ফ্রান্সিস ডাকল—কেউ আছেন? কোন সাড়াশব্দ নেই। আবার ডাকল–কেউ আছেন?
–কে? ভেতর থেকে শোনা গেল। একটু পরে একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে এল। পাকা দাড়ি গোঁফ। গায়ে ঢোলা জামা।
ফ্রান্সিস বলল–আমরা বিদেশী ভাইকিং। এদেশে ঘটনাচক্রে এসেছি। রাজা কাদর্জা আমাদের ফাঁসি দিতে চেয়েছিল। অনেক কষ্টে আমরা পালিয়ে এসেছি।
–রাজা কাদর্জা? ওতো সাংঘাতিক মানুষ। বৃদ্ধ বলল।
হ্যাঁ, আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি। যা হোক আমরা এখন এখানে আশ্রয় চাই। খাদ্যও চাই। ফ্রান্সিস বলল।
তখনই বাড়ি থেকে এক যুবক বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিসদের দেখে একটু অবাকই হল। এতজন বিদেশি। হ্যারি বলল–এটা বোধহয় রানি ইচিনার রাজত্ব?
–হ্যাঁ। যুবকটি বলল–কিন্তু আপনারা?
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে সবই বলল। যুবকটি বলল–তাহলে আপনারা এখন কী চান?
–আমরা আপনার বাড়ীতে আশ্রয় চাই। খাদ্যও চাই। ফ্রান্সিস বলল।
–তা দেব কিনা বাবা বলুক। যুবকটি বলল।
–এরা আশ্রয়হীন। বিপদগ্রস্ত। এদেশ ওদের কাছে বিদেশ। কোথায় আর আশ্রয় পাবে? আমাদের বাড়ীতেই থাকুক। বৃদ্ধ বলল।
–তুমি রাজি হলে আমার আপত্তি নেই। যুবকটি বলল–তবে বেশিদিন আপনাদের আশ্রয় ও খাদ্য দিতে পারবো না।
–না-না। আজকের রাতটা। কাল আমরা রানির দরবারে যাবো। আশ্রয় খাদ্য চাইবো। মনে হয় উনি ব্যবস্থা করে দেবেন। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। আপনারা থাকুন। তবে ছোট ঘর। আপনাদের কষ্ট হবে। বৃদ্ধ বলল।
–আমরা কয়েদঘরে থেকে অভ্যস্ত। আমাদের কোন কষ্ট হবে না। হ্যারি বলল।
ঘরের জিনিসপত্র সরানো হল। ভাইকিংরা যুবকটিকে সাহায্য করল।
ফাঁকা ঘরে মোটা কাপড় পেতে দেওয়া হল। ফ্রান্সিসরা বসল। রাজাপারকোন শুয়ে পড়লেন। ফ্রান্সিস পারকোনের কাছে এল। বলল–এখন নিজেরহারানো রাজ্যে ফিরে যেতে পারবেন?
–তোমাদের পোশাক পরে বনভূমি পার হয়ে চলে যেতে পারবো। এখন শরীরে জোর হয়েছে। তবে শাঙ্কো যদি আমাকে বনভূমিতে পৌঁছে দেয় তাহলে ভালো হয়। রাজা পারকোন বললেন।
–ঠিক আছে। শাঙ্কো আপনাকে নিয়ে যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
রাতে ফ্রান্সিসদের খেতে দেওয়া হলো। আনাজের তরকারী মাছের ঝোলমত। পরিষ্কার রুটি। ক্ষুধার্ত ফ্রান্সিসরা পেট পুরে খেল।
শাঙ্কো রাজা পারকোনকে নিয়ে রওনা হল। রাজা পারকোন সকালের খাবার খেল। বললেন–ফ্রান্সিস তোমার কাছে ঋণী রইলাম।
ফ্রান্সিস রানির বাড়ির দিকে চলল। যুবকটিই ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এল।
রানির পাথরের বাড়ি খুব বড় নয়। তবে দেখতে সুন্দর। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস, রানি যদি আশ্রয়, খাদ্য না দেয় তবে খুবই বিপদে পড়বে।
–না, না। বলবো আমরা কিছুদিন থাকবো প্রয়োজনে আপনার হয়ে লড়াই করব। ফ্রান্সিস বলল।
