ফ্রান্সিস দ্রুত রানির কাছে গেল। বলল–মাননীয়া রানি কয়েদঘরের দরজা খুলেছি। আমরা পালাচ্ছি। আপনি অসুস্থ। কী করবেন?
–তোমাদের সঙ্গে ছুটোছুটি করতে পারবো না। আমি মন্ত্রীর বাড়িতে আত্মগোপন করবো। পরে আরো সৈন্য সংগ্রহ করে বুননদের তাড়াবো। রানি বললেন।
–তাহলে আমার বন্ধু আপনাকে মন্ত্রীর বাড়িতে পৌঁছে দেবে। চলুন। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে এল। দেখল মাঠে সব সৈন্য জড়াজড়ি করে পড়ে আছে। চাঁদের আলোয় দেখল বুনোদের রাজা একটা কাঠের সিংহাসনে চিৎপাৎ হয়ে পড়ে আছে।
ফ্রান্সিসরা খুব সাবধানে মাটিতে পড়ে থাকা সৈন্যদের গায়ে পা না ঠেকিয়ে মাঠটা পার হল।
ওদিকে শাঙ্কো রানিকে ধরে ধরে মন্ত্রীর বাড়ির দিকে চলল। রানি ছুটতে পারছিলেন না। যতটা দ্রুত সম্ভব চললেন। মন্ত্রীর বাড়ির সামনে এল দুজনে। শাঙ্কো আস্তে বলল ডাকাডাকি করা যাবে না বা দরজায় ধাক্কা দেওয়া যাবেনা–কোনরকম শব্দ করা চলবে না। নিশ্চয়ই পেছনের দিকে দরজা আছে। সেদিকে চলুন।
দুজনে পেছনের দরজার কাছে এল। শাস্কো দরজায় মৃদু টোকা দিল। কিন্তু ভেতরে কারো সাড়াশব্দ নেই।
এবার শাঙ্কো গলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ছোরাটা বের করল। দরজার ফাঁক দিয়ে ছোরাটা ঢোকাল। তারপর খুব জোরে ওপরের দিকে ছোরাটা টানল। খিল খুলে গেল।
–ঢুকে পড়ুন। শাঙ্কো বলল। রানি দ্রুত ঢুকে পড়ল। শাঙ্কো ছুটল ফ্রান্সিসদের ধরবার জন্যে।
সদর রাস্তায় এসে চাঁদের আলোয় দেখল ফ্রান্সিসরা বেশ দূরে চলে গেছে। শাঙ্কো প্রাণপণে ছুটল। কিছুক্ষণের মধ্যেইফ্রান্সিসদের ধরল।
এবার ভাইকিংরা দ্রুত ছুটতে লাগল। গভীর রাত। রাস্তা জনশূন্য। ফ্রান্সিসরা ছুটল।
ছুটতে ছুটতে ওরা গৃহকর্তার বাড়ির কাছে এল। শাঙ্কো বলল–চলোনা–এই গৃহকর্তার বাড়িতে বাকি রাতটা কাটিয়ে
পাগল হয়েছ। এই কালজেন ছেড়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালাতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা ছুটতে ছুটতে সেই বনভূমির কাছে এল। তারপর বনভূমিতে ঢুকে প্রায় নিকষ অন্ধকারে কিছুদূর গেল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–দাঁড়াও। এবার বিশ্রাম।
সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। এখানে ওখানে গাছের গুঁড়িতে ঘাসে ঝরাপাতায় সবাই বসে পড়ল। অনেকটা পথ ছুটে এসেছে। কমবেশি সবাই হাঁপাচ্ছে তখন।
হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস এবার কী করবে?
