সেনাপতি রানির শয়নকক্ষে এল।
–আবার কী হল? রানি বলে উঠলেন।
হল অনেককিছু–সেনাপতি বলল–রাজার হুকুম আপনাকে কয়েদঘরে থাকতে হবে। সেনাপতি বলল।
–কী বললে? রানি ভীষণভাবে চমকে উঠে বসলেন।
রাজার হুকুম। আপনার রাজবাড়িতে থাকা চলবে না। সেনাপতি বলল।
–আমি যাবো না। রানি বললেন।
–তাহলে আপনাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হবে। রাজার হুকুম আমাকে তালিম করতেই হবে। সেনাপতি বলল।
–বেশ। জোর করেই নিয়ে যাও। রানি বললেন। রানির প্রহরীরা কয়েকজন সবই দেখছিল শুনছিল। তারা আশ্চর্য হয়ে গেল। তাদের সকলের মাননীয় রানিকে কয়েদঘরে থাকতে হবে?
সেনাপতি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। একটু পরে পাঁচ-ছ’জন সৈন্য নিয়ে ঢুকল। বলল– রানিকে কয়েদঘরে নিয়ে চলো। বুনো সৈন্যরাও একটু অবাক হলো। কিন্তু সেনাপতির নির্দেশ। মানতেই হবে।
ওরা বিছানার কাছে গিয়ে রানির ডানহাত ধরল। রানির বাঁ কাঁধে বর্শার ক্ষত। রানি একবার তার প্রহরীদের দিকে তাকালেন। কিন্তু কিছুবললেন না। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে সৈন্যদের কাছে গেলেন। তারপর হেঁটে চললেন। রানিকে ঘিরে সৈন্যরাও চলল।
কয়েদঘরের কাছে এসে দাঁড়ালেন। লোহার দরজার ফাঁক দিয়ে ফ্রান্সিসরা রানিকে দেখল। ওরা অবাক হয়ে গেল। রানি কয়েদঘরে থাকবেন?
ঢং-ঢং শব্দে কয়েদঘরের দরজা খোলা হল। রানি কয়েদঘরে ঢুকলেন।
ফ্রান্সিস ঘরের কোণার দিকে রানির জন্যে একটা জায়গা করে দিল। রানি বসলেন। একটু কষ্ট করেই বসতে হল। বাঁ কাঁধে বর্শার ক্ষত।
রানির থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস আর কোন কথা বলল না। নিজের জায়গায় চলে এল। হ্যারি বলল–বুনো রাজা বুনোর মতই এই কাণ্ড করল। রানিকে কয়েদঘরে ঢোকাল। রানি তো একজন মহিলা তাকে এই জঘন্য পরিবেশে বন্দী করে রাখা–কোনভাবেই এটাকে মেনে নেওয়া যায় না।
রানি ব্যাপারটাকে অত্যন্ত অপমানজনক মনে করলেন। নিজের তৈরি কয়েদঘরে নিজেই বন্দী। রানি মাথা নিচু করে চুপ করে বসে রইলেন।
ফ্রান্সিস তার আহত দুই বন্ধুর চিকিৎসার ব্যবস্থা করছিল। বৈদ্য তাদের ওষুধ দিয়েছিল। ওষুধ ক্ষতস্থানে লাগিয়ে বড়ি খেয়ে ওরা এখন অনেকটা সুস্থ।
বিকেলে বৈদ্য এল। কয়েদঘরে ঢুকে রানির ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে দিল। খাওয়ার জন্যে কয়েকটা বড়িও দিয়ে গেল। ফ্রান্সিসের বন্ধুদের খাওয়ার জন্যে কালো বড়ি দিয়ে গেল। ফ্রান্সিসদের বন্ধুদেরও জন্য কালো বড়ি দিয়ে গেল। রানি অনেকটা সুস্থ বোধ করতে লাগলেন।
একদিন পরে সন্ধ্যেবেলা বুনো সৈন্যদের খুব হৈ হল্লা শোনা গেল।
রাত হতেই হৈ-হল্লা বাড়ল। হুল্লোড় চলল।
প্রহরীরা রাতের খাবার দিতে এল। খেতে খেতে হ্যারি জিজ্ঞেস করল–এত হৈ হুল্লা কীসের ভাই?
