ওদিকে কোন বুনো সৈন্যের ছোঁড়া বর্শা রানি ইরিনার কাঁধে লাগল। রানি তরোয়াল ফেলে হাত দিয়ে কাঁধ চেপে ধরলেন। রক্ত পড়তে লাগল।
দু’তিনজন সৈন্য রানি ইরিনাকে ধরে ধরে লড়াইয়ের জায়গা থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল। সভাঘরের বারান্দায় রানিকে শুইয়ে দিল। একজন সৈন্য কোমরের ফেট্টি খুলে রানির ক্ষতস্থানে বেঁধে দিল। রক্ত পড়া বন্ধ হল।
রানির আহত হওয়ার সংবাদে রানির সৈন্যদের একাংশ কেমন মুষড়ে পড়ল। লড়াইয়ে আর মন নেই যেন। বুনো সৈন্যরা এই সুযোগ কাজে লাগল। পূর্ণোদ্যমে আক্রমণ চালাল। রানির সৈন্যরা হেরে যেতে লাগল।
অভিজ্ঞ ফ্রান্সিস বুঝল জেতার আশা নেই। রানির সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে শুরু করল। কিছু সময় পরে যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি স্পষ্ট হল। চারদিকে প্রচুর বুনন সৈন্যরা। রানির সৈন্যরা নেই বললেই চলে।
ফ্রান্সিস হাতের তরবারি মাটিতে ফেলে গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–আর লড়াই নয়। অস্ত্রত্যাগ কর।
বুনোরা যুদ্ধজয়ের আনন্দে আত্মহারা। নিরস্ত্র ফ্রান্সিসদের আক্রমণ করল না। একদল বুনো সৈন্য ফ্রান্সিসদের ঘিরে ধরল। ফ্রান্সিসরা আত্মসমর্পণ করল। বুনোরা ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল রানির কয়েদঘরের দিকে। যেতে যেতে হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস, আবার কয়েদঘর। বুনোরা আমাদের নিয়ে কী করবে জানি না। এবার পালানোর পরিকল্পনা।
–সেটা আমি আগে থেকেই ভাবছি। একটা আশাবুনোরা বোধহয় আমাদের হত্যা করবে না। শুধু বন্দী করে রাখবে। ফ্রান্সিস বলল।
–কিছুই বলা যায় না। ওদের মতলব এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। হ্যারি বলল।
–দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।
রানির কয়েদঘরের বেশ বড়। আগে থেকেই কিছু বন্দী ছিল। তাদের হাতপা বাঁধা নয়। ফ্রান্সিস বলল–হয়তো আমাদেরও হাত-পা বাঁধবে না। ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরের ঘাসের বিছানায় বসল। শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস, যে করেই হোক পালাতে হবে।
সর্ব দেখিটেখি। তারপর পালানোর উপায় ভাববো। ফ্রান্সিস বলল।
কয়েদগরের লোহার দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বুনো সৈন্যরা খোলা তরোয়াল হাতে কয়েদঘর পাহারা দিতে লাগল।
ওদিকে কয়েকজন প্রহরী রানি ইরিনাকে ধরাধরি করে অন্তঃপুরে নিয়ে গেল। বিছানায় শুইয়ে দিল। রানি ব্যথায় গোঙাতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পরে বৈদ্য এল। রানির চিকিৎসা শুরু হল।
বুনোদের আহত রাজাকে বারান্দায় শুইয়ে দেওয়া হল।
বুনো রাজা সেনাপতিকে ডেকে পাঠাল। সেনাপতি বুনো রাজার কাছে এল। রাজা বলল–রানিকে যে বৈদ্য চিকিৎসা করতে এসেছে তাকে ধরে নিয়ে এসো। সে আমারও চিকিৎসা করবে।