আবার পরের হয়ে লড়াইয়ে নামবে? শাঙ্কো বলল।
–এক্ষুনি তো আর লড়াই হচ্ছে না। আমরা যে তার সহায় এটা তো বোঝাতে হবে। নইলে আমাদের গুরুত্ব কী? ফ্রান্সিস বলল।
–দেখো বলে। হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিসরা সভাঘরে ঢুকল। অনেকেই ওদের দিকে তাকিয়ে দেখল। এই বিদেশিরা কোত্থেকে এল? প্রহরীরা ফ্রান্সিসদের আটকালো না। কাঠের সিংহাসনে রানি ইরিনা বসে আছেন। দুপাশেমন্ত্রী ও অমাত্যরা। ঘরটায় তেমন আলো ঢোকে নি। রানি বিচার করছেন। রানির মাথায় মুকুট। পরনে ঝলমলে পোশাক। দেখতে সুন্দরী। চেহারায় ব্যক্তিত্ব আছে।
একটা বিচার শেষ হল। ফ্রান্সিসরা ততক্ষণে রানির নজরে পড়েছে। সভাঘরে ভর্তি লোক। বোঝা গেল রানি জনপ্রিয়। হয়তো তার সুশাসনই তাঁকে জনপ্রিয় করেছে।
ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল। বিচার চলল।
বেশ কিছুক্ষণ বিচার চলার পর বিচারপর্ব শেষ হল। রানি হাততালি দিলেন। আস্তে আস্তে সভার লোকজন বেরিয়ে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে বিচারসভা নির্জন হল। ফ্রান্সিসরা তখনও দাঁড়িয়ে। এবার রানি ফ্রান্সিসদের দিকে তাকালেন। হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করলেন।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে ফ্রান্সিস বলল– আপনার কাছে আমাদের কিছু নিবেদন ছিল।
–বলো কী নিবেদন? রানি বললেন। তখন ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে সব ঘটনা বলল।
–ও। রাজা কাদর্জা তো একটা সাক্ষাৎ শয়তান। দু’দুবার এই কালজেন আক্রমণ করেছিল। আমরা তাড়িয়ে দিয়েছি। কিন্তু আমরা বিপদমুক্ত এই। উত্তরের এক দেশ। বুনোদের রাজত্ব। ওরা সুযোগ পেলেই আমাদের দেশ আক্রমণ করে। হেরে পালিয়ে যায়। কিন্তু এভাবে কতদিন ওদের আক্রমণ করে। হেরে পালিয়ে যায়। কিন্তু এভাবে কতদিন ওদের আক্রমণ ঠেকাতে পারবো জানি না। তবে আমার বীর সৈন্যরা হার স্বীকার করতে জানে না। এটাই আমার ভরসা। যাকগে–তোমরা কী চাও বলো।
–আমরা আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আমরা কিছুদিন এখানে থাকবো। তারপর ফিরে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। তোমরা ভাইকিং–দক্ষ জাহাজচালকদুঃসাহসী। প্রয়োজনে তোমরা আমার সহায় হবে–এই আশাআমার। রানি বললেন।
–আমরা নিশ্চয়ই আপনাকে সর্বপ্রকার সাহায্য করবো। এমন কি যদি আপনি চান আপনার হয়ে লড়াই করবো। ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে তো খুবই ভালো হয়। রানি বললেন।
রানি আঙ্গুল নেড়ে সেনাপতিকে ডাকলেন। অমাত্যদের পাশে বসা সেনাপতি দ্রুত উঠে দাঁড়াল। সেনাপতি রোগা লম্বা। এ কী লড়াই করবে? শাঙ্কো ভাবল।
সেনাপতি মাথা নিচু করে সম্মান জানিয়ে দাঁড়াল। রানি ফ্রান্সিসদের দেখিয়ে বললেন এদের থাকার জন্যে সেনানিবাসের একটা ঘর ছেড়ে দিন। সেনাদের সঙ্গেই ওদের খাওয়ার ব্যবস্থা করবেন। এরা কিছুদিন থাকবে। আপনি একটু দেখাশোনা করবেন।