–এই অন্ধকারে বন পার হতে গেলে জখম হওয়ার সম্ভাবনা। তার চেয়ে দিনের বেলা–একটু আধটু আলো পাওয়া যাবে তখন পার হওয়াই নিরাপদ। ভোর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
সবাই ভোরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কেউ কেউ গাছের গুঁড়িতেই শুয়ে পড়ল। কেউ ঝরাপাতায়, কেউ ঘাসে।
ভোর হল। পাখিপাখালির ডাক শুরু হল। ফ্রান্সিসরা সজাগ হলো। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল চলো।
সবাই উঠে দাঁড়ালো। বনতল দিয়ে চলল। আবছা দেখা যাচ্ছে গাছের গুঁড়ি ডালপাতা। সেসবের মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সিসরা চলল।
হঠাৎই দেখল বিদ্রোহী পারেলাদের বড় ঘরটা পুড়ে ছাই হয়ে পড়ে আছে। ফ্রান্সিস দুঃখ পেল। ও মনেপ্রাণে পারেলাদের সাফল্য কামনা করল।
বনভূমি শেষ। ফ্রান্সিস একটু গলা চড়িয়ে বলল–আমরা ছুটে রাজা কাদর্জার রাজ্য পার হয়ে যাবো। কেউ দাঁড়িয়ে পড়বে না। প্রাণপনে ছুটবে। — ফ্রান্সিসের কথামতোই বন্ধুরা প্রাণপনে ছুটল। রাস্তার লোকজন দাঁড়িয়ে দেখল। এরা ছুটছে কেন?
রাস্তায় টহলরত কিছু সৈন্য ফ্রান্সিসদের চিনল। কিন্তু ওরা কী করবে বুঝে ওঠার আগেই ফ্রান্সিসরা অনেক দূরে চলে গেল। রাজা কাদর্জার রাজ্য জামিনা ষে হল।
এবার রাজা কাদর্জার সেনাপতির রাজত্ব।
তখন দুপুর। সবারই খিদে পেয়েছে। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস, চলো কারো বাড়িতে আশ্রয় নি। খেয়ে বিশ্রাম করে সন্ধ্যের সময় এই রাজত্ব পার হই।
ফ্রান্সিস একটুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল–তা মন্দ বলোনি। অন্ধকারে পার হয়ে যাবো।
–তাহলে একটা বাড়ি দেখি। শাঙ্কো বলল। তারপর এদিক ওদিক ঘুরে এসে আঙ্গুল দিয়ে একটা বড় বাড়ি দেখাল। বলল–ঐ বাড়িতেই চল।
ওরা ঐ বাড়ির দরজার কাছে এল। বাইরের দরজা খোলা। দেখল একজন মাঝবয়সীস্ত্রী লোক উঠোনে পাতা মোটা কাপড়ের ওপর বসে আসন বুনছে। দুটি ছেলেমেয়ে ছুটোছুটি করেছে।
দরজায় ফ্রান্সিসদের দেখে মহিলাটি একটু চমকালো। ফ্রান্সিসদের বিদেশী পোশাকই তার কারণ।
মহিলা দরজার কাছে এগিয়ে গেল। হ্যারি মহিলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বলল–মা, আমরা বিদেশি। সেই কানজেন রাজ্য থেকে আসছি। আমরা খুবই ক্ষুধার্ত। খাদ্য চাই। বিশ্রাম চাই। আপনি কি তার ব্যবস্থা করতে পারবেন?
একটু চুপ করে থেকে মহিলা বলল–আমার স্বামী তো কাজে গেছে। সে থাকলে ভাবতাম না। কিন্তু তোমরা বিদেশী অতিথি। তোমাদের কি না খাইয়ে ফেরাতে পারি? তোমরা উঠোনে বসো। আমি সব জোগাড়-টোগাড় করছি।
মহিলাটি উঠোনে আর একটা মোটা চাদর বিছিয়ে দিল। ফ্রান্সিসরা বসল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল।
মহিলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। তখনই একটি বড় মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ছোট ছেলেমেয়ের সঙ্গে খেলতে লাগল। ফ্রান্সিসরা কেউ কেউ ছেলেমেয়ে দুটিকে ডেকে নিয়ে আদর করল।
কিছুক্ষণ পর মহিলাটি ঝোলাভর্তি বোধহয় আলুটালু, আনাজ নিয়ে ঢুকল। বলল– তোমাদের ভাগ্য ভাল মাছ পেয়েছি।
