প্রহরীরা দল বেঁধে দুহাত বাঁধা ফ্রান্সিসদের সারি বেঁধে নিয়ে আসছে।
রাজা অনেক আগেই এসে গেছে। মঞ্চের মুখোমুখি একটা সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। তার নিচে রাজার সিংহাসন এনে পাতা হয়েছে। রাজা এল। তার সাজসজ্জার বহর কত। মাথায় বোধহয় নতুন মুকুটটা রোদ পড়ে ঝকঝক্ করছে। গায়ে সোনালি-রূপালি কাজ করা আলখাল্লার মত।
ফাঁসি দেখতে খুব বেশি লোক আসে নি। এই ঘৃণ্য ঘটনা দেখার আগ্রহ অনেকমানুষেরই নেই। তবু রাজার উৎসাহে কমতি নেই। হাত-পা নেড়ে দলপতিকে নানা নির্দেশ দিচ্ছে। লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবারই লক্ষ্য ফাঁসির মঞ্চ।
ফ্রান্সিসরা সার বেঁধে আসছে।
হঠাৎ ওকাজা কোত্থেকে ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। হাত বাঁধা ফ্রান্সিস মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ল। ওকাজা ফ্রান্সিসদের হাত ধরে তুলতে তুলতে বিড় বিড় করে বলল–আগুন-মঞ্চ পল্কা–পেছনে জঙ্গল।
ওকাজা এক ছুটে চলে গেল। ফ্রান্সিস চোখ বুজে যীশুকে স্মরণ করল। গলা চড়িয়ে দেশীয় ভাষায় বলল–সবাই পালাবার জন্য তৈরী থাকো। পেছনের জঙ্গলে আত্মগোপন।
ফ্রান্সিসরা মঞ্চে উঠল। ফাঁসুড়েরা ফ্রান্সিসদের ওপর থেকে ঝোলানো ফাঁসগুলোর ঠিক নিচে দাঁড় করিয়ে দিতে লাগল। হঠাৎ মঞ্চের পেছনের শুকনো ডালপাতায় কোত্থেকে একটা জ্বলন্ত মশাল উড়ে এসে পড়ল। শুকনো ডালপাতায় সঙ্গে সঙ্গে আগুন জ্বলে উঠল। ফাঁসুড়েরা হতবাক। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। আগুন মঞ্চেও ছড়াল। দর্শকদের মধ্যে ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেল। হঠাৎমঞ্চ ডানদিকে একেবারে কাত হয়ে মাটি ছুঁল। প্রহরীরা, সৈন্যরা এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে। পীপেভর্তি জল আনছে আগুন নেভাবার জন্যে। হঠাৎ রাজার মাথার ওপরের সামিয়ানা ভেঙে পড়ল। ফ্রান্সিসরা কাত হওয়া মঞ্চ থেকে মাটিতে পড়ে গেল। শাঙ্কো রাজা পারকোনকে কাঁধে তুলে নিয়ে জঙ্গ লের দিকে ছুটল। এবার ফ্রান্সিসরাও ছুটল।
সৈন্যরা তরোয়াল উঁচিয়ে ছুটে আসতে লাগল। সৈন্যরা জঙ্গলের কাছে পৌঁছোবার আগেই ফ্রান্সিসরা বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল। গভীর বন। সৈন্যরা ওদের খুঁজে বের করতে পারবেনা।
ফ্রান্সিসরা গাছগাছালির নিচে দিয়ে চলল। কিন্তু দুহাত বাঁধা থাকায় খুবই অসুবিধে হচ্ছিল। মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে ফ্রান্সিসরা বেশ কিছুদূরে এল।
সবাই হাঁপাতে লাগল। বেশ কষ্ট করে রাজা পারকোন ফ্রান্সিসদের সঙ্গে সঙ্গে এল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল
–সবাই বসে পড়ল। বিশ্রাম নাও। সবাই এখানে ওখানে বসে পড়ল।
শাঙ্কো ফ্রান্সিসদের কাছে এল। মাথা নিচু করে ফ্রান্সিসকে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর বুকের কাছ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে জামার তলা থেকে ছোরাটা বের করল। তারপর ঘষে ঘষে শাঙ্কোর হাতের দড়ি কেটে দিল। ছোরা নিয়ে এবার শাঙ্কো একে একে সকলের হাতের দড়ি কেটে দিল। হাত খোলা পেয়ে ফ্রান্সিসদের অস্বস্তি কাটল।
হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–এখন কী করবে?