সেনাপতি অন্তঃপুরের দিকে চলল।
রানির প্রহরীরা সেনাপতিকে বাধা দিতে সাহস পেল না। বৈদ্য তখন রানির ক্ষতস্থানে সবজে রঙের আঠালো একটা ওষুধ লেপে দিচ্ছিল।
রানির শয়নকক্ষে ঢুকে সেনাপতি দেখল–বৈদ্য রানির শয্যার পাশে বসে আছে। বুনো সেনাপতিকে দেখে রানি উঠে বসতে গেল। বৈদ্য বলল–এখন নড়াচড়া করবেন না। রানি বুনো সেনাপতিকে বলল–এখানে কী চাই? প্রহরী? প্রহরীর এগিয়ে এল। কিন্তু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
সেনাপতি বলল–আপনি তো এখন আমাদের বন্দিনী। আমরা যা বলবো আপনি, তাই শুনতে বাধ্য। তবে আমি আপনার কাছে আসিনি। আমাদের রাজাও আহত। ঐ এক ভাইকিং দস্যুর অস্ত্রাঘাতে। তার চিকিৎসার জন্য বৈদ্যকে নিয়ে যেতে এসেছি।
–ও। রানি আর কিছু বললেন না। সেনাপতি বৈদ্যকে বলল চলুন। বৈদ্য উঠে দাঁড়াল। বলল–চলি মাননীয়া রানি। যে ওষুধগুলো দিয়ে গেলাম নির্দেশমত খাবেন। ভয়ের কিছু নেই। এক সপ্তাহের মধ্যে ঘা শুকোতে থাকবে। অল্পদিনের মধ্যেই ভালো হয়ে যাবেন। বৈদ্য সেনাপতির সঙ্গে রানির শয়নকক্ষ থেকে বেরিয়ে এল।
সভাঘরের বারান্দায় সেনাপতির পেতে দেওয়া মোটা চাদরের ওপর বুনো রাজা শুয়েছিল। বৈদ্যকে দেখে উঠে বসল। সৈন্য পাশে বসল। বুনো রাজার ক্ষতস্থান দেখতে লাগল। বলল, দেখছি রক্ত এখনও চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। যাকগে–আমি রক্তপড়া বন্ধ করে দিচ্ছি।
বৈদ্য কাঁধ থেকে ঝোলা নামল। ঝোলায় হাত ঢুকিয়ে একটা কাঁচের বোতল বের করল। বোতলে কালো কালো বড়ি। সেনাপতিকে বলল–জল আনুন। সেনাপতি প্রায় ছুটে গেল। একটু পরেই কাঠের গ্লাশে জল নিয়ে এল। বৈদ্য বলল–মাননীয় রাজা–এই বড়িটা খেয়ে ফেলুন। বুনো রাজা বড়িটা খেল।
বৈদ্য এবার রানিকে যে ওষুধ দিয়েছিল সেটাই সেনাপতিকে দিল। একটা ন্যাড়ায় বাঁধা বড়িগুলো সেনাপতি নিল। রানির ক্ষতস্থানে যে ওষুধ লাগিয়েছিল সেই ওষুধই বুনো রাজার ক্ষতস্থানেও লাগিয়ে দিল। বুনো-রাজা একটু ঝাঁকিয়ে উঠে চুপ করে গেল।
সন্ধ্যে হয়ে এল। বুনো রাজা সেনাপতিকে ডাল। সেনাপতি এলে বলল–এখন আমার অনেক ভালো বোধ হচ্ছে। আমি দেশে ফিরে যাবো।
–অসুস্থ শরীরে পারবেন? সেনাপতি বলল।
–হ্যাঁ পারবো। এবার তোমাকে কী করতে হবে বলি। রানি কোথায় আছে?
–অন্তঃপুরের শয়নকক্ষে। সেনাপতি বলল।
–রানিকে কয়েদখানায় ঢোকাও। বুনো রাজা বলল।
–কিন্তু অন্তঃপুরে থাকলেও তো একরকম বন্দিনীই থাকবে। সেনাপতি বলল।
উঁহু। –যে কোন মুহূর্তে প্রহরীদের সাহায্যে পালাতে পারবে। কয়েদঘরই উপযুক্ত জায়গা। বুনো রাজা বলল।
–কিন্তু ঐ কয়েদঘর-সেনাপতি আমতা আমতা করে বলল।
-আরে, রানি আর রানি নেই। যুদ্ধে হেরে এখন তো সাধারণ মানুষ। যেখানে থাকতে বলবো সেখানেই থাকতে হবে। তুমি যাও রানিকেকয়েদঘরে নিয়ে যাও। বুনো রাজা বলল।
