বলুন কী উপকার। ওকাজা বলল।
–রাজা পারকোনকে রাজা কাদর্জার হুকুমে চাবুক দিয়ে মারা হয়েছিল। পিঠে ঘাটা সেরেছে কিন্তু দুর্বলতাটা যায় নি। যদি ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করে দাও।
–নিশ্চয়ই। ওকাজা বলল। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কিছু পরে ওকাজা এক বৃদ্ধকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এল। বৃদ্ধের কাঁধে ঝুলছে বুনো লতা দিয়ে তৈরি ঝোলা। বোঝা গেল এই বৃদ্ধই বৈদ্য।
ফ্রান্সিস বৃদ্ধকে রাজা পারকোনের কাছে নিয়ে গেল। চাবুক মারার কথা বলল। বৃদ্ধ চুপ করে সব শুনল। তারপর রাজার পিঠের ছেঁড়া পোশাক সরিয়ে দেখল। বলল– ভেতরে এখনও ঘা আছে। সম্পূর্ণ সারে নি।
বৈদ্য ঝোলার মুখ খুলল। কয়েকটা শুকনো পাতা বের করল। রাজার পিঠে চেপে চেপে বসিয়ে দিল। পাতাগুলো চেপ্টে লেগে রইল। বৈদ্য তারপর ঝোলা থেকে একটা ছোটো চিনেমাটির বোয়াম বের করল। বোয়াম থেকে চারটে কালোবড়ি বের করল। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল–এখন একটা বড়ি খাইয়ে দিন। কাল থেকে দৈনিক একটা করে বড়ি খাবে। দিন দশেকের মধ্যে আগেরশক্তি ফিরে পাবেন। বৈদ্য চলে গেল।
তৃষ্ণার্ত ফ্রান্সিসরা জল খেল। এবার খিদে। হ্যারি সেকথা ফ্রান্সিসকে বলল। ফ্রান্সিস ওকাজাকে ডাকল। ওকাজা কাছে এলে বলল–সেই সকালে কিছু খেয়েছি। এখনো কিছু খাওয়া জোটে নি।
–কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাদের খেতে দেওয়া হবে। সকাল থেকে কী কষ্ট হয়েছে। আপনাদের তা তো আমরা জানি। ওকাজা চলে গেল।
কিছু পরে ওকাজা এল। গলা চড়িয়ে বলল–আপনাদের খেতে দেওয়া হচ্ছে।
এবার ফ্রান্সিস ভালো করে চারদিকে দেখল। অনেক যুবক শুয়ে বসে আছে। ঘরের এককোণে জলের জালা। অন্য কোনে তরোয়ালের স্তূপ। বর্শাও রয়েছে।
প্রত্যেকের সামনে লম্ফটে পাতা পেতে দেওয়া হল। কম পোড়া তিনকোণা রুটি আর তরিতরকারির ঝোল। একটা করে ঝোলসহ মাছের টুকরোও দেওয়া হল। ক্ষুধার্ত ফ্রান্সিসরা চেটেপুটে খেল।
রাত হল। সারাদিনের উত্তেজনায় ক্লান্ত ফ্রান্সিসরা ঘুমিয়ে পড়ল।
একটু বেলায় ঘুম ভাঙল ফ্রান্সিসের। হাতমুখ ধুয়ে এসে সকালের খাবার খেতে বসল। হ্যারি পাশে এসে বসল। বলল–
-এখন কী করবে?