-বুঝতে পারছি না। এই বনটা তো পার হয়ে যাই। তারপরে নিশ্চয়ই লোকজনের বসতি পাব।
–হ্যাঁ। এ ছাড়া তো কোন উপায় নেই। হ্যারি বলল।
হঠাৎ সামনের দিকে শুকনো ডালপাতা ভাঙার শব্দ উঠল। সকলেই শুনল সেটা। ফ্রান্সিস কান খাড়া করল। শব্দটা সামনে থেকেই আসছে।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–সবাই লড়বার জন্য তৈরি হও। রাজা কাদর্জার সৈন্যরা বোধহয় আসছে। নিরস্ত্র অবস্থাতেই লড়বো আমরা। আর বন্দী হব না।
ডালপাতা ভাঙার শব্দ কাছে এল। সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে তখন। শুধু রাজা পারকোন বসে আছে। এক্ষুনি উঠে দাঁড়াবার শক্তি নেই।
তিনজন লোক গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। ওকাজা!
ফ্রান্সিস হেসে বলল–ওকাজা সময়মতই এসেছে। আমরা কী করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
–আপনারা আমার সঙ্গে আসুন। ওকাজা বলল।
–কোথায় যাবো? ফ্রান্সিস বলল।
–বিদ্রোহীদের আস্তানায়। আসুন। ওকাজা বলল।
ওকাজারা সামনে এগিয়ে চলল। ফ্রান্সিসরা পেছনে পেছনে চলল। এই দিনের বেলাও বনতল অন্ধকার। সাবধানে পা ফেলে চলতে হচ্ছে। নইলে আছাড় খাওয়ার সম্ভাবনা।
বেশ কিছুটা যেতে গাছগাছালির আড়ালে ফ্রান্সিসরা দেখল একটা বড় ঘর। সবটাই কাঠের। ফ্রান্সিসরা ওকাজার পেছনে পেছনে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ঘর থেকে এক বলিষ্ঠ যুবক বেরিয়ে এল। মুখে দাড়ি গোঁফ। খুব বুদ্ধিদীপ্ত চোখমুখ। বলল-ওকাজার কাছ থেকে আপনাদের কথা শুনেছি। ফাঁসির হাত থেকে বেঁচে এসেছেন। আপনাদের মনের অবস্থা বেশ বুঝতে পারছি। ভেতরে আসুন।
ফ্রান্সিসরা ঘরটায় ঢুকল। ওকাজা ফ্রান্সিসদের কাছে এল। নিম্নস্বরে বলল–ঐ যুবকটিই পারেলা। বিদ্রোহীদের নেতা। ফ্রান্সিস পারেলার কাছে গেল। হাত বাড়িয়ে করমর্দন করল। বলল–রাজা কাদর্জার মতনরপশুর সন্ত্রাসের রাজত্ব আপনারা শেষ করুন।
–আমরা সেই চেষ্টাতেই আছি। পারেলা বলল।
ফ্রান্সিস টানা পাতা দড়ি দিয়ে শুকনো ঘাস বুনে তৈরি বিছানায় বসল। হ্যারিরাও বসল। হ্যারি বলল
–ফ্রান্সিস–রাজা পারকোনের চিকিৎসার ব্যবস্থা এখানে কর। পিঠের ঘাটা শুকিয়ে গেছে কিন্তু দুর্বলতাটা এখনও যায় নি।
–ঠিক বলেছো। ফ্রান্সিস বলল। তারপর ওকাজাকে ডাকল। ওকাজা এল। ফ্রান্সিস বলল–ওকাজা–একটা উপকার যে করতে হয়।