–ব্বাঃ আমরা যুদ্ধে জিতেছিনা। যুদ্ধজয়ের উল্লাস আনন্দ চলছে। দেশ থেকে পাঁচ পিপে আরক আনা হয়েছে। একটু পরেই নেশার আরক খাওয়া শুরু হবে।
প্রহরীরা চলে গেল। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস বুঝলে কিছু?
–হ্যাঁ। বুঝলাম সৈন্যরা নেশাটেশা করবে। ফ্রান্সিস বলল।
–আমাদের পালানোর সুবর্ণ সুযোগ। বুনোদের নেশার আরক। মানে সাংঘাতিক নেশার জিনিস। আরক খেলে কেউ উঠে দাঁড়াতে পারবে না। হ্যারি বলল।
উত্তেজনায় ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। চাপাস্বরে বলল–ভাইসব, মুক্তির উপায় পেয়ে গেছি। ঘটনা আমাদের স্বপক্ষে এলে আমরা অনায়াসে পালাতে পারবো।
ওদিকে সৈন্যদের হৈ-হল্লার শব্দ স্থিমিত হয়ে এল।
কিছুপরে চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নেশার আরক খেয়ে সৈন্যরা সব মাঠে গাদাগাদি হয়ে পড়ে আছে। এমন কি প্রহরী দুজনও কয়েদঘরের সামনে খোলা তরোয়াল হাতে শুয়ে পড়েছে। বোঝাই যাচ্ছে নেশার আরক সবাই খেয়েছে।
ফ্রান্সিস দরজার কাছে গেল। দেখল চাবিওয়ালা পাহারাদারটি লম্বালম্ফিপড়ে আছে। অনড়। কোমরে চাবির গোছা। ফ্রান্সিস দরজার ফাঁক দিয়ে হাত বাড়াল। প্রহরীটিকে ধরতে পারল না। কিন্তু প্রহরীটিকে ধরতে না পারলে চাবির গোছা পাওয়া যাবে না।
বন্ধুরা অনেকেই এসে তখন দরজার কাছে দাঁড়িয়েছে। সবাই উত্তেজিত। পালাবার সুযোগ এসেছে।
–হ্যারি, প্রহরীটাকে কী করে কাছে আনা যায়? ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি বলল–শাঙ্কো–খাবার দেবার আগে প্রহরীরা একটা লোহার দিয়ে দরজায় ঘা দেয়–ঐ ডাটা নিয়ে এসো।
শাঙ্কো দ্রুত দরজায় ঝোলানো লোহার ডা’টা নিয়ে এল। হ্যারি ডাটা দেখে লাফিয়ে উঠল। বলল–ফ্রান্সিস যা চেয়েছি ঠিক পেয়ে গেছি।
–ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলো। ফ্রান্সিস বলল।
-বুঝলে না? ডাটার মাথাটা দেখ বাঁকানো। ডাটা দরজার ফাঁক দিয়ে বের করে বাঁকানো মাথাটা চাবিওয়ালা প্রহরীর কোমরের ফেট্টিটায় আটকে নাও। তারপর ওকে। টেনে টেনে দরজার কাছে নিয়ে এসো। তখন চাবি হাতের মুঠোয়।
ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বললসাবাস হারি।
ফ্রান্সিস কাজে লাগল। লোহার ডাটা দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে বের করল। তারপর চাবিওয়ালা প্রহরীর কোমরের ফেট্টিতে আটকে টানতে লাগল। আস্তে আস্তে প্রহরীর শরীরটা দরজার কাছে আসতে লাগল। তারপর একেবারে নাগালের মধ্যে। ফ্রান্সিস চাবি খুঁজতে লাগল। শাঙ্কো বলল–আমি দেখেছিদরজার চাবিটা। শাঙ্কো সবচেয়ে বড় চাবিটা দেখাল। প্রহরী জড়ানো গলায় কী বলল। উঠতে পারল না।
এবার দরজা খোলা। ফ্রান্সিস ভেতর থেকেহাত বাড়িয়েতালায় চাবি ঢোকাতেলাগল। একটু এদিক ওদিক করতে চাবি ঢুকে গেল। ফ্রান্সিস ডানদিকে মোচড় দিল। তালা খুলে ঝুলে রইল!