–কিছুই ভেবে উঠতে পারছি না। কয়েকটা দিন এখানে বিশ্রাম নেব। তারপর যা করবার করবোফ্রান্সিস বলল।
খেয়েদেয়ে শুয়ে বসে কয়েকদিন কাটাল।
সেদিন ফ্রান্সিস ওকাজাকে কাছে ডাকল। বলল,
–ওকাজা আমরা এখন কী করবো বুঝে উঠতে পারছি না। রাজা পারকোনের রাজত্ব চালাচ্ছে রাজা কাদর্জার সেনাপতি। ওখানে যাওয়া যাবেনা। এখানে তো থাকা যাবেইনা।
–এক কাজ করতে পারেন। উত্তর দিকে একটা দেশ আছে কানজেন। রাজা নয় রানি ইদিন ঐ দেশের প্রধান। মন্ত্রী অমাত্যের সহায়তায় রাজত্ব চালায়। খুব বুদ্ধিমতী। কানজেন-এ আশ্রয় নিতে পারেন। তারপর আমরা এই জামিনায় আমাদের শাসন কায়েম করতে পারলে এখানে চলে আসবেন। ততদিন কানজেন-এ থাকুন।
ফ্রান্সিস এই নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলল। হ্যারি বলল–ওকাজা ভালো বুদ্ধিই দিয়েছে। কানজেনেই চলো। আশ্রয়, আহার দুটোই মিলবে। রাজা কাদর্জার রাজত্ব শেষ। হলেই আমরা চলে আসবো।
বনজঙ্গল গাছগাছালি কেটে এখানে ঘর বানানো হয়েছে। চারিদিকে গাছ। কাজেই ঘরটা দৃষ্টির আড়ালেই থাকে। কিন্তু দূর্ভাগ্য ওকাজাদের আর ফ্রান্সিসদের।
তখন দুপুরের খাওয়া সেরে শাঙ্কো ঘরটার বাইরে একটু দূরে একটা গোড়া কাটা গাছের গোড়ায় বসেছিল। হঠাৎ শুকনো পাতাডাল ভাঙার শব্দে ফিরে তাকাতেই দেখে দুজন রাজা কাদর্জার সৈন্য। সৈন্য দুজন হতবাক। শাঙ্কোরও মুখে কথা নেই। শাঙ্কো সেই অবস্থাটা কাটিয়ে উঠল। দ্রুত ছুটল সৈন্য দুজনের দিকে। সৈন্য দু’জন তখন পালাতে ব্যস্ত। শাঙ্কো মাথা নিচু করে পোশাকের নিচ থেকে ছোরাটা বের করল। তারপর একটা সৈন্যকে লক্ষ্য করে ছোরা ছুঁড়ল। পরিষ্কার হাত শাঙ্কোর। ছোরাটা সৈন্যটির গলায় গেঁথে গেল। ও বসে পড়ল। শাঙ্কো অন্যটির দিকে ছুটে গেল। কিন্তু সেই সৈন্যটি লাফ দিয়ে সরে গেল। তারপর গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে ছুটে পালিয়ে গেল।
এবার সমূহ বিপদ। এই ঘরের কথা রাজা কাদর্জার কাছে গোপন থাকবেনা। নিশ্চয়ই নতুন সেনাপতিকে সৈন্যসহ পাঠাবে এই ঘরের খোঁজে। শাঙ্কো ভাবল এসব। ও দ্রুত পারেলার কাছে গেল। ঘটনাটা বলল। পারেলা তখন গলা চড়িয়ে বলল-কাদর্জা এই আস্তানর খোঁজ পেয়ে যাবে। এক মুহূর্তও দেরি না। সব অস্ত্রশস্ত্র জঙ্গলে লুকিয়ে রাখো। তারপর যে যেদিকে পারো পালাও। আমরা সংখ্যায় কম। লড়াই করবো না। সাত দিন। পরে সবাই এখানে চলে আসবো।
পারেলার দলের লোকেরা তরোয়াল বর্শা সব জঙ্গলে লুকিয়ে ফেলল। তারপর যে যেদিকে পারল পালালো।
ফ্রান্সিস জোরে বলল–ভাইসব–উত্তরদিকে পালাও।
ফ্রান্সিসরা উত্তরমুখো ছুটল। কিছুদূর যাবার পর পেছনে কার্জার সৈন্যদের চিৎকার ডাকাডাকি শুনল। ফ্রান্সিস জোরে বলল-জলদি।
একসময় ফ্রান্সিসরা বনভূমি থেকে বেরিয়ে এল। সামনে বিস্তৃত প্রান্তর। ফ্রান্সিসরা দ্রুত ছুটল। বনের বাইরে এসে কাদর্জার সৈন্যরা ওদের দেখে ফেলতে পারে।
প্রান্তর শেষ। সামনে বাড়িঘরদোর। জনবসতি। কাঠপাথরে তৈরি প্রথম বাড়িটার কাছে এল ওরা। বন্ধুরা অনেকেই হাঁপাতে হাঁপাতে মাটিতে বসে পড়ল।
ফ্রান্সিসও ভীষণ হাঁপাচ্ছে তখন। কথা বলতে পারছে না। একটুক্ষণ দম নিয়ে ফ্রান্সিস বাড়ির সামনের দরজাটার কাছে এল। দেখল দরজা খোলা।
