–রাজা কাদর্জার মত লোক এই প্রার্থনা শুনবে না। বন্ধুদের মুক্তি দিতে রাজি হবে না। শাঙ্কো বলল।
–একবার বলে তো দেখি। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস দরজার কাছে গেল। দরজায় শব্দ করল। একজন প্রহরী এগিয়ে এল। বলল কী ব্যাপার?
দলপতিকে খবর দাও একজন বন্দী কথা বলবে। ফ্রান্সিস বলল।
–আবার তোমরা ঝামেলা পাকাচ্ছো। প্রহরী বলল।
–আমার অনুরোধ দলপতিকে আসতে বল। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। এই শেষবার। দলপতিকে আর ডাকতে বলবে না। প্রহরী বলল।
–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস বলল।
কিছুক্ষণের মধ্যে দলপতি এল। কয়েদঘরের দরজার কাছে এসে বলল–আবার কী হল? ফ্রান্সিস এগিয়ে গিয়ে বলল–আমার একটা অনুরোধ ছিল।
কী অনুরোধ? দলপতি বলল।
রাজা কাদর্জার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ করার ব্যবস্থা করে দিন। কাদর্জা বলল।
সম্ভব নয়। দলপতি বলল।
-একটু চেষ্টা করে দেখুন। বলবেন ভাইকিংদের দলপতি একটা অনুরোধ জানাতে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। ফ্রান্সিস বলল।
–অনুরোধটা কী? দলপতি জানতে চাইল।
–সেটা আমি রাজাকেই বলবো। আপনি দেখাকরার ব্যবস্থাটা করে দিন। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমার কপাল ভালো রাজা কাদর্জা এখন খুব খোশ মেজাজে আছেন। এতগুলি লোকের ফাঁসি উনি কখনও দেখেন নি। সেটা দেখবেন। এই আনন্দে আত্মহারা। দলপতি বলল।
–মানুষ এরকমও হয়। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা কাদর্জা এরকমইমানুষ। যাকগে দেখি রাজার সঙ্গে কথা বলে। দলপতি চলে গেল।
হ্যারি গলা চড়িয়ে বলে উঠল–ফ্রান্সিস–তোমার জীবনের বিনিময়ে আমরা মুক্তি চাই না। বন্ধুদের মধ্যেও গুঞ্জন উঠল। কয়েকজন বন্ধু বলে উঠল–তুমি অনুরোধ করবে না।
–অনুরোধ করেই দেখা যাকনা। তোমরা নিশ্চিন্ত থাক রাজা রাজি হবেনা। ফ্রান্সিস বলল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে দলপতি এল। হেসে বলল–রাজা কথা বলতে রাজি হয়েছেন।
–তাহলে-দরজাটা খুলতে বলুন। ফ্রান্সিস বলল।
কয়েদঘরের দরজা খোলা হল। ফ্রান্সিস বেরিয়ে এল। চারজন প্রহরী খোলা তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিসকে পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল। সবচেয়ে আগে দলপতি।
রাজবাড়ির মন্ত্রণাকক্ষে ফ্রান্সিসকে নিয়ে আসা হল। একটা বড় শ্বেতপাথরের টেবিল। চারপাশে চেয়ার সাজানো।
ফ্রান্সিসকে চেয়ারে বসিয়ে দলপতি ভেতরে চলে গেল। একটু পরেই ফিরে এল। অনুচ্চস্বরে বলল–রাজা আসছেন।
কিছু-পরে রাজা কাদর্জা ঘরে ঢুকলেন। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল না। রাজা কড়া চোখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালে না কেন?
ফ্রান্সিসের প্রায় মুখের ডগায় এসে গিয়েছিল–আপনার মত একটা নরপশুকে। কষ্টে নিজেকে সংযত করল। বলল–আমার পায়ে ভীষণ ব্যথা। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট।
–হেঁটে তো এলে। রাজা বলল।
–অনেক কষ্টে। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা কাদর্জা চেয়ারে বসল। আলখাল্লার মত জামার পকেট থেকে চৌকোনো নস্যির কৌটো—বের করল। সজোরে এক টিপ নস্যি নিল। বলল বলো আমার সঙ্গে তোমার কি প্রয়োজন?
