবার ছুটতে শুরু করল। সৈন্যরা আর পিছু ধাওয়া করল না।
ম্লান জ্যোৎস্নায় পাহাড় জঙ্গল এলাকা দেখা গেল।
ফ্রান্সিস স্থির করেছিল পাহাড়ের কোন গুহায় ওরা আত্মগোপন করবে। দিনকয়েক অপেক্ষা করে রাজা পারকোনের খোঁজ করবে। রাজা পারকোনকে পেলে তার সৈন্যদের জড়ো করবে। নিজেরাও যুদ্ধের জন্য তৈরি হবে। রাজা কাদর্জা তার সেনাপতি আভিন্দাকে এই রাজ্যের রাজা করে দিয়ে গেছে। ফ্রান্সিস স্থির করল আভিন্দার সৈন্যদলকে আক্রমণ করবে। এখন ওরা নিশ্চিন্ত। এই সুযোগেই আক্রমণ করতে হবে।
ফ্রান্সিসরা ঝোঁপজঙ্গলের মধ্য দিয়ে পাহাড়টার ঢালের দিকে চলল। ওরা অনেকটা নিশ্চিন্ত ছিল যে বর্তমান রাজা আভিন্দার সৈন্যদের মুখোমুখি হতে হবেনা। ওরা নিশ্চিন্ত মনেই বনের মধ্য দিয়ে চলল। বনজঙ্গল শেষ হতেই ওদের থমকে দাঁড়াতে হল। সামনেই পাহাড়ের পাদদেশে রাজা আভিন্দার একদল সৈন্য বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে। এই আকস্মিক ঘটনায় নিরস্ত্র ফ্রান্সিসরা কী করবে বুঝে উঠতে পারল না।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–আমাদের হাতে অস্ত্র নেই। ওদের ওপর পাথর ছোঁড়ো। ভাইকিংরা সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে পাথরের টুকরো তুলে নিয়ে রাজা আভিন্দার সৈন্যদের দিকে ছুঁড়তে লাগল। এবার আভিন্দার সৈন্যরাও ফ্রান্সিসদের দিকে পাথর ছুঁড়তে লাগল। পাথর ছোঁড়াছুঁড়ি চলল। দুপক্ষেই কয়েকজন আহত হল।
শাঙ্কো আর বিস্কো পাহাড়ের ধার থেকে একটা বড় পাথরের চাই ঠেলে গড়িয়ে দিল। পাথরের চাই গড়িয়ে আভিন্দার সৈন্যদের ওপর পড়ল। সবাই সরে যেতেও পারল না। পাথরের চাঁই-এর নিচে চাপা পড়ে কয়েকজন সৈন্য মারা গেল। কিন্তু সৈন্যরা দলে ভারি। অল্পক্ষণের মধ্যেই দ্রুত ওরা ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস বুঝল–এখন লড়াই করতে যাওয়া বোকামি। ওদের হাতে লড়াইয়ের অস্ত্র নেই। লড়তে গেলে মরতে হবে। ততক্ষণে সৈন্যরা ফ্রান্সিসদের ঘিরে ফেলেছে। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল আত্মসমর্পণ কর। এছাড়া বাঁচার কোন উপায় নেই।
ভাইকিংরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হল। সৈন্যদের দলনেতা এগিয়ে এল। বলল– রাজবাড়ির দিকে চলো। কেউ পালাবার চেষ্টা করবে না।
সৈন্যরা ফ্রান্সিসদের ঘিরে নিয়ে চলল। সবাই বনের মধ্যে ঢুকল। ছাড়া ছাড়া গাছের বন। বনতল ততটা অন্ধকার নয়। এখানে ওখানে ভাঙা ভাঙা রোদ দেখা যাচ্ছে। যেতে যেতে হ্যারি বলল ফ্রান্সিস আবার বন্দীদশা।
–পালাবার উপায় বের করতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
-দেখ ভেবে। হ্যারি বলল।
সবাই চলল। যেতে যেতে দু’একজন ভাইকিং বন্ধু দেশীয় ভাষায় বলল ফ্রান্সিস–লড়াই করে পালাতে পারতাম।
–না। পারতে না। লড়াই করতে গেলে বেশ কিছু বন্ধুর প্রাণ যেত। আমি সেটা চাই না। সময়সুযোগ বুঝে ঠিক পালাবো। এখন বন্দীদশাই মেনে নাও। ফ্রান্সিস বলল।
সবাই চলল। রাস্তার লোকেরা ওদের দেখে একটু অবাকই হল। এই বিদেশীরা এখানে কেন?
সবাই পাথরের সিঁড়ি দিয়ে গর্ভগৃহে নেমে গেল। রাজসভার একপাশে ফ্রান্সিসদের দাঁড় করিয়ে রাখা হল। ফ্রান্সিস তখনও ভেবে পাচ্ছে না রাজা আভিন্দা ওদের নিয়ে কী করবে। বন্দী করে রাখবে না মুক্তি দেবে। তবে এটাও বুঝল মুক্তির সম্ভাবনা খুবই কম। ওদের কয়েদঘরেই পাঠানো হবে।
বিচারসভা শেষ। সৈন্যদের দলনেতা এগিয়ে গিয়ে রাজা আভিন্দাকে কিছু বলল। রাজা ফ্রান্সিসদের এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল।