–একটা কথা বলছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–বলো। রাজা বলল।
–রাজা পারকোনের হয়ে আমরা লড়াই করেছিলাম। আমার নির্দেশেই আমার বন্ধুরা এই লড়াই করেছিল। কাজেই এর পুরো দায়িত্ব আমার। ফ্রান্সিস বলল।
–তুই তাহলে দলের পাঠা। রাজা বলল।
হ্যা। তাই আমার অনুরোধ-বিনীত অনুরোধ আমাকে ফাঁসি দেওয়া হোক। আমার বন্ধুদের মুক্তি দেওয়া হোক। রাজা হো হো করে হেসে উঠলকী যে বলো। অতগুলো মানুষকে একসঙ্গে ফাঁসি দেবকী রোমাঞ্চকর। সেখানে একজনের ফাঁসি দেখে কী হবে।
–তাহলে আপনি আমার অনুরোধ রাখবেন না। ফ্রান্সিস বলল।
-না-না। সবার ফাঁসি হবে একসঙ্গে। আমি বলে দিয়েছিমঞ্চেও একটা লম্বা পাটাতন থাকবে। ফাঁসির সময় পাটাতন সরিয়ে দেওয়া হবে একসঙ্গে সবাই ঝুলবে। কী চমৎকার।
ফ্রান্সিসের আর কথা বলতে ইচ্ছে করল না। এরকম একটা নির্মম মানুষের সঙ্গে কী কথা?
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। বেশ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘরের বাইরে এল। পায়ের ব্যথাটা যদি রাজা মিথ্যে বুঝতে পারে বলা যায় না হয়তো দলপতির তরোয়াল খুলে নিয়ে ওকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করতে পারে। এইরকম মানুষ সব পারে।
বাইরে এসে প্রহরীদের পাহারায় ফ্রান্সিস চলল। দলপতি বলল–তুমি রাজাকে মিথ্যে কথা বললে কেন?
–আমি একথার উত্তর দেবনা। ফ্রান্সিস বলল।
–কেন? দলপতি বলল।
–তোমাদের বিশ্বাস নেই। ফ্রান্সিস বলল।
কয়েদঘরে ঢুকতে বন্ধুরা এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল–ভাইসব, যা বলেছিলাম। তাই হল। রাজা গররাজি। একসঙ্গে এতজনের ফাঁসি দেখতে রাজা উদগ্রীব হয়ে আছে। এ নাকি এক রোমাঞ্চকর দৃশ্য। এরকম মানুষের সঙ্গে আমরা কথা বলতেও ঘৃণা হয়। রাজা ঘরে ঢুকতে আমি উঠে দাঁড়াই নি। রাজা বেশ ক্ষেপে গেল। আমি পায়ে ব্যথা বলে সমস্যাটার পাশ কাটিয়েছি। যাহোক রাজা রাজি হয়নি। অবশ্য এটা আমি আগেই জানতাম।
বন্ধুরা কেউ কোন কথা বলল না। ফ্রান্সিসকে ওরা প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। একা ফ্রান্সিসের ফাঁসি হবে না–এটা জেনে ওরা খুশিই হল। ফ্রান্সিসদের সঙ্গেই সবাই মৃত্যুবরণ করবে। সবাই এই সংকল্প নিল।
পরদিন সকাল হল। ফাঁসির মঞ্চে দড়িটড়ি টাঙানো হল। যারা ফাঁসি দেবেতারা ঝুলন্ত দড়ির, ফস টেনে টেনে দেখল। মঞ্চের পেছনটায় পাকার শুকনো ডালপাতা। ওসব রাখা হয়েছে কেন প্রহরী সৈন্যরা বুঝল না। ওরা ওসব ফেলেও দিল না। তখন ফাঁসি হবে তার উত্তেজনা।
